দেশ ঘুরলেই দেশ গড়ে
মো. মামুন হাসান
ঈদের ছুটি এলেই দেশের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের ভিড় বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দুবাই, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যাওয়া মানুষের ছবি। অনেকের কাছে এখন বিদেশ ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রবণতার ভেতরে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। আমরা কি অজান্তেই নিজের দেশের পর্যটন খাতকে দুর্বল করে দিচ্ছি?
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনোদনমূলক ভ্রমণের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসা, শিক্ষা বা ব্যবসায়িক কারণে ভ্রমণ স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু অবকাশ যাপনের জন্য যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দেশের ভেতরেই ব্যয় হলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় ব্যবসা এবং হাজারো তরুণ উদ্যোক্তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারত।
বিশ্বের বহু দেশ পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে গড়ে তুলেছে। অনেক দেশ তাদের আয়ের বড় অংশ পর্যটন থেকে অর্জন করে। বাংলাদেশও চাইলে এই খাতে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিনের প্রবাল দ্বীপ, সাজেকের পাহাড়ি সৌন্দর্য, রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সবুজ, রাত্রির জলাবন রাটারগুল, কুয়াকাটার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়ের প্রাচীন নিদর্শন, লালবাগ কেল্লার ইতিহাস, বিছানাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান বাংলাদেশের পর্যটনকে অনন্য করে তুলেছে।
এছাড়া বাংলাদেশের রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব, বৈসাবি, বাউল গান, লোকনৃত্য, গ্রামীণ মেলা, জামদানি বয়নশিল্প, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প এবং চা বাগানের জীবনধারা পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বল্প দূরত্বের ভ্রমণ। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কোনো ভিসা বা বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন নেই। অল্প সময় ও কম খরচে দেশ ভ্রমণ করা সম্ভব।
তবুও মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে। কারণ তারা শুধু সৌন্দর্য নয়, নিরাপত্তা, পরিষ্কার পরিবেশ, সেবার মান এবং স্বচ্ছ খরচ চায়। অনেক পর্যটন এলাকায় ছুটির সময়ে হোটেল ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা থাকে না, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত সহকারীর অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশে পর্যটন খাত এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব রয়েছে। প্রতিটি পর্যটন এলাকাকে উন্নত করতে প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো, মানসম্মত সেবা, নিরাপদ পরিবহন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা।
উৎসবভিত্তিক ভ্রমণ পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ, দুর্গাপূজা, নববর্ষ ও শীতকালীন ছুটিকে কেন্দ্র করে বিশেষ ভ্রমণ প্যাকেজ চালু করা গেলে মধ্যবিত্ত পরিবার সহজেই দেশ ভ্রমণে আগ্রহী হবে। ট্রেন, বাস, আবাসন ও খাবার একত্রে যুক্ত করে সাশ্রয়ী ভ্রমণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাসফর আরও কার্যকর করা দরকার। শিক্ষার্থীরা যদি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সরাসরি দেখার সুযোগ পায়, তাহলে দেশ সম্পর্কে তাদের ভালোবাসা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাত। একজন পর্যটক যখন কোনো এলাকায় অর্থ ব্যয় করেন, তখন তা স্থানীয় মানুষের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। বিদেশ ভ্রমণ খারাপ নয়, কিন্তু নিজের দেশকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। নিজের দেশ না জেনে শুধু বিদেশমুখী হওয়া আত্মপরিচয়ের দুর্বলতা তৈরি করে।
বাংলাদেশ ছোট দেশ নয়, এটি সম্ভাবনার দেশ। এখানে নদী আছে, পাহাড় আছে, সমুদ্র আছে, বন আছে, ইতিহাস আছে, সংস্কৃতি আছে এবং মানুষের আতিথেয়তা আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং নিজের দেশকে নতুনভাবে দেখার মানসিকতা।
বছরে অন্তত একবার দেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এবং পর্যটন খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। নিজের দেশকে জানা, দেখা এবং অনুভব করাই দেশপ্রেমের অন্যতম সুন্দর প্রকাশ।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট






