শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের আদিবাসীদের দূর্গম পথচলা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪৯ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের আদিবাসীদের দূর্গম পথচলা

নিকোলাস বিশ্বাস

আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নানামূখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে আদিবাসী জনগণের অসামান্য অবদানকেও স্বীকৃতি জানায়। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য: “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো” যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের ওপর আলোকপাত করে।

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এ দেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এখানে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্্েরা, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ-যুগ ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।

আমাদের সংবিধান ও সমঅধিকারের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধান সমতা ও ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংবিধানে ‘জাতিসত্তা কিংবা আদিবাসী’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকৃত হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, বিশেষ করে আইএলও -এর (সিইএসিআর), বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। কাপায়েং ফাউন্ডেলম-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতিফলন। তবে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।

প্রতিশোধের আশঙ্কা, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও সহায়ক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সহিংসতা, প্রান্তিকীকরণ এবং বৈষম্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই জরুরি ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত
“বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত” – এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার অসংখ্য বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বিচার শুধু ধীরগতির নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা অধরাই থেকে যায়। তদন্তে বিলম্ব, দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের জবাবদিহিতার অভাব বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: ঊনত্রিশ বছরের অপূর্ণ বাস্তবায়ন
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অধিকতর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। পরবর্তী বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের মতে, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের এক নতুন সুযোগ
সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৯ -এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সাক্ষাতে অংশ নেয়। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ তুলে ধরে একটি সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ নতুন করে দেশের জাতীয় আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণ
সংলাপ, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহু জাতীয় সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। একই অঙ্গীকার এখন প্রয়োজন, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীও সংবিধানের পূর্ণ সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের কল্যাণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বিবেচনার দাবি রাখে:

ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে একটি কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।

ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সকল অংশীজনের মধ্যে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা অপরিহার্য।

বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; বরং তারা এই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম অংশীদার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহু সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রতি তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিতকারী নীতিমালার মাধ্যমে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের শক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর নির্ভর করেনি। বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায়। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা করা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএফপিএ) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

Ads small one

কপিলমুনিতে চারা গাছের বাজার জমজমাট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৮ অপরাহ্ণ
কপিলমুনিতে চারা গাছের বাজার জমজমাট

পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি (পাইকগাছা): চাল, ডালসহ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি অন্ততঃ একটি করে গাছ যেন চাই…..চাই। জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে মানুষের মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে বৃক্ষায়ন কর্মসূচীতে নেমেছে মানব সমাজ। আর তা’ই হাটের দিনে গাছের চারা কিনছেন সর্বস্তরের ক্রেতারা। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০/৩০০ টাকায় একটি গাছের চারা সংগ্রহ করে তা বাড়িতে নিয়ে রোপন করছেন নিন্ম আয়ের মানুষ। এতে মধ্যবিত্ত্ব বা বিত্ত্বশালীরাও বসে নেই, তারাও রীতিমত বৃক্ষের চারা কিনে ভ্যান বোঝাই করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

 

খুলনার ঐতিহ্যবাহী বানিজ্যিক কেন্দ্র কপিলমুনিতে চারা গাছের বাজারের চিত্রটা প্রত্যক্ষ করলেই মনে হয় যেন প্রত্যেক মানুষ প্রতিযোগীতা শুরু করেছেন। পরিবেশবিদরা মনে করেন, বৃক্ষায়ন কর্মসূচীতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বৃক্ষায়নের এমন দৃশ্যপট আমাদের সামাজিক পরিবেশকে আরোও তরান্বিত করবে।

জানাগেছে, সরকারের বনায়ন কর্মসূচীর আওতায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচী ও জন-সচেতনতা বৃদ্ধিতে তৃণমূল পর্যায় এর কার্যক্রম চলছে। যে কারণে ”গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান” শোগানে একাতœতা প্রকাশ করে এলাকার মানুষ প্রতিদিনকার সাংসারিক খরচ বাঁচিয়ে নুন্যতম একটি গাছের চারা ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

এলাকার বিভিন্ন নার্সারী মালিকরা ফলজ বৃক্ষের পাশাপাশি মেহগনি, শিরিশ, লম্বু, নিম, গামারী, সেগুন ইত্যাদী গাছের উৎপাদন করে তা বাজারে বিক্রি করছেন। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০/৪০০ টাকায় উন্নত গাছের চারা সরবরাহ ও বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ভাল জাতের চারা গাছ সংগ্রহে আগাম বায়নাও করছেন অনেকেই।

নার্সারী মালিক আমিন মোল্লা জানান, নিজ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে গাছের চারা বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানী করছেন। যে কারণে অধিক মুনাফা উপার্জিত হচ্ছে তাদের। সূত্রমতে, গত ৮০’র দশকের পর হতে দক্ষিণ পশ্চিম উপকুলীয় এলাকা সমুহে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব ও বিভিন্ন সময়ে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস-এ সাবাড় করে দেয় দক্ষিণ উপকুলীয় এলাকার বনবৃক্ষরাজি। বিভিন্ন সময়ে জলোচ্ছাস ও বন্যায় লবণ পানির প্রভাবে মারাগেছে মূল্যবান গাছপালা। আর এ কারণে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ বনায়ন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে; পরোক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ গাছপালা।

 

শুধু তাই নয়, পরপর দেশে স্মরন কালের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড় আইলা, সিডর, নারগীজ, বুলবুল লন্ডভন্ড করেদেয় সুন্দরবন সহ উপকুলীয় এলাকা। যারফলে সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রীতিমত হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে ফলজ বৃক্ষের পাশাপাশি অধিক হারে বৃক্ষরোপন বা বনায়ন করতে পারলে সার্বিক পরিবেশ রক্ষা পাবে।

গাছ ক্রয় করতে আসা প্রতাপকাটী গ্রামের শাহিদা বেগম বলেন, “প্রতি বছর আমি গাছ লাগাই, আমার ভালো লাগে। গাছ হলো অকৃত্রিম বন্ধু। গাছ যেমন ফল ও অক্্িরজেন দেয়, আবার গাছ বিক্রি করলে নগদ টাকা ও পাই। এসব কারণে আমি গাছ লাগাই।”

সাতক্ষীরা একটি জেলা নয়, একটি অসমাপ্ত গবেষণাগার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২২ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা একটি জেলা নয়, একটি অসমাপ্ত গবেষণাগার

মো. মামুন হাসান

সাতক্ষীরাকে আমরা ভুল জায়গা থেকে দেখতে শুরু করেছি। মানচিত্রে সাতক্ষীরা একটি জেলা। পর্যটনের ভাষায় সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। কিন্তু গবেষকের চোখে এটি আরও বড় কিছু। এটি এমন একটি ভূখন্ড, যেখানে একই সঙ্গে প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস, জলবায়ু, অর্থনীতি এবং টিকে থাকার কৌশল প্রতিদিন একে অন্যের সঙ্গে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

সুতরাং সাতক্ষীরার পর্যটন উন্নয়নের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, “আর কোথায় পর্যটনকেন্দ্র বানানো যায়?” প্রশ্ন হওয়া উচিত, “সাতক্ষীরার কোন গল্পটি এখনো পর্যটন হয়ে ওঠেনি?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সুন্দরবনের বাইরেও একটি সম্পূর্ণ নতুন সাতক্ষীরা আবিষ্কার করা সম্ভব।

ধরা যাক, কোনো পর্যটক সাতক্ষীরায় এসে শুধু সুন্দরবন দেখলেন না। তিনি একটি লবণাক্ত গ্রামের মাটির গল্প শুনলেন, দেখলেন কীভাবে একজন কৃষক বদলে যাওয়া পানির সঙ্গে কৃষির নতুন সমীকরণ তৈরি করছেন। কোনো মৌয়ালের কাছ থেকে শুনলেন বন ও মানুষের সম্পর্কের গল্প। কোনো জেলের নৌকায় বসে জানলেন জোয়ারের ভাষা। কোনো নারীর কাছ থেকে শুনলেন ঘূর্ণিঝড়ের পর একটি পরিবারের পুনর্গঠনের কাহিনি। স্থানীয় রান্না খেলেন, একটি পরিবারের বাড়িতে রাত কাটালেন এবং পরদিন ইতিহাসের কোনো স্থানে গিয়ে শুনলেন কয়েক শতাব্দীর গল্প।

তখন পর্যটক শুধু জায়গা দেখছেন না। তিনি একটি ভূখন্ড পড়ছেন। এই ধারণা থেকেই তৈরি হতে পারে “জীবন্ত সাতক্ষীরা”। যেখানে জাদুঘরের দেয়ালে ইতিহাস বন্দী থাকবে না, ইতিহাস ছড়িয়ে থাকবে মানুষের জীবনে। নদী হবে প্রদর্শনী, গ্রাম হবে গবেষণাক্ষেত্র, হোমস্টে হবে শ্রেণিকক্ষ, আর স্থানীয় মানুষ হবেন সেই জীবন্ত জাদুঘরের কিউরেটর।

এটি কল্পনা নয়। সাতক্ষীরার উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট ও মানুষের অভিযোজন নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এবং স্থানীয় জ্ঞান ও সংগঠনের গুরুত্ব উঠে এসেছে। তাহলে কেন সাতক্ষীরায় জলবায়ু পর্যটন হবে না?দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আসবে উপকূলের বাস্তবতা দেখতে। গবেষকরা আসবেন লবণাক্ততার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে। পরিবেশবিদরা দেখবেন ম্যানগ্রোভ ও মানুষের সম্পর্ক। পর্যটক দেখবেন কীভাবে প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার বিজ্ঞান তৈরি করছে।আরও এক ধাপ এগিয়ে সাতক্ষীরাকে করা যেতে পারে বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ উন্মুক্ত পর্যটন গবেষণাগার।

প্রতিটি পর্যটন এলাকায় থাকবে একটি গল্প, একটি গবেষণা বিষয় এবং একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম। কোথাও নদী ও জোয়ার, কোথাও ম্যানগ্রোভ, কোথাও উপকূলীয় কৃষি, কোথাও লোকসংস্কৃতি, কোথাও ধর্মীয় ঐতিহ্য, কোথাও স্থানীয় খাদ্য। পর্যটক চাইলে দর্শক হবেন, চাইলে শিক্ষার্থী, চাইলে গবেষক। এখানে পর্যটনের নতুন মুদ্রা হবে শুধু টাকা নয়, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। আর স্থানীয় মানুষ? তাঁরা পর্যটনের দর্শক নন, অংশীদার। সুন্দরবন এলাকায় কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাতেও স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ চিহ্নিত হয়েছে। তাই সাতক্ষীরার পর্যটন পরিকল্পনায় একটি নতুন হিসাব প্রয়োজন।

একজন পর্যটক কত টাকা খরচ করলেন, শুধু সেটি নয়। তাঁর সেই টাকা থেকে কত অংশ স্থানীয় কৃষকের কাছে গেল, কত অংশ নৌকার মাঝির কাছে গেল, কত অংশ নারী উদ্যোক্তার কাছে গেল, কত অংশ গাইডের আয় হলো, কত অংশ প্রকৃতি সংরক্ষণে ফিরে গেল, সেটিও হিসাব করতে হবে। তখন পর্যটন হবে স্থানীয় সম্পদ থেকে স্থানীয় সমৃদ্ধি তৈরির ব্যবস্থা।

সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ পর্যটন তাই পাঁচ তারকা হোটেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপা উচিত কতটি পরিবার পর্যটন থেকে আয় করছে, কতজন তরুণ গাইড হয়েছে, কতজন নারী উদ্যোক্তা হয়েছে, কতটি স্থানীয় খাবার নতুন বাজার পেয়েছে এবং পর্যটনের আয় থেকে কতটুকু প্রকৃতি সংরক্ষণে ফিরে যাচ্ছে। কারণ সুন্দরবনের মূল্য শুধু তার গাছপালা কিংবা বাঘে নয়। গবেষণায় সুন্দরবনের পর্যটনসেবার অর্থনৈতিক মূল্যও পরিমাপ করা হয়েছে।

 

সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই কোনো একটি দর্শনীয় স্থান নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের অসমাপ্ত গল্প। এই গল্পকে যদি গবেষণা, প্রযুক্তি, স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে সাতক্ষীরাকে আর সুন্দরবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পরিচয় দিতে হবে না। বরং একদিন পর্যটকের প্রশ্ন হতে পারে, “সুন্দরবন দেখতে এসেছি ঠিকই, কিন্তু সাতক্ষীরার সেই জীবন্ত গবেষণাগারটি কোথায়?” সেদিনই বুঝব, সাতক্ষীরার পর্যটন বদলেছে।আর তার আগে বদলাতে হবে আমাদের চোখ।

লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

সাংবাদিকতা: আমরা কোমন সাংবাদিক চাই?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:১৫ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতা: আমরা কোমন সাংবাদিক চাই?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন সাংবাদিকের হাতে থাকে তথ্য, প্রশ্ন করার সাহস এবং জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব। কিন্তু যখন এই পেশার সঙ্গে নানা ধরনের স্বার্থ, পরিচয়, প্রভাব কিংবা অনৈতিক কর্মকা- জড়িয়ে পড়ে, তখন সাংবাদিকতার মূল চেহারাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়Ñকে প্রকৃত সাংবাদিক, আর কে কেবল সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছে?

 

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিচয়ের পরিধিও বেড়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অনলাইন গণমাধ্যমের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা সংবাদ প্রকাশকে গণতান্ত্রিক করেছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে এক নতুন সংকট। সাংবাদিকতার পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের চেয়ে সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সাংবাদিক এবং নামধারী সাংবাদিকের মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

 

আজ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের মূল পরিচয় সাংবাদিকতা নয়, কিন্তু গলায় একটি পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে কিংবা একটি ছোট্ট অনলাইন পোর্টালের নাম ব্যবহার করে তারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে চান। কোথাও কোথাও সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, তদবির কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের অভিযোগও শোনা যায়। এ ধরনের কর্মকা- শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মানকেও ক্ষুণœ করে।

 

আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সাংবাদিকতার চেয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া। কেউ প্রেসক্লাবের পরিচয়কে সাংবাদিকতার সমার্থক মনে করেন, কেউ আবার বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি কোনো পদ নয়; মূল শক্তি হচ্ছে মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের সাহস।

 

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণও সাংবাদিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একটি অংশ প্রকাশ্যে বা নীরবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ফেলছে। মতাদর্শ থাকা দোষের নয়; কিন্তু সংবাদ পরিবেশনে যদি নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়, তাহলে সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না, সেটি প্রচারণায় পরিণত হয়।

 

সংবাদ ও মতামতের এই সীমারেখা মুছে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ পাঠক। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আরেক ধরনের সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য প্রকাশ, গুজবকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন কিংবা অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দ্রুত হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় নির্ভুল হওয়ার দায়বদ্ধতা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই হলো সত্যতা যাচাই। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে।

 

দেশে এখনো এমন বহু সাংবাদিক আছেন, যারা নীরবে কাজ করে চলেছেন। তারা প্রচারের আলোয় আসেন না, সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন না। কিন্তু মানুষের সমস্যা তুলে ধরেন, দুর্নীতি উন্মোচন করেন, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করেন এবং ঝুঁকি নিয়েও সত্য প্রকাশ করেন। অনেক সময় তাদেরই হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়। তবুও তারা নীতি থেকে সরে যান না। প্রকৃত অর্থে তারাই সাংবাদিকতার প্রাণশক্তি। সাংবাদিকতার সংকট তাই কেবল ব্যক্তির সংকট নয়; এটি প্রতিষ্ঠান, নীতিমালা ও পেশাগত সংস্কৃতিরও সংকট।

 

অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করা, সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং নৈতিকতা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার রোধে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমাজকে ঠিক করতে হবে তারা কেমন সাংবাদিক চায়।

 

এমন সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতার কাছে নতজানু নন; যিনি ব্যক্তিস্বার্থের জন্য কলম বিক্রি করেন না; যিনি সত্যের সঙ্গে আপস করেন না; যিনি মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং তথ্যকে অস্ত্র নয়, দায়িত্ব হিসেবে ব্যবহার করেন। সাংবাদিকের পরিচয় কোনো আইডি কার্ডে সীমাবদ্ধ নয়, কোনো প্রেসক্লাবের সদস্যপদেও নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সততা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থে নির্ভীক অবস্থান।

 

সমাজের প্রয়োজন সেই সাংবাদিক, যিনি খবরের আড়ালের সত্য খুঁজে বের করবেন, মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন এবং গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আজ যখন সাংবাদিকতার নানা রকম পরিচয় নিয়ে আলোচনা হয়, তখন শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেÑআমরা কি সংখ্যায় বেশি সাংবাদিক চাই, নাকি মানে বড় সাংবাদিক? কারণ একটি সমাজকে বদলে দিতে শত সাইনবোর্ডধারী সাংবাদিক নয়, একজন সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকই যথেষ্ট।

লেখক: সংবাদকর্মী