কন্যা না পুত্র-সন্তানই জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি সন্তান যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে শুধু একটি পরিবারে নতুন সদস্য হিসেবে আসে না; সঙ্গে নিয়ে আসে অসংখ্য স্বপ্ন, প্রত্যাশা, আনন্দ এবং ভবিষ্যতের নতুন গল্প। একটি শিশুর জন্মের মুহূর্তে বাবা-মায়ের চোখে যে আলো ফুটে ওঠে, সেখানে ছেলে-মেয়ের কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তব সমাজে এখনো অনেক পরিবারে সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্ন সামনে আসেÑকন্যা, নাকি পুত্র? এই প্রশ্নটি শুধু একটি শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিক মানসিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের কিছু ধারণা। ছেলে হলে পরিবারের মুখে স্বস্তি, আর মেয়ে হলে কোথাও কোথাও উদ্বেগÑএই বৈষম্য আজও পুরোপুরি দূর হয়নি। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে সমাজ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, বদলেছে নারীর ভূমিকা। এখন কন্যাসন্তানকে শুধু বিয়ের পর অন্য বাড়িতে চলে যাবে এমন একজন সদস্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সে পরিবারের ভবিষ্যৎ, সমাজের শক্তি এবং রাষ্ট্রের সম্পদ। একইভাবে পুত্রসন্তানও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হয়ে যায় না। সন্তানকে মানুষ করে তোলার ওপরই নির্ভর করে সে ভবিষ্যতে কেমন হবে। আমাদের সমাজে ছেলে সন্তানকে ঘিরে কিছু প্রচলিত ধারণা এখনো শক্তিশালী। ছেলে বংশের নাম রাখবে, বাবা-মায়ের দেখাশোনা করবে, পরিবারের সম্পত্তি দেখবেÑএমন প্রত্যাশা বহু পরিবারে রয়েছে। অন্যদিকে মেয়েকে ঘিরে ভাবনা হলো, তাকে একদিন বিয়ে দিয়ে অন্য বাড়িতে পাঠাতে হবে। ফলে মেয়ের জন্মকে অনেক সময় ভবিষ্যতের ব্যয়ের সঙ্গে হিসাব করা হয়।কোনো সন্তান ভবিষ্যতে বাবা-মায়ের পাশে থাকবে কি না, সে ছেলে না মেয়ে তার ওপর তা নির্ভর করে না। নির্ভর করে তার শিক্ষা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর। বাস্তবে এমন অসংখ্য পরিবার আছে যেখানে কন্যাই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আবার এমন পরিবারও আছে যেখানে পুত্র থেকেও বাবা-মা একাকী জীবন কাটান।তাই সন্তানের লিঙ্গকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার মাপকাঠি বানানো বাস্তবসম্মত নয়।‘মেয়েরা একদিন পরের বাড়ি চলে যাবে’Ñএই ধারণাটি আমাদের সমাজে এতটাই প্রচলিত যে অনেক সময় মেয়ের নিজের পরিবারেও তাকে সাময়িক সদস্য হিসেবে দেখা হয়। অথচ একটি মেয়ের শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা, স্বপ্নÑসবকিছুই তার জন্মপরিবারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।বিয়ের পর তার ঠিকানা বদলাতে পারে, কিন্তু বাবা-মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা বদলায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিজের সংসার সামলানোর পাশাপাশি মেয়েরাই বাবা-মায়ের খোঁজ রাখে, চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, প্রয়োজনের সময় অর্থনৈতিক সহায়তা দেয় এবং মানসিকভাবে পাশে দাঁড়ায়।তাই ‘কন্যা পরের সম্পদ’ নয়। কন্যা নিজের পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন পূর্ণ মানুষ, যারও রয়েছে ভালোবাসার অধিকার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকার।গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের মেয়েদের অগ্রযাত্রা চোখে পড়ার মতো। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, আইন, সাংবাদিকতা, ব্যবসা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ক্রীড়াÑপ্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। একসময় যে পরিবারে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার কথা ভাবাই কঠিন ছিল, এখন সেই পরিবারের মেয়েরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, চাকরি করছে, ব্যবসা করছে এবং পরিবার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একজন শিক্ষিত কন্যা শুধু নিজের জীবন বদলায় না; তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। সে ছোট ভাই-বোনদের অনুপ্রেরণা হয়, বাবা-মায়ের চিন্তার জগৎ বদলায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করে।তাই কন্যাসন্তানের শিক্ষা কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয়; এটি একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কন্যাসন্তানকে ছোট করার বিপরীতে পুত্রসন্তানকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও সমান ক্ষতিকর। অনেক বাবা-মা ভাবেন, ছেলে বড় হলে পরিবারের সব দায়িত্ব নেবে। এই প্রত্যাশা থেকে ছেলের ওপর কখনো কখনো এমন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা তার নিজের স্বপ্ন ও মানসিক বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে। একজন ছেলেকেও মানুষ হিসেবে বড় হতে দিতে হবে। তারও আবেগ আছে, ভয় আছে, ব্যর্থতা আছে, স্বপ্ন আছে। তাকে শুধু পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কিংবা বংশের ধারক হিসেবে গড়ে তোলা উচিত নয়। একজন ভালো ছেলে যেমন পরিবারের জন্য গর্বের, তেমনি একজন ভালো মেয়ে। আবার ছেলে বা মেয়েÑকেউই জন্মগতভাবে ভালো বা খারাপ নয়। পরিবার, শিক্ষা, পরিবেশ এবং নিজের সিদ্ধান্তই একজন মানুষকে গড়ে তোলে। আমাদের সমাজে অনেক সময় সন্তানকে ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। ছেলে বড় হয়ে আয় করবে, মেয়েকে ভালো পরিবারে বিয়ে দেওয়া হবেÑএমন চিন্তা থেকেই সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হয়।তার নিজেরও একটি জীবন আছে। তার নিজস্ব স্বপ্ন আছে। সে কী হতে চায়, কী করতে চায়, কীভাবে জীবন কাটাতে চায়Ñএসব বিষয়েও তার মতামতের মূল্য রয়েছে।বাবা-মায়ের দায়িত্ব সন্তানকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া, ভালো শিক্ষা দেওয়া, সঠিক মূল্যবোধ শেখানো এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। এরপর সে যে পথ বেছে নেবে, সেখানে তাকে সহযোগিতা করাই ভালো অভিভাবকত্বের পরিচয়। ছেলে-মেয়ের বৈষম্য শুধু সমাজ তৈরি করে না; এর শুরু অনেক সময় পরিবার থেকেই। ছেলের পড়াশোনায় বেশি খরচ করা, মেয়েকে ঘরের কাজে বেশি ব্যস্ত রাখা, ছেলের ভুলকে ক্ষমা করা কিন্তু মেয়ের ভুলকে কঠোরভাবে বিচার করাÑএসব ছোট ছোট আচরণ থেকেই বৈষম্যের বীজ তৈরি হয়।একটি মেয়ে যখন দেখে তার ভাই বাইরে খেলতে পারে কিন্তু তাকে ঘরের কাজ করতে হয়, তখন তার মনে একটি ধারণা জন্ম নেয়Ñসে হয়তো কম গুরুত্বপূর্ণ। আবার একটি ছেলে যখন দেখে তার বোনের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তখন সেও শিখে যায় যে ছেলে হওয়া মানেই বেশি অধিকার। এই মানসিকতা বদলাতে হলে পরিবারের ভেতর থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে। কন্যা ও পুত্রকে সমান সুযোগ দেওয়া মানে শুধু সমান অর্থ ব্যয় করা নয়। এর অর্থ হলোÑদুজনের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, দুজনের শিক্ষা নিশ্চিত করা, দুজনকে নিরাপদ রাখা এবং দুজনকেই নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।মেয়েকে শুধু রান্না শেখানো যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি ছেলেকেও শুধু উপার্জন শেখানো যথেষ্ট নয়। দুজনকেই জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখাতে হবে। ঘরের কাজ, অর্থ ব্যবস্থাপনা, মানুষের প্রতি সম্মান, দায়িত্ববোধ, সততাÑএসব শিক্ষা ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যই জরুরি।এই প্রশ্নের উত্তর ছেলে বা মেয়ের জন্মের সঙ্গে লেখা থাকে না। যে সন্তান বাবা-মায়ের ভালোবাসা পেয়েছে, দায়িত্বের শিক্ষা পেয়েছে এবং সম্পর্কের মূল্য বুঝেছে, সে-ই একদিন পাশে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বেশি রাখে। আজকের দিনে কন্যারা যেমন কর্মজীবনে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি পুত্রদেরও ঘর-সংসার ও বাবা-মায়ের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত। দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই পরিবারের প্রকৃত সৌন্দর্য। একজন বাবা যখন মেয়ের ছোট্ট হাত ধরে হাঁটেন, তখন সেখানে ভবিষ্যতের বিয়ের খরচের হিসাব থাকার কথা নয়। সেখানে থাকে শুধু ভালোবাসা।একজন মা যখন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, তখন তার মনে ভবিষ্যতের উপার্জনের হিসাব থাকার কথা নয়। সেখানে থাকে সন্তানের নিরাপত্তা ও সুখের আকাক্সক্ষা।তাই কন্যাসন্তান জন্মালে তাকে বোঝা ভাবার কোনো কারণ নেই। পুত্রসন্তান জন্মালে তাকে ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা ভাবারও কোনো কারণ নেই। দুজনকেই সমান ভালোবাসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে হবে।সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন একটি শিশুর জন্মের খবর শুনে প্রথম প্রশ্ন হবে নাÑ‘ছেলে না মেয়ে?’বরং প্রশ্ন হবেÑ‘মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ তো?’ আর বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত একটাইÑ‘সে আমার সন্তান।’ কন্যা কিংবা পুত্রÑলিঙ্গ নয়, তার মানুষ হয়ে ওঠাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারকে বড় করে তার সন্তানের সংখ্যা নয়, সন্তানের মানবিকতা, শিক্ষা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। লেখক-সংবাদকর্মী






