একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যায়ের সমাপ্তি, সাংবাদিকতার নয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
প্রথম আলোর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনের পর কল্যাণ ব্যানার্জী বয়সসীমা-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী অবসরে গেছেন। সংবাদপত্রের একটি প্রতিষ্ঠানে তাঁর দায়িত্বের এখানেই সমাপ্তি। কিন্তু সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর পথচলা থেমে যায়নি। তিনি এখনও সক্রিয়ভাবে সংবাদ পেশায় যুক্ত আছেন, বর্তমানে কাজ করছেন ডেইলি স্টার-এর সঙ্গে। ফলে এটি কোনো সাংবাদিকের বিদায় নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবু ঘটনাটি গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ একটি জাতীয় দৈনিকে দীর্ঘদিন কাজ করা কোনো সাংবাদিক কেবল সংবাদ পাঠান না; তিনি একটি জনপদের স্মৃতি, পরিবর্তন, সংকট ও সম্ভাবনার ধারাবাহিক সাক্ষী হয়ে ওঠেন।
একটি জেলার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা সম্পর্কে যে গভীর বোধ বছরের পর বছর মাঠে কাজ করার মাধ্যমে তৈরি হয়, সেটি সহজে অর্জন করা যায় না। সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি প্রযুক্তি, ক্যামেরা বা পরিচয়পত্রে নয়; এর শক্তি নিহিত থাকে বিশ্বাস যোগ্যতায়। আর বিশ্বাস যোগ্যতা তৈরি হয় সময়, সততা, ধৈর্য ও দায়িত ¡বোধের সমন্বয়ে।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক জানেন, কোন তথ্য প্রকাশের আগে আরও একবার যাচাই করতে হয়, কোন অভিযোগের বিপরীত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি এবং কোন সংবাদটি তাৎক্ষণিক আলোড়নের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বার্থে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতার কোনো শর্টকাট নেই। সাতক্ষীরার মতো একটি জেলার বাস্তবতা আরও জটিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উপকূলীয় মানুষের জীবন সংগ্রাম, নদী ও পরিবেশের সংকট, সীমান্ত-সংক্রান্ত নানা বিষয়, কৃষি, মৎস্য, দুর্যোগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমÑএসব নিয়ে ধারা বাহিকভাবে কাজ করতে হলে কেবল সংবাদ লেখার দক্ষতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এলাকার মানুষের আস্থা ও দীর্ঘ মাঠ-অভিজ্ঞতা। একজন অভিজ্ঞ জেলা প্রতিনিধির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।
অবশ্য কোনো প্রতিষ্ঠান কখনোই একজন মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে না। নতুন মানুষ আসবেন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ হবে, সাংবাদিকতা এগিয়ে যাবে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, একজন অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেলে তাঁর সঙ্গে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, কিছু সম্পর্ক, কিছু অভিজ্ঞতাও সরে যায়। নতুনরা সে সব গড়ে তুলবেন, তবে তার জন্য সময় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বয়সসীমা বা অবসরের নীতিমালা নতুন কোনো বিষয় নয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব নীতির ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি প্রশাসনিক বাস্তবতা। কিন্তু একজন সাংবাদিকের পেশাগত জীবন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যাঁদের লেখনী, সততা ও পেশাগত দক্ষতার প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে, তাঁরা অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে বা অন্য ভূমিকায় থেকেও সমাজের জন্য অবদান রাখতে পারেন। কল্যাণ ব্যানার্জীর বর্তমান পেশাগত অবস্থান সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। এই ঘটনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।
আমরা কি অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? একটি জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে সংবাদ পাঠানোর ক্ষেত্রে যে বিচক্ষণতা, তথ্যসূত্র গড়ে তোলার সক্ষমতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন, তা নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে? সংবাদ মাধ্যমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কেবল নতুন মুখের ওপর নয়; বরং অভিজ্ঞতা ও নবীন শক্তির সমন্বয়ের ওপর। বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা কঠিন এক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তার তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে গুজব, বিভ্রান্তি ও যাচাইহীন তথ্যের ঝুঁকি। এই সময়ে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তাঁরা জানেন, দ্রুত হওয়ার চেয়ে নির্ভুল হওয়া কেন বেশি জরুরি। জেলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় সংবাদ মাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা সমানভাবে শক্তিশালী হয়নি। পরিচয়পত্র পাওয়া সহজ হলেও বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জন সহজ নয়।
সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপস্থিতি অনেকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের উপস্থিতি নতুনদের জন্য একটি মানদ- তৈরি করে। তবে অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে নতুনদের সম্ভাবনাকেও খাটো করা উচিত নয়। প্রতিটি প্রজন্মই সাংবাদিকতায় নতুন চিন্তা, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে অভিজ্ঞতা পথ দেখাবে এবং নতুনরা সেই পথকে আরও প্রসারিত করবে। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেটি হবে পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনের প্রতিযোগিতা; ব্যক্তিগত বিরোধের নয়।
একটি জেলার সাংবাদিকতার মান নির্ধারণ হয় না সেখানে কতটি প্রেসক্লাব আছে, কতটি অনলাইন পোর্টাল আছে বা কতজন পরিচয় পত্রধারী ব্যক্তি আছেনÑতা দিয়ে। এর মান নির্ধারণ হয় কতটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, কতটা তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ পাচ্ছে, কতটা নিরপেক্ষভাবে মানুষের কথা তুলে ধরা হচ্ছে এবং কতটা সাহসের সঙ্গে জনস্বার্থের প্রশ্ন উত্থাপন করা হচ্ছেÑতা দিয়ে। কল্যাণ ব্যানার্জীর প্রথম আলো থেকে অবসর সেই অর্থে একটি উপলক্ষ। এই উপলক্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর প্রতিষ্ঠান নয়, তাঁর কাজ। একটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব শেষ হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার দায় শেষ হয় না।
সত্য অনুসন্ধান, মানুষের কথা বলা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব একজন পেশাদার সাংবাদিক সারাজীবন বহন করেন। সাংবাদিকতার ইতিহাসে ব্যক্তি আসবেন, ব্যক্তি যাবেন; প্রতিষ্ঠানও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে। কিন্তু টিকে থাকবে পেশার মৌলিক মূল্যবোধÑসত্য, নিরপেক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং জনস্বার্থ। এই মূল্যবোধ যত শক্তিশালী হবে, ততই শক্তিশালী হবে জেলা সাংবাদিকতা।
তাই কল্যাণ ব্যানার্জীর প্রথম আলো থেকে অবসরকে কেবল একজন সাংবাদিকের বিদায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ কর্মজীবনের সমাপ্তি, কিন্তু সাংবাদিকতার নয়। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়Ñঅভিজ্ঞতাকে সম্মান জানিয়ে নতুন প্রজন্মকে আরও দক্ষ, দায়িত্বশীল ও অনুসন্ধানী করে গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। কারণ শক্তিশালী জেলা সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশার প্রয়োজন নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজেরও অপরিহার্য শর্ত।
লেখক: সংবাদকর্মী









