যানজট নিরসনে বিশেষ উপ-কমিটি: শহরবাসীর প্রত্যাশা
আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় জেলা সাতক্ষীরা। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মৎস্য সম্পদ এবং কৃষিতে ঈর্ষণীয় অবদান রাখলেও এই জেলার প্রাণকেন্দ্র সাতক্ষীরা শহর আজ একটি ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন, আর তা হলো নিত্যনৈমিত্তিক ভয়াবহ যানজট। শহরের নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম এখন এই যানজট। সম্প্রতি এই অবর্ণনীয় ভোগান্তি থেকে শহরবাসীকে মুক্তি দিতে যানজট নিরসনে একটি বিশেষ উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং শহরবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে, অতীতের নানা ব্যর্থ উদ্যোগের অভিজ্ঞতায় নাগরিকরা চান, এবারের পদক্ষেপগুলো যেন কেবল কাগজে-কলমে বা সাময়িক কোনো ‘পেইনকিলার’ না হয়ে স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা হয়। নবগঠিত এই উপকমিটির কাছে সাতক্ষীরা বাসীর প্রত্যাশা অনেক, যা বাস্তবায়িত হলে শহরের চেহারা পাল্টে যেতে পারে।
যানজট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সবার আগে আঙুল তোলা হয় শহরের ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও রিকশার দিকে। এটা সত্য যে, এসব যানের বিশৃঙ্খল চলাচল যানজটের একটি দৃশ্যমান দিক। কিন্তু এটিই কি মূল কারণ? শহরের সচেতন নাগরিকদের মতে, যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে কেবল ইজিবাইক বা ভ্যানকে দায়ী করাটা সমস্যার মূল শিকড় থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার শামিল। যানজটের প্রকৃত ও প্রধান কারণ হলো অপ্রশস্ত সড়ক এবং সড়কের দুই পাশের ভয়াবহ অবৈধ দখল।
একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, আজ থেকে ৩০ বছর আগে সাতক্ষীরা শহরের সড়কগুলো যতটা প্রশস্ত ছিল, তিন দশক পর আজকের দিনে এসেও সেই সড়কগুলোর প্রশস্ততা এক ইঞ্চিও বাড়েনি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে শহরের জনসংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ২ লাখে দাঁড়িয়েছে। মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেড়েছে, মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন বেড়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা। কিন্তু যে সড়ক দিয়ে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করবে, তার কোনো সম্প্রসারণ হয়নি।
উল্টো সড়কের দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট, স্থাপনা ও ফুটপাত দখলের মহোৎসব। জনসংখ্যা ও যানবাহনের স্বাভাবিক বৃদ্ধির বিপরীতে সড়কের এমন স্থবিরতা এবং সংকোচনই বর্তমান যানজটের মূল কারণ। সংকীর্ণ রাস্তা গুলো শহরের বিপুল সংখ্যক যানবাহনকে সামলাতে না পেরে রীতিমত ধুকছে। তাই কেবল খেটে খাওয়া মানুষের ইজিবাইক বা ভ্যান বন্ধ করে বা দমন করে এই সমস্যার বিন্দুমাত্র স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়।
সমস্যা সমাধানে আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর দিকে তাকালে চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। একসময় খুলনা, যশোর, মাগুরা কিংবা কুষ্টিয়া জেলা শহরগুলোতে সাতক্ষীরার চেয়েও ভয়াবহ যানজট ছিল। সেখানকার নাগরিক জীবনেও নেমে এসেছিল চরম স্থবিরতা। কিন্তু সেই জেলাগুলোর প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা যানজটের জন্য কেবল যানবাহনকে দোষারোপ করে বসে থাকেননি। তারা সমস্যার গভীরে গিয়েছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন যে, আধুনিকায়নের সাথে সাথে যানবাহন বাড়বেই, একে দমিয়ে রাখা বোকামি।
প্রতিটি জেলা শহরের প্রশাসন মনোযোগ দিয়েছেন সড়ক প্রশস্ত করণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে। আজ খুলনা বা যশোরের প্রধান সড়কগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় প্রশস্ত রাস্তা, যেখানে নির্বিঘেœ সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। তারা যানবাহনকে দোষ না দিয়ে সড়ক প্রশস্ত করে যানজট সমস্যার যুগান্তকারী সমাধান করেছেন।
যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনায় যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে আমাদের শহরে তার এক দশমাংশও যানবাহন চলাচল করে না, তারপরও কেন আমাদের সাতক্ষীরায় এতো যানজট? এর একটিই কারণ অপ্রশস্ত সড়ক। সাতক্ষীরা শহরের যানজট নিরসনে গঠিত উপকমিটিকেও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর এই সফল মডেল অনুসরণ করতে হবে। যানবাহনের সংখ্যা কমানোর অবাস্তব চিন্তার চেয়ে সড়ক প্রশস্ত করার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের ও সুদূর প্রসারী কাজ।
দুই লক্ষ নাগরিকের শহরে মাত্র ৯০০ ইজিবাইক অবশ্যই জনগণের জন্য প্রতুল নয়। সড়ক বৃদ্ধি করার বদলে যানবাহনের গলা চেপে ধরলে সেটি বরং উল্টো জনগণের জন্য যাতায়াতের সমস্যার সৃষ্টি তৈরি করতে পারে। এই শহরে অনেক সরকারি অফিস আদালত, স্কুল, কলেজ, ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই শহরে চলাচল করে। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের গাড়ীতে চলাচল করলেও সাধারণ জনগণ এই ইজিবাইকের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং অবিবেচক ভাবে ইজিবাইকের গলা চেপে ধরলে যানবাহনের অভাবে সাধারণ মানুষকেই কষ্ট পেতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে শহরে রেল লাইন, বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে শহরে মানুষ ও যানবাহনের সংখ্যা যৌক্তিক ভাবে আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন এই রাস্তা গুলো কিভাবে যানবাহনের চাপ সামাল দিবে? তখন কি প্রশাসন মানুষকে হেটে পথ চলতে বাধ্য করবে?
সাতক্ষীরা শহরকে যানজট মুক্ত, আধুনিক ও বাসযোগ্য করতে হলে শহরের প্রধান সড়কগুলোকে অবশ্যই চার-লেনে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি শহরের শিরা-উপশিরা হিসেবে পরিচিত সংযোগ সড়কগুলো প্রশস্ত করা এখন সময়ের দাবি। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য সড়কের পাশের সমস্ত অবৈধ স্থাপনা বিনা দ্বিধায় উচ্ছেদ করতে হবে।
বিশেষ করে শহরের কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চার-লেনে রূপান্তর করা জরুরি। বাঁকাল থেকে পলিটেকনিক কলেজ পর্যন্ত সড়কটি শহরের প্রধান ব্যস্ত একটি সড়ক। বর্তমান ট্রাফিক লোড নিতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েছে এই সড়কটি। এটিকে খুব দ্রুত প্রশস্ত করে চার-লেনে উন্নীত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। খুলনা রোড মোড় থেকে বিনেরপোতা পর্যন্ত সড়কটি সাতক্ষীরার প্রবেশদ্বার হিসেবে এই অংশে সব সময় ভারী ও মাঝারি যানবাহনের চাপ থাকে। চার-লেন সড়ক ছাড়া এই রুটের যানজট কমানো কোনও ভাবে সম্ভব নয়। লাবণী মোড় থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা পর্যন্ত শহরের ভেতরের এই সড়কটি শহরের সবচেয়ে অপ্রশস্ত সড়ক। এটি প্রশস্ত করা হলে অভ্যন্তরীণ যানজট অর্ধেকের বেশি কমে যাবে।
সড়ক প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পাকাপোল মোড়। এই মোড়টি শহরের অন্যতম প্রধান ট্রাফিক জংশন। কিন্তু জায়গাটি অত্যন্ত সঙ্কুচিত হওয়ায় এখানে সবসময় তীব্র যানজট লেগেই থাকে। এই মোড়টিকে প্রশস্ত ও আধুনিক করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো মোড় সংলগ্ন সদর থানা। শহরবাসীর যৌক্তিক দাবি হলো, পাকাপোল মোড়কে প্রশস্ত করার স্বার্থে সদর থানাকে শহরের অন্য কোনো সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তর করা হোক। সদর থানা স্থানান্তরিত হলে ওই বিশাল জায়গাটি ব্যবহার করে একটি দৃষ্টিনন্দন ও প্রশস্ত মোড় তৈরি করা সম্ভব হবে, যা শহরের যানজট নিরসনে গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে।
কেবল সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও সমানভাবে জরুরি। যানজট নিরসনে উপকমিটির কাছে শহরবাসীর আরও কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে: শহরের প্রধান প্রধান মোড়গুলোতে (যেমন- খুলনা রোড মোড়, পাকাপোল মোড়, নিউমার্কেট মোড়, আমতলা মোড় ইত্যাদি) বিজ্ঞানসম্মত ও প্রশস্ত গোলচত্ত্বর তৈরি করা অবশ্যই উচিত। গোলচত্বর থাকলে যানবাহনের গতি বাধাপ্রাপ্ত হলেও তা সম্পূর্ণ থেমে থাকে না, ফলে সিগন্যালে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার ভোগান্তি কমে যায়।
শহরের যানজট সমস্যার সমাধানের আরেকটি পদক্ষেপ হতে পারে বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তর। শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালকে দ্রুত শহরের বাইরে বাইপাসের ধারে স্থানান্তর করতে হবে। এটি করলে টার্মিনাল এলাকার যানজট অনেকাংশে কমে যাবে। তবে বাস টার্মিনাল দূরে চলে গেলে শহরে চলাচলের জন্য আরও বিপুল সংখ্যক ইজিবাইককে অনুমোদন দিতে হবে। তখন যানবাহন হ্রাস করলে মানুষ কষ্ট পাবে, আবার যানবাহন বাড়ালে যানজট বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বারবার ইজিবাইকের গলা চেপে ধরার কারণে শহরে প্রচুর পরিমাণে ভ্যানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাতক্ষীরা শহরে যানজটের জন্য আরেকটি কারণকে দায়ী করা হয়, আর সেটি হচ্ছে শহরে বাস পার্কিং। যানজটের এই কারণটি এক দিক থেকে সঠিক আবার অন্য দিক থেকে ভুল। সাতক্ষীরা শহরের সড়ক গুলো এতোটাই সরু যে রাস্তার উপর একটি বাস দাঁড়ালেই ওভারটেক করার পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে পিছনের সকল যানবাহনকে বাধ্য হয়ে দাড়িয়ে পড়তে হয়। শুধু বাস কেন সামান্য একটি ইজিবাইক বা মহেন্দ্রা দাড়িয়ে পড়লেও এই সড়কে চলাচলকারী সকল যানবাহনকে পিছনে লাইন দিয়ে দাড়িয়ে পড়তে হয় সরু রাস্তার কারণে।
সড়ক প্রশস্ত করতে গেলে স্বভাবতই সড়কের জায়গা দখল করে থাকা অবৈধ স্থাপনা অপসারণের প্রশ্ন আসবে। আর এখানেই প্রয়োজন হবে প্রশাসনের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-ভেটখালী সড়কে যেভাবে সাহসের সাথে, সমস্ত ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, তা সাতক্ষীরাবাসীর মনে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। মানুষ দেখেছে, প্রশাসন চাইলে আইন প্রয়োগ করে সড়কের জমি উদ্ধার করতে পারে।
শহরের ভেতরেও ঠিক একই রকম সাহসিকতার প্রয়োজন। সব ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের রক্তচক্ষু এবং ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের এই কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। উপ-কমিটিকে মনে রাখতে হবে, গুটি কয়েক দখলদারের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে ২ লাখ মানুষের ভোগান্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
সাতক্ষীরা শহরের যানজট নিরসনে নবগঠিত বিশেষ উপ-কমিটির কাঁধে এখন এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। তারা যদি গতানুগতিক ধারায় কেবল ট্রাফিক পুলিশ বাড়িয়ে বা ব্যাটারিচালিত রিকশা আটকে সমস্যার সমাধান খুঁজতে যান, তবে তা অতীতের মতোই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। শহরবাসী চায় একটি স্থায়ী, আধুনিক এবং টেকসই সমাধান।
সড়ক প্রশস্ত করা, চার-লেনে উন্নীত করা, সদর থানা স্থানান্তর করে পাকাপোল মোড় প্রশস্ত করা, গোলচত্বর নির্মাণ এবং একমুখী সড়ক চালুর মতো কাঠামোগত পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। আর এই পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হলো অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আপসহীন উচ্ছেদ অভিযান। সাতক্ষীরা-ভেটখালী সড়কের মতো শহরের বুকেও প্রশাসনের বুলডোজার চলুক, উদ্ধার হোক সড়কের প্রাণ।
২ লাখ নগরবাসীর এই যৌক্তিক প্রত্যাশাগুলো পূরণে বিশেষ উপ-কমিটি দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এমনটাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চাওয়া। একটি সুন্দর, যানজট মুক্ত ও আধুনিক সাতক্ষীরা শহর কেবল স্বপ্ন নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও সাহসী বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা হাতের মুঠোতেই রয়েছে। আর তা না হলে এই শহর দ্রুতই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
লেখক: আল মুতাসিম বিল্লাহ সুমন, রাজার বাগান, সাতক্ষীরা।









