দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেলের প্রয়োজনীয়তা
মো. মামুন হাসান
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। বন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ছয় লাখ এক হাজার সাতশ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত এই বন দেশের মোট আয়তনের চার দশমিক তেরো শতাংশ। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এই তিন জেলার মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা ও পরিচয়ের সঙ্গে এই বন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রসার লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে, আর এই প্রবণতা যতটা সম্ভাবনার, ঠিক ততটাই ঝুঁকিরও। তাই দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেল প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখন আর নিছক একটি নীতিগত আলোচনা নয়, বরং জরুরি বাস্তবতা।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুন্দরবনে ভ্রমণ করেছেন দুই লাখ ষোলো হাজার একশ তেতাল্লিশ জন পর্যটক, যাদের মধ্যে দেশি পর্যটক দুই লাখ চোদ্দ হাজারের বেশি এবং বিদেশি পর্যটক মাত্র দুই হাজার একশ তেতাল্লিশ জন। এই ভ্রমণ থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছে তিন কোটি চুরানব্বই লাখ টাকার বেশি। ব্যাপক পরিসরে হিসাব করলে সুন্দরবনের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যেখানে মৎস্য, কাঠ, মধু ও পর্যটন সব খাত অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যাগুলো স্পষ্ট করে দেয়, সুন্দরবন কেবল একটি সংরক্ষিত বন নয়, এটি একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক ইঞ্জিনও বটে। তবে এখানেই একটি বৈষম্য চোখে পড়ে, বনের অর্থনৈতিক অবদান আর তার সংরক্ষণে বরাদ্দকৃত সম্পদের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
পর্যটন স্পটের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঐতিহ্যবাহী কটকা, কচিখালি, দুবলার চর, হিরণ পয়েন্ট, হাড়বাড়িয়া, কলাগাছিয়া ও করমজলের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে শরণখোলার আলীবান্ধা, চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক, খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কৈলাশগঞ্জ। মোট এগারোটি পর্যটন স্পট আজ পর্যটকদের গ্রহণ করছে। তবে স্পট সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো, নজরদারি ও পরিবেশগত সুরক্ষার সম্প্রসারণ একই গতিতে হয়নি, যা উদ্বেগের একটি বড় কারণ।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সুন্দরবনের নদী ও খাল ঘেঁষে জোয়ারভাটার প্লাবনভূমিতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, যা পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। গবেষকদের মতে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অনুপস্থিতি। আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবন ঘিরে অন্তত পঁয়ত্রিশটি রিসোর্ট কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। বনভূমির সংরক্ষিত এলাকায় বিনিয়োগ যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে যে ক্ষতি হবে, তা কোনো স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
পরিবেশ দূষণ সুন্দরবনের জন্য আরেকটি জরুরি সমস্যা। নীলডুমুর বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে যান, যা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নদীতে গিয়ে পড়ে। এই বছরের চার থেকে ছয় মে তারিখে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের উদ্যোগে কটকা, জামতলা, কচিখালি, ডিমের চর ও আন্দারমানিক এলাকায় তিন দিনের পরিষ্কার অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে প্লাস্টিক বোতল, কাচের বোতল, পরিত্যক্ত জাল ও সোলার প্যানেলের ভাঙা অংশ সংগ্রহ করা হয়। বন বিভাগও নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। তবে এ ধরনের পর্যায়ক্রমিক অভিযান দিয়ে প্রতিদিনের বর্জ্য উৎপাদনের গতি সামাল দেওয়া কঠিন, যদি না পর্যটকের আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আসে এবং প্রবেশদ্বারেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো শক্তিশালী করা হয়।
ইতিবাচক দিক হলো, বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় সুন্দরবন সুরক্ষায় টাইগার রেসপন্স টিম, ডলফিন টিম ও পেট্রোল ইউনিটের কার্যক্রমের পাশাপাশি ইকো ট্যুরিজম গাইডলাইন এবং সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ী ও বনজীবীদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশকারীদের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে ইকোট্যুরিজম সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় হরিণের বেষ্টনী ও নতুন অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, যা সঠিক দিকনির্দেশনার একটি উদাহরণ। তবে অভিজ্ঞতা বলে, নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে তার বাস্তবায়নের মধ্যে সাধারণত বড় একটি ব্যবধান থেকে যায়। এই ব্যবধান দূর করতে না পারলে সুন্দরবনের সংকট কেবল কাগজে কলমেই সমাধান হবে, বাস্তবে নয়।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বড় একটি অংশ এই জেলাকে সড়কপথে সুন্দরবন দর্শনের বিরল সুযোগ দিয়েছে, যা দেশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। এই ভৌগোলিক সুবিধা সাতক্ষীরার স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় সম্ভাবনা, তবে একই সঙ্গে এটি একটি দায়ও বটে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সুযোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই সাতক্ষীরার স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী ও বন বিভাগের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো কঠিন হবে।
দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেল প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি পর্যটন স্পটের বহন ক্ষমতা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করে দৈনিক পর্যটক সংখ্যা সীমিত রাখা। দ্বিতীয়ত, প্রবেশদ্বারেই প্লাস্টিকমুক্ত ভ্রমণ নীতি বাধ্যতামূলক করা এবং বর্জ্য ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রাখা। তৃতীয়ত, প্রতিটি রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরকে পরিবেশগত সনদায়নের আওতায় আনা, যাতে অনুমোদনহীন স্থাপনা তৈরির সুযোগ না থাকে। চতুর্থত, স্থানীয় গাইড, নৌকা মালিক ও বনজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই আয়ের সংস্থান নিশ্চিত করা, যাতে সংরক্ষণ কার্যক্রমে তাদের প্রকৃত অংশীদারিত্ব তৈরি হয়। শেষত, ঘোষিত নীতিমালা ও গাইডলাইনের বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা।
সুন্দরবন যে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্য বহন করে, তার তুলনায় তার সংরক্ষণে বিনিয়োগ এখনও যথেষ্ট নয়। পর্যটন যদি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে যে সম্পদ আজ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, আগামী দিনে তা হয়ে উঠতে পারে অপরিবর্তনীয় ক্ষতির উৎস। দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেল তাই কেবল একটি নীতিগত সুপারিশ নয়, এটি সুন্দরবন এবং তার ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা








