কারিগরি শিক্ষায় সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক মুক্তির পথ
মো. মামুন হাসান
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-অর্থনৈতিক পরিম-লে কোনো দেশের সমৃদ্ধি এখন আর কেবল তার ভৌগোলিক আয়তন বা ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে না বরং তা আবর্তিত হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়নের ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছাইভস্ম থেকে জার্মানির ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠা, প্রাকৃতিক সম্পদহীন সিঙ্গাপুরের গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ক্যাপিটাল হয়ে ওঠা কিংবা সুইজারল্যান্ডের উচ্চ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নেপথ্যে কোনো জাদুমন্ত্র ছিল না; ছিল তাদের সুদূরপ্রসারী কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা দর্শন। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের ভোকেশনাল অ্যান্ড প্রফেশনাল এডুকেশন মডেল বিশ্বের অন্যতম সেরা যেখানে প্রায় সত্তর শতাংশ তরুণ উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত সনদের পেছনে না ছুটে সরাসরি কর্মমুখী শিক্ষায় প্রবেশ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে।
বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই ক্ষণসন্ধিতে বৈশ্বিক শ্রমবাজার অতি দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে যেখানে সনাতন তত্ত্বীয় সনদের চেয়ে বাস্তবভিত্তিক কর্মদক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তির প্রায়োগিক জ্ঞানকে সবচেয়ে বড় মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ যখন একটি মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ অর্থনীতির দিকে ধাবমান, তখন দেশের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত অবহেলিত অথচ বিপুল সম্ভাবনাময় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরাকে কেন্দ্র করে একটি কৌশলগত ও রূপান্তরমূলক অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে। মৎস্য সম্পদ, আধুনিক লবণসহিষ্ণু কৃষি, উদীয়মান তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিশেষ করে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ঘিরে এই জেলার যে ভূ-অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষার এক যুগান্তকারী ও আমূল সংস্কার।
আমাদের প্রচলিত উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা যেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার উচ্চ শিক্ষিত ডিগ্রিধারী বেকার তৈরি করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা বাড়াচ্ছে, সেখানে জার্মানির বিখ্যাত ডুয়েল এডুকেশন সিস্টেম আমাদের জন্য একটি চোখ খুলে দেওয়া মডেল হতে পারে। সেই ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী ক্লাসরুমের চেয়ে বেশি সময় কাটায় সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে। ফলে শিক্ষা জীবন শেষ করার আগেই তারা একেকজন উৎপাদনশীল বৈশ্বিক পেশাজীবী হিসেবে গড়ে ওঠে। ঠিক একইভাবে সিঙ্গাপুর তাদের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোকে সরাসরি বাজারের চাহিদার সাথে যুক্ত করে শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। সাতক্ষীরাতেও এই ধরনের একটি ফলপ্রসূ বৈশ্বিক মডেলের প্রয়োগ কেবল সম্ভবই নয় বরং অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক আপিলকে কাজে লাগিয়ে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগকে কেন্দ্র করে এখানে একটি উচ্চতর স্কিল ডেভেলপমেন্ট হাব বা দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। সনাতন গৎবাঁধা পর্যটনের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক চাহিদার সাথে মিল রেখে যদি এখানে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট ম্যানেজমেন্ট, ওয়াইল্ডলাইফ বা বন্যপ্রাণী পর্যটন, আন্তর্জাতিক ফুড প্রোডাকশন, গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম এবং ডিজিটাল ট্রাভেল মার্কেটিংয়ের মতো বিশেষায়িত কোর্সগুলো চালু করা যায়, তবে সাতক্ষীরার তরুণরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের ফ্রন্টলাইনারে পরিণত হতে পারবে এবং জেলা থেকে বেকারত্ব শব্দটি চিরতরে মুছে যাবে।
সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক মহাপরিকল্পনা তুলে ধরা প্রয়োজন যা এই অঞ্চলের পুরো দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। প্রথমত, সাতক্ষীরায় একটি সুন্দরবন ট্যুরিজম স্কিল ইনোভেশন সেন্টার বা পর্যটন দক্ষতা উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বর্তমান বিশ্বে ইকো ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেবল একটি ভ্রমণের মাধ্যম নয় বরং এটি একটি মাল্টি বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক শিল্প। সুন্দরবনের অনন্য ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম, উপকূলীয় লোকসংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরায় কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম বা জনসম্পৃক্ত পর্যটনের এক বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করা সম্ভব।
এই প্রস্তাবিত ইনোভেশন সেন্টারে আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বহুজাতিক ভাষা শিক্ষা বিশেষ করে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ ও ম্যান্ডারিন ভাষা, কাস্টমার রিলেশনস এবং আন্তর্জাতিক আতিথেয়তার ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বমানের ল্যাবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর ফলে স্থানীয় তরুণরা কেবল গাইড বা সাধারণ কর্মী হিসেবে নয় বরং আন্তর্জাতিক মানের ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর, নেচার ফটোগ্রাফার ও ইকো রিসোর্ট উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, যা দেশের ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতিতেও বড় ধরনের গতি আনবে।
দ্বিতীয়ত, সাতক্ষীরার সামগ্রিক অর্থনীতি মৎস্য ও কৃষি খাতের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই ঐতিহ্যবাহী খাত দুটিকে আধুনিকায়ন করতে এখানে একটি মৎস্য ও লবণসহিষ্ণু কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারিগরি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সাতক্ষীরার বাগদা ও গলদা চিংড়ি হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা হিসেবে খ্যাত হলেও সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক বৈশ্বিক লজিস্টিকস জ্ঞানের অভাবে আমরা বিশ্ববাজারের বিশাল অংশ হারাচ্ছি।
কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে যদি স্থানীয় যুবসমাজকে মৎস্য চাষের আধুনিক বায়োফ্লক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক উপায়ে হ্যাচারি পরিচালনা, হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক ফুড সেফটি স্ট্যান্ডার্ডস বা হাইজিন কোড বিষয়ে ডিপ্লোমা ও বিশেষায়িত সার্টিফিকেট প্রদান করা যায়, তবে সাতক্ষীরা থেকে সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে প্রিমিয়াম মূল্যে সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উপযোগী লবণসহিষ্ণু আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং স্মার্ট কৃষি যন্ত্রপাতি চালনার ওপর কারিগরি প্রশিক্ষণ দিলে স্থানীয় পর্যায়ে লাখ লাখ গ্রামীণ তরুণের জন্য নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং তারা পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাবে।
তৃতীয়ত, ভৌগোলিক সীমানার বাধা পেরিয়ে সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন তরুণও যাতে ভারতের বেঙ্গালুরু মডেলের মতো ঘরে বসেই বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে, সে জন্য জেলাটিতে একটি স্মার্ট ট্যুরিজম অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যা হবে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য প্রকৃত গেম চেঞ্জার। এই বিশেষায়িত পার্কে অ্যাডভান্সড আইটি, থ্রিডি গ্রাফিক ডিজাইন, প্রফেশনাল ভিডিও এডিটিং, ড্রোন টেকনোলজি পরিচালনা, ডিজিটাল বুস্টিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
সাতক্ষীরার তরুণদের আইটি সেক্টরে দক্ষ করে তুলতে পারলে তারা আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। এর পাশাপাশি হসপিটালিটি সেক্টরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে দক্ষ শেফ, হোটেল ম্যানেজার বা ক্রুজ শিপ কর্মীর বিপুল চাহিদা রয়েছে, সাতক্ষীরার তরুণদের সেই আন্তর্জাতিক মানদ-ে তৈরি করতে পারলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে এক নতুন জোয়ার আসবে। একই সাথে ফুড প্রসেসিং, ফ্যাশন ডিজাইনিং এবং অনলাইন এন্টারপ্রেনারশিপের মাধ্যমে নারীদের কারিগরি শিক্ষায় ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে পারলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়ন সুদৃঢ় করবে ও সমাজ থেকে বৈষম্য কমিয়ে আনবে।
একটি দেশের টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একাডেমিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মধ্যকার নিবিড় যোগসূত্র যা আমাদের দেশে প্রায় অনুপস্থিত। সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ জেলার অন্যান্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ, পর্যটন অ্যাসোসিয়েশন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সাথে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্ত করা যায়, তবে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম একটি বিশেষায়িত স্কিল বেইজড ইকোনমিক জোন বা দক্ষতাভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আজকের পৃথিবীতে মানুষই সবচেয়ে বড় মূলধন, যদি তাকে উপযুক্ত কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করা যায়।
সরকারের জাতীয় উন্নয়ন রূপরেখায় সাতক্ষীরাকে একটি বিশেষায়িত দক্ষতা ও পর্যটনভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে সুপরিকল্পিত সরকারি বিনিয়োগ ও আধুনিক ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে, এই জেলা কেবল অবহেলিত কোনো জনপদের সম্ভাবনার গল্প হয়ে থাকবে না বরং তা হবে পুরো বাংলাদেশের জন্য কারিগরি দক্ষতা, আধুনিক উদ্ভাবন এবং টেকসই কর্মসংস্থানের এক অনন্য ও অনুকরণীয় জাতীয় মডেল। নীয় নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই পারে সাতক্ষীরার এই সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলে দেশের মূল অর্থনৈতিক গ্রোতে এক বিশাল রূপান্তর ঘটাতে।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট









