সম্পাদকীয়: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট: বিপন্ন দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবন
চলমান তীব্র তাপদাহের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের জনজীবন এখন লোডশেডিংয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে বিদ্যুতের এই লাগামহীন বিভ্রাট কেবল মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তিই কেড়ে নেয়নি, বরং বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী খাত হিমায়িত চিংড়ি শিল্প, কৃষি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে। পর্যাপ্ত বিদ্যুতের অভাবে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে কারখানা মালিকদের প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিলের তুলনায় জেনারেটরের জ্বালানি খরচ কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় অনেক কারখানা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
হিমায়িত চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে এসব কারখানাকে ডিজেল সংগ্রহের জন্য প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। এই শিল্পকে গার্মেন্টস খাতের মতো অগ্রাধিকার দিয়ে সরাসরি ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া এবং বিশেষ বিদ্যুৎ ফিডারের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় এই রপ্তানি খাতটি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব কেবল শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আঘাত হেনেছে কৃষিখাতেও। বোরো চাষের এই ভরা মৌসুমে সেচ পাম্পগুলো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় মাঠের ফসল শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ডিজেল চালিত পাম্প ব্যবহার করে সেচ দিতে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একইভাবে, উপকূলীয় উপজেলা কয়রা, দেবহাটা ও আশাশুনিসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীদের আয় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ দিতে না পেরে নি¤œআয়ের মানুষগুলো এক মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চলমান এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ। প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের মূল্যবান সময়গুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করা বর্তমান যুগে অকল্পনীয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেক হওয়াটা গভীর এক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। উৎপাদন ঘাটতি মেনে নিলেও অন্তত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময়টুকুতে এবং সেচ মৌসুমে সুপরিকল্পিত লোডশেডিং সূচি প্রণয়ন করা একান্ত প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প এলাকা এবং সীমান্তবর্তী কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। বিদ্যুৎ বিভাগ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে অতি দ্রুত এই অচলাবস্থা নিরসন করতে হবে। নতুবা বিদ্যুৎ সংকটের এই নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও আগামী প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকে এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।











