সাতক্ষীরা একটি জেলা নয়, একটি অসমাপ্ত গবেষণাগার
মো. মামুন হাসান
সাতক্ষীরাকে আমরা ভুল জায়গা থেকে দেখতে শুরু করেছি। মানচিত্রে সাতক্ষীরা একটি জেলা। পর্যটনের ভাষায় সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। কিন্তু গবেষকের চোখে এটি আরও বড় কিছু। এটি এমন একটি ভূখন্ড, যেখানে একই সঙ্গে প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস, জলবায়ু, অর্থনীতি এবং টিকে থাকার কৌশল প্রতিদিন একে অন্যের সঙ্গে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছে।
সুতরাং সাতক্ষীরার পর্যটন উন্নয়নের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, “আর কোথায় পর্যটনকেন্দ্র বানানো যায়?” প্রশ্ন হওয়া উচিত, “সাতক্ষীরার কোন গল্পটি এখনো পর্যটন হয়ে ওঠেনি?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সুন্দরবনের বাইরেও একটি সম্পূর্ণ নতুন সাতক্ষীরা আবিষ্কার করা সম্ভব।
ধরা যাক, কোনো পর্যটক সাতক্ষীরায় এসে শুধু সুন্দরবন দেখলেন না। তিনি একটি লবণাক্ত গ্রামের মাটির গল্প শুনলেন, দেখলেন কীভাবে একজন কৃষক বদলে যাওয়া পানির সঙ্গে কৃষির নতুন সমীকরণ তৈরি করছেন। কোনো মৌয়ালের কাছ থেকে শুনলেন বন ও মানুষের সম্পর্কের গল্প। কোনো জেলের নৌকায় বসে জানলেন জোয়ারের ভাষা। কোনো নারীর কাছ থেকে শুনলেন ঘূর্ণিঝড়ের পর একটি পরিবারের পুনর্গঠনের কাহিনি। স্থানীয় রান্না খেলেন, একটি পরিবারের বাড়িতে রাত কাটালেন এবং পরদিন ইতিহাসের কোনো স্থানে গিয়ে শুনলেন কয়েক শতাব্দীর গল্প।
তখন পর্যটক শুধু জায়গা দেখছেন না। তিনি একটি ভূখন্ড পড়ছেন। এই ধারণা থেকেই তৈরি হতে পারে “জীবন্ত সাতক্ষীরা”। যেখানে জাদুঘরের দেয়ালে ইতিহাস বন্দী থাকবে না, ইতিহাস ছড়িয়ে থাকবে মানুষের জীবনে। নদী হবে প্রদর্শনী, গ্রাম হবে গবেষণাক্ষেত্র, হোমস্টে হবে শ্রেণিকক্ষ, আর স্থানীয় মানুষ হবেন সেই জীবন্ত জাদুঘরের কিউরেটর।
এটি কল্পনা নয়। সাতক্ষীরার উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট ও মানুষের অভিযোজন নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এবং স্থানীয় জ্ঞান ও সংগঠনের গুরুত্ব উঠে এসেছে। তাহলে কেন সাতক্ষীরায় জলবায়ু পর্যটন হবে না?দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আসবে উপকূলের বাস্তবতা দেখতে। গবেষকরা আসবেন লবণাক্ততার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে। পরিবেশবিদরা দেখবেন ম্যানগ্রোভ ও মানুষের সম্পর্ক। পর্যটক দেখবেন কীভাবে প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার বিজ্ঞান তৈরি করছে।আরও এক ধাপ এগিয়ে সাতক্ষীরাকে করা যেতে পারে বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ উন্মুক্ত পর্যটন গবেষণাগার।
প্রতিটি পর্যটন এলাকায় থাকবে একটি গল্প, একটি গবেষণা বিষয় এবং একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম। কোথাও নদী ও জোয়ার, কোথাও ম্যানগ্রোভ, কোথাও উপকূলীয় কৃষি, কোথাও লোকসংস্কৃতি, কোথাও ধর্মীয় ঐতিহ্য, কোথাও স্থানীয় খাদ্য। পর্যটক চাইলে দর্শক হবেন, চাইলে শিক্ষার্থী, চাইলে গবেষক। এখানে পর্যটনের নতুন মুদ্রা হবে শুধু টাকা নয়, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। আর স্থানীয় মানুষ? তাঁরা পর্যটনের দর্শক নন, অংশীদার। সুন্দরবন এলাকায় কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাতেও স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ চিহ্নিত হয়েছে। তাই সাতক্ষীরার পর্যটন পরিকল্পনায় একটি নতুন হিসাব প্রয়োজন।
একজন পর্যটক কত টাকা খরচ করলেন, শুধু সেটি নয়। তাঁর সেই টাকা থেকে কত অংশ স্থানীয় কৃষকের কাছে গেল, কত অংশ নৌকার মাঝির কাছে গেল, কত অংশ নারী উদ্যোক্তার কাছে গেল, কত অংশ গাইডের আয় হলো, কত অংশ প্রকৃতি সংরক্ষণে ফিরে গেল, সেটিও হিসাব করতে হবে। তখন পর্যটন হবে স্থানীয় সম্পদ থেকে স্থানীয় সমৃদ্ধি তৈরির ব্যবস্থা।
সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ পর্যটন তাই পাঁচ তারকা হোটেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপা উচিত কতটি পরিবার পর্যটন থেকে আয় করছে, কতজন তরুণ গাইড হয়েছে, কতজন নারী উদ্যোক্তা হয়েছে, কতটি স্থানীয় খাবার নতুন বাজার পেয়েছে এবং পর্যটনের আয় থেকে কতটুকু প্রকৃতি সংরক্ষণে ফিরে যাচ্ছে। কারণ সুন্দরবনের মূল্য শুধু তার গাছপালা কিংবা বাঘে নয়। গবেষণায় সুন্দরবনের পর্যটনসেবার অর্থনৈতিক মূল্যও পরিমাপ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই কোনো একটি দর্শনীয় স্থান নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের অসমাপ্ত গল্প। এই গল্পকে যদি গবেষণা, প্রযুক্তি, স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে সাতক্ষীরাকে আর সুন্দরবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পরিচয় দিতে হবে না। বরং একদিন পর্যটকের প্রশ্ন হতে পারে, “সুন্দরবন দেখতে এসেছি ঠিকই, কিন্তু সাতক্ষীরার সেই জীবন্ত গবেষণাগারটি কোথায়?” সেদিনই বুঝব, সাতক্ষীরার পর্যটন বদলেছে।আর তার আগে বদলাতে হবে আমাদের চোখ।
লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।












