মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

হজ এজেন্সির ফাঁদে সর্বস্বান্ত হাজিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১:৪৫ অপরাহ্ণ
হজ এজেন্সির ফাঁদে সর্বস্বান্ত হাজিরা

সারা জীবনের সঞ্চয় আর আল্লাহর ঘর বা পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে হজে যান হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু সেই পবিত্র যাত্রাই অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে প্রতারণা, হয়রানি ও আর্থিক শোষণের তিক্ত অভিজ্ঞতায়। উন্নত হোটেল, কাবার নিকটবর্তী আবাসন, মানসম্মত খাবার কিংবা কোরবানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলেও বাস্তবে মিলছে না কাঙ্খিত সেবা। শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং কোরবানির নামে প্রতারণার মতো অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছে একাধিক হজ এজেন্সি।

চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমেও নানা অনিয়ম, শর্ত লঙ্ঘন এবং হজযাত্রীদের হয়রানির অভিযোগে অর্ধশতাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, আগামী ২০২৭ সালের হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে চার মাস আগেই হজের নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সরকার।

মন্ত্রণালয় ও হাব সূত্রে জানা গেছে, এজেন্সিগুলোর প্রতারণার ধরণ এখন বহুমুখী। সরকার নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্যকে তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন কৌশলে হজযাত্রীপ্রতি ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে একাধিক চক্র। যেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ-১ এর খরচ ৬,১৫,২৬৩ টাকা এবং প্যাকেজ-২ এর খরচ ৫,০৫,৬৪৮ টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ) এর খরচ ৭ লাখ ৯১ হাজার ৬০ টাকা, প্যাকেজ-২ (সাধারণ) ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮০ টাকা এবং প্যাকেজ-৩ (সাশ্রয়ী) খরচ ৫ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে নুসুক মাসার প্ল্যাটফর্মে ভুয়া এন্ট্রি, হোটেলের মান উন্নত করার মিথ্যা আশ্বাস এবং কোরবানির ভুয়া রসিদ দেখিয়ে শত শত হাজির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কিছু এজেন্সি। বিশেষ করে প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য এজেন্সিতে স্থানান্তর, চুক্তি অনুযায়ী এয়ার টিকিট না দিয়ে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত খরচে টিকিট কাটতে বাধ্য করা এবং সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আবাসন ও খাবার না দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।

তদন্তে দেখা গেছে, গ্রিন এভিয়েশন, এয়ার রয়্যাল অ্যাভিয়েশন, নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বাপারি এয়ার সার্ভিস এবং এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হজযাত্রীপ্রতি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে লিখিত জবাবের মুখে পড়েছে। প্রতারণার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে, লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পরও তিনটি অসাধু এজেন্সি বেআইনিভাবে হজযাত্রীদের প্রায় ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে চম্পট দিয়েছে। পরে ধর্ম মন্ত্রণালয় তাদের চাপ দিয়ে এই অর্থ উদ্ধার এবং ভুক্তভোগীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। একইভাবে আনসারি ওভারসিজ, রিলেশন ট্রাভেলস এবং নর্দার্ন ট্যুরসের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত হাজিদের ক্ষতিপূরণ ও হজের সার্বিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১’ অনুযায়ী এসব এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

চলতি বছর হজের অন্যতম আলোচিত অনিয়ম ধরা পড়ে কোরবানির অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে। সৌদি সরকারের নিবন্ধিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে হাজিদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায় করা হলেও বাস্তবে কোনো কোরবানিই করা হয়নি। অনেক এজেন্সি আবার সাধারণ ছাগল কেনার ভুয়া রসিদ ধরিয়ে দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। এই গুরুতর অনিয়মে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে প্রত্যাশা ট্রাভেলস, দৈফুর রহমান ট্রাভেলস, গ্লোবাল ট্রাভেলস, মিডিয়া ট্রাভেলস এবং দারুল ইমান ইন্টারন্যাশনালকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া লাগেজ হারানো, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং অননুমোদিত উপায়ে টিকিট কেটে হাজিদের বিমানবন্দরে আটকে রাখার অপরাধে লাকি ট্রাভেলস ও খোয়াই এয়ার ট্রাভেলসের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আগামী দুই বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রতারণার শিকার হওয়া নারায়ণগঞ্জের হাজি মো. রফিকুল ইসলাম কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘পবিত্র হজ পালনের জন্য সারা জীবনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলাম এজেন্সির হাতে। নির্ধারিত প্যাকেজের বাইরে ভালো হোটেল ও কাবা শরীফের কাছে আবাসনের কথা বলে আমার এবং আমার স্ত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩ লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি। কিন্তু মক্কায় গিয়ে দেখি আমাদের রাখা হয়েছে জরাজীর্ণ এক বাসায়, যেখানে পানি ও এয়ারকন্ডিশনার ঠিকমতো চলত না। কোরবানি বাবদ আলাদা ৩৫ হাজার টাকা নিয়েও আমাদের ভুয়া রসিদ দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা এই প্রতারক এজেন্সিগুলোর মালিকদের ফাঁসি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

একইভাবে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা হাজি আবদুল মালেক বলেন, ‘আামদের এজেন্সি শেষ মুহূর্তে বলে ফ্লাইট মিস হবে, তাই নতুন করে জনপ্রতি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা না দিলে ভিসা ও টিকিট হবে না। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে টাকা দিয়েছি। সেখানে গিয়ে খাবারের যে কষ্ট পেয়েছি তা মুখে বলা যায় না। ধর্মকে ব্যবহার করে যারা মানুষের সাথে এমন প্রতারণা করে, তাদের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করা উচিত।’

তবে অভিযুক্ত একটি এজেন্সির সত্ত্বাধিকারী ও হজ এজেন্সি মালিক প্রতিনিধি আলহাজ্ব মো. কামরুল হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে কোনো অনিয়ম করিনি। সৌদি আরবের নুসুক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সার্ভার জটিলতার কারণে শেষ মুহূর্তে অনেক ডেটা এন্ট্রি আটকে যায়। এছাড়া স্থানীয় সৌদি মোয়াল্লেমরা সময়মতো আবাসন ও কোরবানির কুপন না দেওয়ায় এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ এজেন্সি নিজেদের পকেট থেকে দিয়েছে। মন্ত্রণালয় যেসব শোকজ করেছে, তার বস্তুনিষ্ঠ ও দাপ্তরিক প্রমাণ আমরা জমা দেব।’

এ বিষয়ে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার দায় পুরো হাব নেবে না। যেসব এজেন্সি হাজিদের টাকা আত্মসাৎ করেছে বা চুক্তি লঙ্ঘন করেছে আমরা তাদের বিচার চাই। তবে একই সাথে সরকারকে মনে রাখতে হবে সৌদির নতুন রোডম্যাপ ও আধুনিক কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থার সাথে অনেক ছোট এজেন্সি এখনো অভ্যস্ত নয়। আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষ শেষ মুহূর্তে হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আগাম নিবন্ধনের মানসিকতা তৈরিতে সরকারি প্রচার বাড়ানো দরকার। অসাধু এজেন্সি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সৎ এজেন্সিগুলোকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।’

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও হজের স্বচ্ছতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, ‘হজ ইসলামের অন্যতম মৌলিক রুকন। ইবাদতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া পরহেজগার মানুষদের ধোঁকা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া জঘন্যতম অপরাধ ও হারাম কাজ। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে হাজিদের পকেট কাটে, তারা ইহকাল ও পরকালে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী এদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার যাতে কেউ আর বায়তুল্লাহর মেহমানদের সাথে প্রতারণা করার সাহস না পায়।’

সুশাসনের দিকটি তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে হজ খাতে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে কেবল কার্যকর শাস্তির অভাবে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি বা সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়ে এই অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন’ প্রয়োগ করে প্রতারকদের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে। এছাড়া সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগী হাজিদের অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং দুর্নীতিতে জড়িত সরকারি-বেসরকারি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এ বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম বলেন, ‘সৌদি সরকার পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে অনলাইন ই-ওয়ালেট ও সেন্ট্রাল ‘নুসুক মাসার’ সিস্টেমে নিয়ে এসেছে। নিষ্ক্রিয় ও প্রতারক এজেন্সিগুলোর পথ চিরতরে বন্ধ করতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ৪০ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন করা এবং চলতি ২০২৬ সালে একটিও নিবন্ধন না করা নিষ্ক্রিয় এজেন্সিকে ২০২৭ সালের হজ কার্যক্রম থেকে সরাসরি বাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি এজেন্সিকে অন্তত ৪৬ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করতেই হবে। এছাড়া এজেন্সিগুলোকে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন শেষ করতে হবে।’

নতুন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৫ মে অনুষ্ঠিতব্য হজের জন্য ১৫ জুলাই থেকে আগামী ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সৌদি খরচের অর্থ নুসুক ই-ওয়ালেটে স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া ৮ নভেম্বরের মধ্যে এয়ারলাইন্স চুক্তি এবং ২৮ জানুয়ারি থেকে ভিসা ইস্যু শুরু হয়ে ৮ এপ্রিল থেকে প্রথম হজ ফ্লাইট শুরু হবে।

 

Ads small one

বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

শ্যামল শীল
দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশ এবং জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অনেকটা সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছে। তথাপিও বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশাতীত হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। কিন্তু এ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বা জ্ঞানটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে—এমন পরিবারের সংখ্যা এখনো আশাপ্রদ নয়।
আমাদের দেশে বৈধ বিবাহের জন্য মেয়েদের ১৮ বছর আর ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে মানে বাল্যবিবাহ। সরকারিভাবে প্রতিনিয়তই বাল্যবিবাহ বন্ধে অভিভাবকদের আহ্বান, শাস্তির ব্যবস্থাসহ সচেতনতার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিভাবেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ বা বাল্যবিয়ে নামের এই ব্যাধি।
আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে একটা সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধুমধাম করে, রং মাখামাখি করে বিয়ের উৎসব হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই মজার সব আয়োজন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো বিয়ে হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও এমন গোপনে বিয়ে হয় যে, পাড়াপড়শিও জানতে পারে না খবরটি। এমনও দেখা যায়, এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে অথচ পাশের বাড়ির লোকজন বিষয়টি জানেই না। কেন এমন গোপনীয়ভাবে বিয়ে হচ্ছে? কেনইবা এত রাখঢাক? কারণ কী? আসলে কারণ একটাই, একসময় আমাদের দেশে বিয়ের কোনো বয়স ছিল না।
তথ্যানুসন্ধ্যানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত বছরের কোনো মেয়েশিশুর সঙ্গে ৮-১০ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। দুই পক্ষের অভিভাবকদের ইচ্ছাতে বিয়ে হলেও বিয়ের বর ও কনে জানতই না বিয়ে কী জিনিস। বর্তমান সময়ে ছয়-সাত বছর বয়সি মেয়েশিশুর বিয়ের খবর কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও অনেক গ্রামে এখনো ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুর সঙ্গে ১৫-১৬ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ের খবর শোনা যায়। কোথাও কোথাও দরিদ্র পরিবারের ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুকে এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বয়োবৃদ্ধের কাছে বিয়ে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। আর এসব বিয়েতে সহায়তা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও স্থানীয় কাজি। জনপ্রতিনিধিরা মেয়ে বা ছেলের বয়স বাড়িয়ে বা নাম বদলে জন্মনিবন্ধন করার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য।
গ্রামের সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রে এসব বিয়ের খবর জানেন। গোপনে এসব বিয়ে আয়োজনের খবর জেনেও তারা চুপচাপ থাকেন। কখনো কখনো বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সমাজের সচেতন মানুষ জানার পর প্রতিবাদ করলে মেয়ের পরিবার থেকে বলা হয়, স্কুলে বা বাড়িতে বখাটে যুবকরা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দেয়। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার থেকে বলা হয়, গরিবের সংসারে মেয়েটি অনেকটা বোঝা। তাই ভালো বা পয়সাওয়ালা অথবা প্রবাসী পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এমন অনেক অজুহাত থাকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো স্থানে যিনি বিয়ে পড়ান তিনি ফতোয়া দেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কোটি কোটি মেয়ের ছয়-সাত বছরে বিয়ে হলো, কই কারো তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন হবে কেন? আবার দেখা গেল যে, মৌলভী সাহেবকে বিয়ের জন্য ডেকে আনা হয় তিনি যদি বাল্যবিয়ে পড়াতে না চান, তবে সমাজপতিরা বাল্যবিয়ে পড়াতে তাদের বাধ্য করেন। এ অবস্থায় কখনো কোনো সচেতন মানুষ বা প্রশাসন যদি খবর পেয়ে বিয়ের মজলিশে উপস্থিত হন, তবে তিনি বা তাকে সদ্য কিনে নিয়ে আসা নতুন জন্মসনদটা দেখানো হয়। বিয়ে মজলিশে কেউ উপস্থিত হলে মানবতার দোহাইও দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আজ বিয়ে ভেঙে গেলে এ মেয়েকে নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।’ সমাজে বর্তমানে এভাবেই চলছে বাল্যবিবাহ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক অভিভাবক ভাবেন তার পরিবারের মানসম্মানের কথা, ভাবেন তিনি সমাজের অতিদরিদ্র একজন মানুষ। যেদিন তার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল সেদিন থেকেই যেন পরিবারের কর্তার মাথায় একটা পাহাড়সম বোঝা চেপে বসল। সেদিন থেকেই চিন্তায় চিন্তায় তার জীবন যেন অন্ধকারময়! মেয়েটা একটু একটু বড় হওয়ার পর অভিভাবকের চিন্তার মাত্রাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো মতে, ১১-১২ বছর হলেই পরিবারের কর্তার দিন-রাত দৌড় শুরু হয়ে যায় ঘটকের পেছনে। যেন কোনোমতে বিয়েটা দিতে পারলেই তিনি দম ফেলে বাঁচেন।
আসলেই কি তাই? মেয়েকে অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের কর্তা কি বাঁচলেন? অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। পরিবারের কর্তা নিজ হাতে তার কন্যার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করলেন। তিনি নিজেও ডুব দিলেন অমানিশার কালো অন্ধকারে। অপরিণত বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই প্রথম যে জিনিসটি সামনে আসে তা হলো, বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি এসে আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় না—এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। যখন তার পুতুল খেলার বয়স, তখনই যদি থাকে সংসার নামক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়ে থাকে। যখন অভিভাবকরা কোনোমতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়েও মেয়েকে আর স্বামীর বাড়ি পাঠাতে পারেন না; তখন সমাজপতিরা এ নিয়ে বিচার-সালিসে বসেন। অথবা মামলা, থানা, আদালত করে সময় কাটাতে হয় অভিভাবকদের। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তালাকের মাধ্যমে বিয়ের কবর রচিত হয়। আজকাল আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ে যেসব স্বামী-স্ত্রীর তালাক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। তাই বাল্যবিবাহের বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে সবাইকে।
অল্প বয়সে বেশির ভাগ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ ১৮ বছরের কম বয়সিদের মা হওয়া। কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক মায়ের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যু কিংবা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নাবালিকা মেয়ে মা হওয়ায় কীভাবে শিশুকে পরিচর্যা করবে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুও ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারীশিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিরোধী পদক্ষেপের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনার অপরিণত মেয়েকে আপনার অভিলাষের বলি বানাবেন না। তার বিয়ের খরচ, মালামালের খরচ বা পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক যা দেবেন, তা দিয়ে মেয়েটির লেখাপড়ার খরচ জোগান। দেখবেন লেখাপড়া করে ওই মেয়েটিই একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হয়তো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড়মাপের কর্মকর্তা হবে। তখন তাকে বিয়ে করার জন্য সমাজের উন্নত পরিবারের ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে।
বর্তমান সরকার প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই এখন নতুন বই দিচ্ছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ তো আছেই। তাহলে কেন আপনার দুমুঠো অন্ন সাবাড় করছে বলে তাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছেন? আসুন আপনি-আমি সবাই সচেতন হই এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিয়ে নামের ব্যাধিটা সমাজ থেকে চিরতরে বিদায়ের ব্যবস্থা করি। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

 

এম শফিকুল ইসলাম
চলতি মৌসুমে আমন আবাদ ও ক্ষেত পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার প্রান্তিক কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পাওয়ার টিলার মালিকরা বিঘা প্রতি চাষ খরচ গত মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘা প্রতি মোট উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার ভোমরা গ্রামের কৃষক শংকর ঘোষের মতে, জমিতে ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। বাজারে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিঘা প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবার চাষ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তা ছাড়া প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক মিলছে না। সারের দামও চড়া। সব মিলিয়ে এবার বিঘায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও ধানের বাজারদর সুবিধাজনক নয়।
একই উপজেলার লক্ষ্ণীদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ভাষ্য, ফসল উৎপাদন করে উপযুক্ত দাম না পেয়ে দিন দিন কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের অবস্থাও একই রকম।
তবে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে জন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে ভরা আমন মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান চাষ করে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকারÑবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র। দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক ভীতি এবং নজরদারির অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় প্রাণ। ১৫ বছর বয়সে ভুল সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করা, কিংবা ১৬ ও ১৫ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকার এফিডেভিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বাল্যবিবাহের পেছনে কেবল অসচেতনতা নয়, কাজ করছে নানাবিধ ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র জলবায়ু সংকট, সুপেয় পানির তীব্র অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের ভয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই কিশোরীদেরই। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ, লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও চরম রক্তস্বল্পতায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে; এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু প্রসূতি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনি ব্যবস্থার অসাদুপব্যবহার। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র বা এফিডেভিটের দোহাই দিয়ে বেআইনি বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক দায় চাপানো বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত আইনি প্রয়োগ। জন্মসনদ যাচাইকরণ নিশ্চিতকরণ, অসাধু এফিডেভিট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক ভীতি দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের অসময়ে বিয়ে শুধু একটি জীবনের পরাজয় নয়, বরং এটি পুরো সমাজের অগ্রগতিকেই পিছিয়ে দেয়।