আইন আছে প্রয়োগ নেই: ২০ বছরেও ঘুচেনি উপকূলের নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য
পত্রদূত রিপোর্ট: দেশে সমান মজুরি আইন পাস হয়েছে প্রায় দুই দশক আগে। কিন্তু সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। একই সময়, একই শ্রম এবং সমপরিমাণ কাজ করেও নারী শ্রমিকেরা পুরুষদের তুলনায় মজুরি পাচ্ছেন অনেক কম। দীর্ঘ ২০ বছরেও ‘সমান কাজে সমান মজুরি’ আইনের সুফল পৌঁছায়নি সুন্দরবন উপকূলের এসব সংগ্রামী নারীর কাছে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কাঁকড়ার খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, কৃষিকাজ ও রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করছেন নারীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে বিশেষ করে ‘সফটশেল’ কাঁকড়া চাষে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
স্থানীয় তথ্যানুযায়ী, যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক দিনে ৫০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এমনকি মাসিক বেতনের ক্ষেত্রেও ব্যবধান দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কাঁকড়া খামারের শ্রমিক রিনা খাতুন বলেন, “সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ করি। মাসিক বেতন পাই ৭ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ আমার সঙ্গে একই কাজ করে একজন পুরুষ সহকর্মী বেতন পান ৯ হাজার টাকা। কাজ সমান হলেও পুরুষ হওয়ায় তার কদর বেশি। বারবার বলে লাভ হয় না।”
একই অভিযোগ ধান কাটা শ্রমিক মুজি বেগমের। তিনি জানান, এক বেলা কাজ করলে একজন পুরুষ ৮০০ টাকা পেলেও নারীদের দেওয়া হয় ৫০০ টাকা। শ্রমিক কামরুল মল্লিক ও তার স্ত্রী ইটের কাজ করেন একসাথে। কামরুল বলেন, “আমরা একই কাজ করি, পরিশ্রমও সমান। কিন্তু মজুরির সময় আমার স্ত্রীকে কম টাকা দেওয়া হয়। এটা অন্যায়।”
বেসরকারি সংস্থা সিসিটিবি’র উপজেলা সমন্বয়কারী স্টিভ রায় রুপন মনে করেন, এই বৈষম্য দূর করতে সামাজিক আন্দোলন জরুরি। তিনি বলেন, “নারীরা শ্রমবাজারে বড় ভূমিকা রাখলেও ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও মালিকপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।”
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিস্ আফরোজা আক্তার বলেন, “শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। এই বৈষম্য নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে কাঁকড়া শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও এই মজুরি বৈষম্য টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা। নারীর শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে না পারলে এই সম্ভাবনাময় খাতটি পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।






