নিকোলাস বিশ্বাস
প্রতিদিন শহর, নগর ও গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নের নামে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। রাস্তা, ভবন, শিল্পকারখানা, আবাসন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের জন্য বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। আমরা প্রায়ই এসব কর্মকা-কে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু এই উন্নয়নের বিনিময়ে আমরা কী হারাচ্ছি, তা খুব কমই বিবেচনা করি। বাস্তবে, আমরা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো-গাছ ও বনভূমি-ধীরে ধীরে ধ্বংস করছি।
গাছ কেবল আমাদের চারপাশের সৌন্দর্য বাড়ায় না। তারা জীবন্ত ব্যবস্থা, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য সেবা দিয়ে যায়। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ও কার্বন সঞ্চয় করে, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং বায়ুম-লে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব কমাতে ভূমিকা রাখে। গাছপালা বায়ুর মান উন্নত করে, পরিবেশ ঠান্ডা রাখে, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখে, জীববৈচিত্র্যকে সহায়তা করে এবং প্রতিবেশব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তোলে।
গাছ হলো প্রাকৃতিক অবকাঠামো
অবকাঠামো বলতে আমরা সাধারণত রাস্তা-ঘাট, সেতু, নিষ্কাশনব্যবস্থা, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক ও ভবনের কথা বুঝি। কিন্তু প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছ তার অন্যতম মূল্যবান অংশ।
গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, বায়ুর দূষণ কমাতে সাহায্য করে এবং ছায়া ও প্রাকৃতিক শীতলীকরণের মাধ্যমে শহরের তাপমাত্রা কমায়। তারা বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে এবং মাটিকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। বন, পার্ক ও একক গাছও পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অসংখ্য জীবের আবাসস্থল।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে গাছ ধ্বংস করা মানে নিজেদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিনষ্ট করা।
উন্নয়নের গোপন মূল্য
উন্নয়ন কোন সমস্যা নয়। মানুষের বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা-ঘাট, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান প্রয়োজন। সমস্যা হয় যখন উন্নয়নের পরিকল্পনায় প্রকৃতির মূল্যকে উপেক্ষা করা হয়।
একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ তার পরিবেশগত সক্ষমতায় পৌঁছাতে কয়েক দশক সময় নিতে পারে, অথচ সেটি কেটে ফেলতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। একটি ছোট চারা লাগালেই সেই পুরোনো গাছের পরিবেশগত সেবা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসে না। নতুন গাছকে ছায়া, কার্বন সঞ্চয়, আবাসস্থল ও অন্যান্য সুবিধা দিতে বহু বছর সময় লাগে। ফলে একটি অদৃশ্য পরিবেশগত ঋণ তৈরি হয়।
গাছের সংখ্যা কমে গেলে রাস্তা ও শহর আরও উত্তপ্ত হতে পারে, বায়ুর মান খারাপ হতে পারে, পানি জমা ও ভূমিক্ষয় বাড়তে পারে এবং জীববৈচিত্র্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। এর পরিণতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যয়ও অনেক বাড়ে।
শহরে আগের চেয়ে বেশি গাছ প্রয়োজন
নগরায়ন দ্রুত বাড়ছে। শহরগুলো কংক্রিট, কালো পিচ-ঢালা পথ ও কাঁচে তৈরী ভৌত অবকাঠামোয় ভরে যাচ্ছে, যা তাপ শোষণ ও ধরে রাখে এবং নগরে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তাপবলয় সৃষ্টি করে।
গাছ এই সমস্যার একটি প্রাকৃতিক সমাধান। তাদের ছায়া মানুষ ও ভবনকে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে এবং উদ্ভিদের বাষ্পমোচন পরিবেশকে ঠান্ডা করতে সাহায্য করে। গাছঘেরা রাস্তা হাঁটা ও বসবাসের জন্য আরামদায়ক। পার্ক ও নগর-বন মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ দেয়। তাই ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গাছকে ঐচ্ছিক সৌন্দর্যবর্ধক উপাদান নয়, বরং অপরিহার্য নগর অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়
বন কেবল অনেকগুলো গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল প্রতিবেশব্যবস্থা, যেখানে গাছ, উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব, মাটি ও পানি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
বন ধ্বংস হলে আমরা শুধু গাছ হারাই না। পাখি হারায় বাসা বাঁধার স্থান, কীটপতঙ্গ হারায় খাদ্যের উৎস এবং বন্যপ্রাণী হারায় আশ্রয়। মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়ে এবং পানি ব্যবস্থাও বিঘিœত হয়। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রতিবেশব্যবস্থার সহনশীলতা দুর্বল করে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের অক্সিজেন কারখানা ধ্বংস হচ্ছে
“আমরা নিজেরাই আমাদের অক্সিজেন কারখানা ধ্বংস করছি” -এই বক্তব্যটি আধুনিক সমাজের একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরে। আমরা জীবনের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর করি, অথচ সেই জীবনধারণের পরিবেশ টিকিয়ে রাখা প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোই আমরা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করছি।
গাছ বৈশ্বিক কার্বন ও অক্সিজেন চক্রের অংশ। তবে বনের গুরুত্ব শুধু অক্সিজেন উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। তারা কার্বন সঞ্চয় করে, স্থানীয় জলবায়ুকে প্রভাবিত করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, মাটি সংরক্ষণ করে এবং পানি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। একটি প্রাচীন বন ধ্বংস করে হটাৎ পরিবেশগত কার্যক্রম প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
প্রকৃতি কোনো ঐচ্ছিক সুবিধা নয়
অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার পূরণের পর প্রকৃতি রক্ষা করা যাবে – এমন ধারণা মৌলিকভাবে ভুল। কারণ অর্থনীতিও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।
কৃষি নির্ভর করে মাটি, পানি, পরাগায়নকারী জীব ও স্থিতিশীল জলবায়ুর ওপর। শহর নির্ভর করে কার্যকর পানি ও নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর। মানুষ নির্ভর করে শ্বাসযোগ্য বায়ু ও সহনীয় তাপমাত্রার ওপর। ব্যবসা ও অবকাঠামো নির্ভর করে বন্যা, ঝড় ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। তাই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আলাদা নয়। বরং এটি অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ও পরিপূরক।
গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছ রক্ষা করতে হবে
গাছ লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও সবুজ এলাকা সম্প্রসারণে সহায়তা করে। কিন্তু শুধু নতুন চারা লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যমান পূর্ণবয়স্ক গাছ ও বনভূমিও রক্ষা করতে হবে।
একটি বড় গাছ কেটে অন্য কোথাও একটি চারা লাগানোকে সমতুল্য পরিবেশগত বিনিময় বলা যায় না। তাই বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি সংরক্ষণও জরুরি।
একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতগুলো চারা বিতরণ করা হয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং কতগুলো গাছ বেঁচে আছে, বেড়ে উঠেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশে অবদান রাখছে- তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।
উন্নয়ন-এর নতুন সংজ্ঞা
উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কংক্রিটে ভরা কিন্তু গাছহীন শহরকে সবসময় সফল বলা যায় না। প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংসের কারণে যে জনগোষ্ঠী বন্যার ঝুঁকিতে থাকে, তাকে সহনশীল বলা যায় না। যেমন কিছুদিন আগে চট্রগ্রাম শহর সহ অন্যান্য অঞ্চলে বহু ভবনের নীচতলা বন্যায় ডুবে যায়। পরিবেশ ধ্বংস করে যে অর্থনীতি গড়ে ওঠে, তা আগামী দিনের জন্য বিশাল ব্যয়ের ঝূঁকি তৈরি করে।
প্রকৃত অগ্রগতি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের সমন্বয়ে। রাস্তা-ঘাট, সেতু ও ভবনের পাশাপাশি বন, জলাভূমি, নদী, পার্ক ও গাছকেও অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করা, প্রকৃতিকে ক্রমাগত প্রতিস্থাপন করা নয়।
প্রতিটি গাছের একটি গল্প আছে
পরেরবার কোনো গাছ লাগানো, রক্ষা বা সংরক্ষণ করার সময় শুধু তার ছায়ার কথা ভাববেন না। ভাবুন-সে কতটা কার্বন সঞ্চয় করবে, কীভাবে বায়ু পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে, কীভাবে তাপ কমাবে এবং মাটির গুণাগুণ রক্ষা করবে। ভাবুন – কত পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য জীব তার ওপর নির্ভর করবে। ভাবুন – ভবিষ্যতে কোনো শিশু হয়তো তার ছায়ায় বসবে। একটি গাছ শুধু জমি দখল করে থাকা উদ্ভিদ নয় কিংবা বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরীর জন্য নয়। বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি উত্তম বিনিয়োগ।
নেপালের বন্যা ও আমাদের শিক্ষা
প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বড় হুমকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও খরার মতো দুর্যোগে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরই ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গেছে গত ২৬ আগস্ট ২০২৬, নেপালে। হিমালয় অঞ্চলে বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের পর আকস্মিক বন্যা নেপালের রসুয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বন্যার স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হন। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
উপসংহার: মানুষ একদিকে প্রাকৃতিক অবকাঠামো ধ্বংস করবে, অন্যদিকে সেই ক্ষতি পূরণে কৃত্রিম ব্যবস্থা তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করবে – এভাবে চলতে পারে না। গাছ ও বনভূমির ক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
সরকারকে বিদ্যমান বন ও গাছপালা রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শহর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জনগণকে গাছ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে অংশ নিতে হবে। গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ নয়- এটি একটি নিরাপদ ও সহনশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন।
গাছের সেবা অপরিহার্য, নিরবচ্ছিন্ন এবং অধিকাংশ সময় অদৃশ্য। গাছের মূল্য শুধু কাঠ বা জমির দামের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। এগুলো প্রাকৃতিক অবকাঠামো, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল এবং জলবায়ু সুরক্ষার অংশ।
গাছ কেটে উন্নয়ন করা কোন বিবেচনাপ্রসূত কাজ নয়। বরং আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত: আমরা যদি অক্সিজেন তৈরীর এই প্রাকৃতিক কারখানাটিকে ক্রমাগত ধ্বংস করতেই থাকি, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন ভবিষ্যৎ রেখে যাব! এই প্রশ্নই আজ আমাদের সকলের কাছে! লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (টঘঋচঅ) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত