গল্প/পদক
সাজেদা সুলতানা কলি
সকাল বেলায় পত্রিকার পাতায় চোখ পড়তেই নিলীমা চমকে ওঠে! হাতে লেখা একটি পা-ুলিপির ছবির নিচে লেখা- ‘এই হাতের লেখা কার? উপযুক্ত প্রমাণসহ খোজ চাই।’ এটা কিভাবে সম্ভব! এতকিছু হয়ে গেছে অথচ সে কিছুই জানলো না! সে কি তাহলে একবার পত্রিকা অফিসে যোগাযোগ করবে? স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। তবু বড় ম্যাডামকে ফোন করে ছুটি নিল নীলিমা। পাঁচ বছরের চাকরিজীবনে এমনটা সে কখনো করেনি। :বাবা, তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে? মন খারাপ করে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছ? একটু বলেও তো যাও না। আমি তাহলে কিভাবে বাঁচবো? নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। তোমার স্বাস্থ্যও তো পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। আমার তো এখন তোমাকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। বাবার গা থেকে শার্টটা খুলে বাতাসে মেলে দিতে দিতে নীলিমা কথাগুলো বলল, : কোথাও যাইনি। তোর মায়ের কবরটা দেখে আসলাম। চারপাশে ঝোঁপঝাড়ে কবরটা আড়াল হয়ে গেছে। সেগুলো সরিয়ে দিয়েছি। বেঁচে থাকতে তো কখনো যতœ করিনি। এখন যতœ করে ঋণ শোধ করার চেষ্টা করছি। কথাটা বলে, হু হু করে কেঁদে উঠে নীলিমার বাবা।
সায়রা আর মুজাফ্ফরের বিয়ে হয়েছে পারিবারিকভাবে। মুজাফ্ফর মফস্বল শহরের একটা কলেজের বাংলার প্রভাষক। সায়রার বাবা ছেলে কলেজে পড়ায় শুনে বিয়েতে আর দ্বিমত করেননি। অনার্সে ভর্তির কয়েক মাস পর সায়রার বিয়ে হয়ে যায়। পড়াশোনাও চলছিল। নিলীমা যখন পেটে আসলো তখন শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিশেষ করে শ্বাশুড়ী সায়রাকে আর কলেজে যেতে দেননি। মেয়ের জন্মের পর থেকে সায়রা পুরোপুরি সংসারী হয়ে উঠেছে। এখন তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান মেয়ে নিলীমাকে বড় করা ।
কলেজের সময়টুকু ছাড়া মুজাফফরের অখ- অবসর। সে শিক্ষকতার পেশায় গেছেও এই অবসরটুকুর জন্য। তার প্রচুর বই পড়ার নেশা। একসময় লেখালেখিও শুরু করে। মাস শেষে সায়রার হাতে বেতনের টাকাটা তুলে দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ। প্রথম দিকে “নিয়ে সায়রা রাগারাগি করতো। এখন সে আর কিছু বলে না। মুজাফফরও স্বাধীন। অবসরে বই পড়া আর লেখালেখি ছাড়া তার কোনো কাজ নেই।
সুখের সংসারে ঝড় উঠলো একদিন। সায়রা পেটের ব্যথায় ছটফট করছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো গলব্লাডারে পাথর। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন যত তাড়াতাড়ি পাথর অপসারণ করা যায় তত মঙ্গল। কিন্তু ব্যথার ওষুধ খেয়ে আরাম পাওয়ায় বিষয়টা সায়রা আর গুরুত্ব দেয়নি। এদিকে মুজাফফর তো আগে থেকেই উদাসীন। যেদিন সায়রা ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সেদিন মুজাফফরকে কিছুটা বিচলিত দেখা গেল। কারণ এবার সায়রার অসুস্থতা চিকিৎসার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। তার পেটের ভেতর কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে । নিলীমা তখন এইচএসসি পড়ছে। মেয়ের পড়ার খরচ আর মায়ের চিকিৎসার খরচ নিয়ে ভাবতে গিয়ে মুজাফ্ফর এলোমেলো হয়ে গেছে। সায়রা চলে গেল চিরতরে। নিলীমা তখন সদ্য এইচএসসি পাশ করে বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ।
মুজাফ্ফর তিন বছর ধরে একটা উপন্যাস লিখেছে। সায়রা মাঝে মাঝে দুষ্টুমি কওে বলতো, ‘আমি মরে যাবো তবুও তোমার এই উপন্যাস শেষ হবে না। একটা উপন্যাস লিখতে যদি এত সময় লাগে তাহলে হুমায়ুন আহমেদ কিভাবে এত বই লিখলেন?’ সবার লেখার ধাঁচ এক নয়। আমি চাই আমার উপন্যাস কালজয়ী হবে। তাই সময় নিয়ে লিখছি। মুজাফফরের এই উত্তর শুনে সায়রা কি ভাবলো কে জানে। আর কিছু না বলেসে রান্না ঘরে চলে গেলো। এর ক’দিন পরই সায়রা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সত্যি সত্যিই মুজাফফর উপন্যাস শেষ করতে পারেনি। সারাজীবন লেখালেখি করে কি লাভ হলো? আজ পর্যন্ত একটা লেখা মূলধারার পত্রিকায় ছাপা হলো না। অবশ্য এলাকা ভিত্তিক লিটল ম্যাগাজিনে অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু এতে তো মন ভরে না। সায়রা চলে যাওয়ার পর সে এখন বই পড়ে না। লেখার কাগজ কলম ছুঁয়েও দেখে না। সুযোগ পেলেই চলে যায় স্ত্রীর কবরের কাছে। অনেক দিন হলো মুজাফফর পুরোপুরি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেছে। এখন আর দিন রাত নেই। সবসময়ই সায়রার কবরের কাছে বসে কি যেন বিড়বিড় করে। প্রথম দিকে নিলীমা কোথাও খুঁজে না পেলে চিন্তিত হতো। এখন জানে তার বাবা মায়ের কবর ছেড়ে কোথাও যায় না।
অনিরুদ্ধ বাংলা সাহিত্যের ছাত্র এবং পরম ভক্তও। তার অদ্ভুত একটা শখ আছে। সে পুরনো বইয়ের দোকান খুঁজে খুঁজে বের করে। আর সেখান থেকে সংগ্রহ করে এমন কিছু বই যেগুলোর লেখককে কেউ চেনে না। মাত্র একটা বা দুটি বই প্রকাশ হয়েছে এমন লেখকের বইয়ে তার বুক শেলফ ঠাসা। তার যুক্তি হলো যে লেখক তার সারা জীবনে মাত্র একটা বই লিখেছেন সেটাতে তিনি তার সমস্তটা ঢেলে দিয়েছেন। তাই নিশ্চিত, এই বইটি হবে অসাধারণ। সেরকম একটা পুরনো বইয়ের দোকানে গিয়ে বই নাড়াচাড়া
করতে গিয়ে অনিরুদ্ধ পেয়ে গেলো চমৎকার একটা মাস্টারপিস!
অনেকগুলো পুরনো বইয়ের ভেতরে পা-ুলিপিটা পেয়েছিলো অনিরুদ্ধ। উল্টে পাল্টে দেখে দোকানীকে জিজ্ঞেস করল, : এটা কার? আমি কি এটা নিতে পারি? একতাড়া কাগজ দেখে দোকানী তাচ্ছিল্যের
সুরে বললো, ‘এটা দিয়ে আমরা কি করবো! নিয়ে যান।’ পা-ুলিপিটা পড়ে অনিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিলো এটা সে ছাপাবে। কিন্তু অসমাপ্ত পা-ুলিপি কোনো প্রকাশক নিচ্ছিল না। কারণ এটার শেষের বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা ছুটে গেছে। শেষ পর্যন্ত অনিরুদ্ধ সেটা গুছিয়ে নিয়ে বই আকারে ছাপলো। নীলিমা আজকে স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছে। হলরুম লোকজনে পরিপূর্ণ। প্রধান অতিথি আসলেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। অনিরুদ্ধও এসেছে। নিলীমার সাথে কথা বলছে সে। সেদিন পত্রিকায় অনিরুদ্ধের ‘খোঁজ চাই’ বিজ্ঞপ্তি দেখে নীলিমা তার সাথে দেখা করে। দৈনিক পূর্ববাংলা পত্রিকার আয়োজনে আজকে এখানে অনেক খ্যাতিমানের মিলনমেলা বসেছে। অতিথিদের বক্তব্য শেষে আসলো পুরস্কার প্রদানের পালা। নীলিমা ধীর এবং শান্ত পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ করে সে মাইকে ঘোষণা করে বসলো, ‘এই পুরস্কার আমি প্রত্যাখ্যান করলাম। এটা গ্রহণ করা মানে তিলে তিলে আমার নিজেকে শেষ করে দেওয়া। অনুষ্ঠান স্থলে গুঞ্জন উঠলো, কী ব্যাপার! কী হলো! সব তো ঠিকই ছিলো! নীলিমার বক্তব্য শুনে বোঝা গেল আসলে কিচ্ছু ঠিক নেই। নীলিমা বলতে শুরু করে- ‘সেদিন পত্রিকায় ‘সেরা বইয়ের পুরস্কার অর্জন’ কথাটার পাশে হাতে লেখা একটা কাগজের ছবির নিচে লেখা ছিলো, ‘এই হাতের লেখা কার? উপযুক্ত প্রমাণসহ খোঁজ চাই’। আমি দেখেই বুঝতে পেরেছি এটা আমার বাবার হাতের লেখা। পত্রিকা অফিস থেকে খোঁজ পাই অনিরুদ্ধের। বাবা মারা যাওয়ার পর আমি সব বই কাগজওয়ালার কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। ওখানে বাবার লেখা একটা উপন্যাসের পা-ুলিপি ছিলো। যেটা নিয়ে বাবা প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। যেটা লিখতে গিয়ে বাবা আমার মাকে কখনো সময় দেয়নি। মৃত্যুশয্যায় আমার মা অভিমান নিয়ে বাবাকে বলেছিলো, ‘এখন থেকে তুমি লেখালেখি নিয়ে থাকতে পারবে। কেউ কিছু তোমাকে বলবে না।’ সেই অপরাধবোধ থেকে বাবা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অপ্রকৃতিস্থ ছিলো। আমি সংসার করিনি, বাবাকে তাহলে কে দেখবে ? আমার বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ। বাবার জন্য তো আমি ছিলাম। আমার জন্য কে আছে? আজ আমার বাবা বেঁচে নেই। এই পদক দিয়ে কি হবে? বেঁচে থাকতে মানুষটাকে কেউ দেখেনি। এখন এই সম্মান আমার কাছে অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়।’ বলে, নীলিমা কান্নায় ভেঙে পড়ে। পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা। অনিরুদ্ধ ও বাষ্পায়িত কণ্ঠে বলে উঠলো, ‘মানুষ বেঁচে থাকতে যদি তার বেতিভার স্বীকৃতি না পায়, মৃত্যুর পরের স্বীকৃতিতে তার কি আসে যায়? লেখক মুজাফফর হোসেন তাঁর জীবদ্দশায় একটি ভালো দৈনিক পত্রিকায়ও নিজের ভাপানো লেখা দেখেননি। এখন এই পদক কি তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারবে? নীলিমার জায়গায় আমি হলেও পদক প্রত্যাখ্যান করতাম। নীলিমা মঞ্চ ছেড়ে নেমে আসে। হলরুম তখনো নিস্তব্ধ।












