ঈদপূর্ব ৬ দিনে ১৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৬১
অনলাইন ডেস্ক: ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বেদগ্রাম এলাকায় গতকাল দুপুরে একটি যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। পটুয়াখালীর গলাচিপায় মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন আরো দুজন। একই দিন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে অটোরিকশা ও ট্রাকের মধ্যে সংঘর্ষে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ঈদের দিন দুপুরের মধ্যে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। দুপুরের পরও বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে ঈদের আগের দিন অর্থাৎ গত বুধবার সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ২১ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত সারা দেশে ১৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬১ জন। এ হিসাবে ঈদের আগে প্রতিদিন গড়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮৯ জন।
আরেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঈদের আগে ২৪ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তিনদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ধারণা করছেন, ২৭ ও ২৮ মে সারা দেশে সংঘটিত দুর্ঘটনার হিসাব পাওয়া গেলে গত পাঁচদিনে সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে।
এবার ঘরমুখো ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা ও হতাহত বেশি হয়েছে মন্তব্য করে সাইদুর রহমান বলেন, ‘সাধারণত দেখা যায়, ঈদের ঘরমুখো যাত্রার চেয়ে ফিরতি যাত্রায় দুর্ঘটনার হার দুই থেকে তিন গুণ বেশি হয়। এর পেছনে লএনফোর্সমেন্ট এজেন্সির শিথিলতা, ছুটির শেষ দিনে একসঙ্গে ফেরার তাড়া এবং পকেটের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার মতো মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঈদের শুরুতেই মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে (যেমন: ২৭ তারিখ ও তার পরবর্তী সময়ে) নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।’
ঈদে আগে সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বড় দুর্বলতা ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সরকার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধ বন্ধ করতে পারেনি। সরকারিভাবে নির্ধারিত ভাড়াই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, তার ওপর বেসরকারি বাসের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতিকে আরো শোচনীয় করে তুলেছে। সম্প্রতি যে ১৫ জন মানুষ একসঙ্গে মারা গেলেন, তারা মূলত অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে গিয়ে কম খরচে বিকল্প উপায়ে (যেমন: ট্রাক বা পিকআপে) ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন।’
গত বছর ঈদুল আজহার সময়ও ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার হার কাছাকাছি ছিল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে গত বছরের জুনে অনুষ্ঠিত ঈদুল আজহার আগে-পরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে গত মার্চে অনুষ্ঠিত ঈদুল ফিতরেও আগে-পরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়।বাংলাদেশে যেকোনো উৎসবের সময় সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর যেকোনো দেশে উৎসবের সময় সড়কের সক্ষমতার চেয়ে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। চাপ বাড়লে কিছুটা যানজট বা দুর্ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদের সময় যেভাবে লাশের মিছিল নামে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সারা বছর ধরে যদি আমরা সড়কের নিয়ম ও বিজ্ঞানসম্মত ট্রাফিক ব্যবস্থা মেনে চলার প্র্যাকটিস করি, তবে ঈদের মতো উপচে পড়া চাপের সময়েও দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা একটা নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যে রাখা অবশ্যই সম্ভব।’
সড়ক নিরাপত্তা আসলে কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি একটি সংস্কৃতি এবং সারা বছরের চর্চার বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতি বছর ঈদের আগে কাগজে-কলমে নানা হুঁশিয়ারি দেয়া হয়—আনফিট গাড়ি চলবে না, অবৈধ হাটবাজার বসবে না কিংবা দক্ষ চালক ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো বছরের স্বাভাবিক সময়ে যে নিয়ম আমরা কেউ মেনে চলি না, ঈদের মতো একটা অস্বাভাবিক সময়ে রাতারাতি তা কার্যকর করা অসম্ভব। শুধু ঈদের আগে প্রশাসনের হুঁশিয়ারি দিয়ে সড়ক নিরাপদ করা যাবে না, এর জন্য প্রয়োজন ৩৬৫ দিনের নিরবচ্ছিন্ন অভ্যাস। যদি সারা বছর ধরে নিয়ম মেনে রুট পারমিট ও ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হতো, চালকদের কর্মঘণ্টা বেঁধে দেয়া হতো, তবে ঈদের সময়ে এসে প্রশাসনকে এত হিমশিম খেতে হতো না।’
এবারের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার সক্ষমতার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন. ‘আমরা দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। তারপরও কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে ঘরমুখী ও ফিরতি—দুই যাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি শেষ হলেই মূলত এবারের যাতায়াতের প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যাবে।’
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ঘাটতি ছিল না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘গতবারের চেয়ে এবার আমাদের প্রস্তুতি আরো জোরদার করা হয়েছে। মহাসড়ক, জেলা প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি এবার বিআরটিএতেও আমরা কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছি। এছাড়া সারা দেশে গতবার যেখানে ২০-৩০টির মতো মনিটরিং স্পট ছিল, এবার তা বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করেছি। আমাদের যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে, তার পুরোটা উজাড় করে দিয়ে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’






