খোলপাটুয়া নদীতে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন, ভাঙন বাড়ার শঙ্কা
এম এ হালিম, উপকূলীয় অঞ্চল (শ্যামনগর): সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তী ইউনিয়নের খোলপাটুয়া নদীতে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজার ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করে আসছে। এতে নদীর তীরবর্তী এলাকা, ফসলি জমি ও বসতভিটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ার পাশাপাশি নদীভাঙন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও রাত গভীর হলে খোলপাটুয়া নদীর কয়েকটি পয়েন্টে বালু উত্তোলনের তৎপরতা শুরু হয়। নদী থেকে উত্তোলন করা বালু নৌযান বা অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে নদীর কূলবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হলে রাতের আঁধারে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব।
বালু উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্রটি নদীর নির্দিষ্ট স্থান ব্যবহার ও বালু উত্তোলনের বিনিময়ে স্থানীয়ভাবে অর্থ আদায় করছে-এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে কারা এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত এবং কী পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত ও রাতের বেলায় অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, আইন ও সরকারি অনুমোদনের বাইরে ইচ্ছামতো নদী বা অন্য কোনো স্থান থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনের সুযোগ নেই। বিশেষ করে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর, বাঁধ, সড়ক, সেতু, জনবসতি, কৃষিজমি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়।
আইনবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও নৌযানের বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
খোলপাটুয়া নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন একটি এলাকায় অপরিকল্পিত বা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন ও পানির প্রবাহে পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, নদীর তীরের কাছাকাছি থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় তীরের মাটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে বসতভিটা, কৃষিজমি ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে-দীর্ঘদিন ধরে যদি রাতের আঁধারে নদী থেকে বালু উত্তোলন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়?
স্থানীয়দের দাবি, শুধু দিনের বেলায় অভিযান পরিচালনা না করে রাতের সময়েও নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদীর কোন অংশ বালুমহাল হিসেবে অনুমোদিত কি না, সেখানে বালু উত্তোলনের সরকারি অনুমতি রয়েছে কি না এবং অনুমোদিত থাকলেও নির্ধারিত শর্ত মানা হচ্ছে কি না-এসব বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার।
খোলপাটুয়া নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ দাবি করেছেন। তাদের মতে, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় মানুষের বসতভিটা ও সম্পদ রক্ষায় নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা জরুরি।
তারা বালু উত্তোলনের স্থানগুলো সরেজমিন পরিদর্শন, রাতের বেলায় অভিযান, উত্তোলনে ব্যবহৃত নৌযান ও সরঞ্জামের বৈধতা যাচাই এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
খোলপাটুয়া নদী উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই নদী থেকে বালু উত্তোলন বৈধ অনুমোদনের আওতায় হচ্ছে কি না, সেটি যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরী।











