দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার মানুষের কাছে ‘জলাবদ্ধতা’ কোনো নতুন শব্দ নয়, বরং এটি তাদের জীবনের এক বার্ষিক অভিশাপ। সম্প্রতি মাত্র এক রাতের ১৪৬ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল যেভাবে পানিতে তলিয়ে গেছে, তা আবারও প্রমাণ করল যেÑআমাদের নগর পরিকল্পনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকাগুলোতে হাঁটুসমান পানি জমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়া এবং মানুষের ঘরে সাপ-খোপ ঢুকে পড়ার মতো পরিস্থিতি কোনো আধুনিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের চিত্র হতে পারে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ অত্যন্ত যৌক্তিক। বিশ বছর ধরে এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চলছেন তারা। ‘দক্ষিণবঙ্গের অক্সফোর্ড’ খ্যাত সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড, মাছখোলা এলাকা কিংবা কলারোয়ার ঐতিহ্যবাহী বেত্রবতী আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ দেবনগর ও শ্রীফলকাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ পানিতে ডুবে থাকার দৃশ্য শুধু শিক্ষার পরিবেশকেই ব্যাহত করছে না, বরং আমাদের কোমলমতি শিশুদের চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। খাবার পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিপর্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে, দিনমজুর ও ভ্যানচালকদের মতো খেটে খাওয়া মানুষ কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা।
মূল সংকট কোথায়? স্থানীয়দের অভিযোগ পরিষ্কারÑঅপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব, ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং স্লুইস গেটগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকা।
নতুন সরকারের অধীনে নদী ও খাল খননের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং আশাব্যঞ্জক। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আশ্বাসের পরিপ্রক্ষিতে বলা যায়, শহরের প্রাণসায়ের খালের সাথে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংযোগ সচল করা এবং স্লুইস গেটগুলো সময়মতো খুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে এই কাজগুলো শুধু কাগজের পরিকল্পনা বা সাময়িক সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা।
আমরা মনে করি, সাতক্ষীরার এই চিরচেনা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে জেলা প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একযোগে কাজ করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথগুলো সচল করা, অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে খাল ও জলাশয় উদ্ধার করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠ ভরাট ও উঁচুকরণ এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকারের সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সুফল যেন সাতক্ষীরার মানুষ বাস্তবে পায়Ñসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।