মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩

জাতীয় আইন সহায়তা দিবস: সেবাগ্রহীতাদের ৭৫ শতাংশই নারী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ
জাতীয় আইন সহায়তা দিবস: সেবাগ্রহীতাদের ৭৫ শতাংশই নারী

রাজধানীর নিম্ন আদালত পাড়ায় সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রে (লিগ্যাল এইড) আসা মানুষের ভিড় জানান দিচ্ছে, সমাজে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীরা কতটা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দপ্তরে আসা মোট সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে প্রতি চারজনের মধ্যে তিন জনই নারী।

চাঁঁদপুর থেকে এসে সকাল থেকে লিগ্যাল এইড অফিসের সামনে বসে আছেন বসে আছেন লিলি বেগম।কোলে রয়েছে ছোট্ট একটি সন্তান। আরও এক সন্তানকে বাসায় রেখে এসেছেন নানির কাছে।তার সাথে আছেন দুজন নারী। লিলি বেগম ভারাক্রান্ত মনে জানান, তার স্বামীর সাথে ৮ বছরের সংসার। দুইটা সন্তান তাদের।কিন্তু এখন স্বামী কোনো খোঁজ খবর নেয়না। এমনকি ভরনপোষণ দেয়না।এর জন্য দু’সন্তান নিয়ে বেকায়দায় পরে আছেন লিলি বেগম। তার স্বামী শেখ সাজু আহমেদ ঢাকার চকবাজারের বাসিন্দা। স্বামীর বিরুদ্ধে ভরনপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আইনি সহায়তা নিতে এখানে এসে বসে আছেন। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ১২ টার দিকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যালয়ের সামনে ভুক্তভোগী এই নারীকে দেখা গেছে।

লিলি বেগম ছাড়াও এখানে বিভিন্ন সমস্যায় পরে আইনি সহায়তা নিতে বসে আছেন অনেকেই।এদের সিংহভাগই নারী।এদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ঢাকার কামরাঙ্গীচর থেকে এসেছেন এক নারী।তার স্বামী অন্য কাউকে বিয়ে করে আর খোঁজ নিচ্ছে না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ নারী বলেন, অভাবের সংসার এমনিতেও। এই অবস্থায় শুনছি স্বামী অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে। কোনও কূল না পেয়ে এখানে চলে এসেছি আইনি সহায়তা নিতে।দেখি কি হয়।

রাজধানীর নিম্ন আদালত পাড়ায় সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রে (লিগ্যাল এইড) আসা নারীদের ভিড় জানান দিচ্ছে, সমাজে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীরা কতটা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দপ্তরে আসা মোট সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে প্রতি চারজনের মধ্যে তিন জনই নারী, যারা মূলত পারিবারিক নির্যাতন বা অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আইনি সুরক্ষার সন্ধানে এসেছেন।

​ভুক্তভোগী নারীদের সংখ্যা

পরিসংখ্যান বলছে, আইনি পরামর্শ নিতে আসা ৩ হাজার ৪ শো ৫৮ জনের মধ্যে ২ হাজার ৬ শো ১৩ জনই ছিলেন নারী। সমীকরণ অনুযায়ী ​নারী ভুক্তভোগী মোট সেবাগ্রহীতার ৭৫.৫৬ ভাগ।বাকি ​ ২৪.২০ ভাগ (৮৩৭ জন) পুরুষ ।এরমধ্যে ​তৃতীয় লিঙ্গ ০.২৩ ভাগ (৮ জন) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইনি সংকটে পড়া নারীরাই পুরুষদের তুলনায় ৩ গুণ বেশি সাহায্যের জন্য লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

​পারিবারিক মামলা ও অপরাধের চিত্র

অসহায়ত্বের এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয় মামলার ধরণ দেখলে। এক বছরে জমা পড়া ২হাজার ১৪২টি মামলার মধ্যে বিশাল একটি অংশ পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের।লিগ্যাল এইডের গত এক বছরের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক মামলা এসেছে ১ হাজার চারশো ২৬ টি। যা মোট মামলার সমীকরণে ৬৬.৫৫ ভাগ।

​ফৌজদারি মামলা ৩৯৬টি যা মোট মামলার ১৮.৪৮ ভাগ। ​দেওয়ানী মামলা ৩২০ টি যা সমীকরণে ১৪.৯৪ ভাগ। অর্থাৎ, লিগ্যাল এইডে আসা প্রতি ১০টি মামলার মধ্যে অন্তত ৭টিই পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মামলার সিংহভাগই দেনমোহর আদায়, ভরণপোষণ বা নির্যাতনের অভিযোগ কেন্দ্রিক।

আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও মামলার জট কমাতে ২০২৫ সালে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা (এডিআর)-এ বিশেষ সাফল্য দেখা গেছে। এ সময়ে সর্বমোট ২ হাজার ৬২ টি মামলার মধ্যে, মামলাপূর্ব (প্রি কেইস) ৭৯৯টি বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া আদালতে বিচারাধীন (পোস্ট কেইস) ১৩১টি মামলার মধ্যে ৪৪টি বিরোধ আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমে শেষ হয়েছে। এই মধ্যস্থতার মাধ্যমেই ভুক্তভোগীরা সোয়া কোটি টাকার বেশি পাওনা বুঝে পেয়েছেন।এটি মূলত অসহায় মানুষের পাওনা,নারীদের দেনমোহর বা খোরপোশের টাকা যা দীর্ঘ আইনি লড়াই ছাড়াই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

​ ২০২৫ সালে কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ৯৬৩ জন কারাবন্দির আইনি সহায়তার আবেদন বা মামলা লিগ্যাল এইড অফিসে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে বিভিন্ন আদালত থেকে আরও ১১৪টি মামলা আইনি সহায়তার জন্য এই দপ্তরে রেফার করা হয়েছে।

লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে শতভাগ আইনি সহায়তা পেয়েছেন এমন একজন নারীর সাথে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। বেসরকারি প্রজেক্টে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা ওই নারী তার স্বামীর সাথে পারিবারিক বিভিন্ন ঝামেলা নিয়ে বহুদিন আদালতে ঘুরে পরে লিগ্যাল এইডের শরণাপন্ন হন।সেখানে যাওয়ার পরে মাত্র একটি তারিখের মধ্যে গত বছরের আগস্ট মাসে পারিবারিক কলোহ থেকে নিষ্পত্তি পান।লিগ্যাল এইডের আইনজীবী ও বিচারকদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এখানকার সবাই অনেক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।এজন্য আমার মত যারা সেবাপ্রত্যাশি তারা খুব সহজেই তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারেন।

জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই জানান, লিগ্যাল এইড বর্তমানে একটা ভরসার জায়গা হয় উঠেছে। এখানে কম সময়ে বিনা খরচে আইনি সহায়তা পাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। তার মধ্যে নারীরাই বেশি। কারন পারিবারিক সমস্যা নারীরাই বেশি ভুক্তভোগী হয়।একপর্যায়ে তারা আইনি সহায়তার ব্যপারে হিমশিম খায়।সেই সমস্ত মানুষদের জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।এখানে অন্যান্য আদালতের চেয়ে কি কি সুবিধা আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে মামলার প্রাথমিক অবস্থা, বা চলমান মামলা এমনকি কারাগারে থাকা আসামিরাও সেবা পেয়ে থাকেন।যে কোনো ধরনের অসচ্ছল আসামি বিনামূল্যে আইনি সেবা পেয়ে থাকেন।এখানকার অন্যতম ব্যপার হচ্ছে, মামলা না করেও শুধুমাত্র আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান দেওয়া হয়।এমনকি বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি বিচারকের সাথে কথা বলে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা করতে পারেন।

লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আরেক আইনজীবী মো.হাকিম বাহাউল হক বলেন, এখানে যারা আইনি সহায়তার জন্য আসেন তাদরকে আমরা মামলায় না ঠেলে দিয়ে সমঝোতা করে দেই।এরপরও যারা মামলার দিকে জান তাদের খুব কম সময়ে মামলা নিষ্পত্তি করে থাকি।এখানে নারী,পুরুষ থেকে শুরু করে তৃতীয় লিঙ্গের যারা আছেন তারাও আইনি সহায়তা নিতে আসেন।

জেলা লিগ্যাল এইডের অফিস সহকারী জুবায়রা ফেরদৌসী জানান,প্রতিদিন অনেক মানুষকে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে থাকি।এদের মধ্যে নারীই বেশি।এখানে দেওয়ানি, ফৌজদারী, পারিবারিক মামলা সহ বিভিন্ন ধরনের মামলার ফ্রি সেবা দেওয়া হয়।এছাড়াও এখানে আদালত থেকে প্রাপ্ত মামলার ব্যপারেও সহায়তা দেওয়া হয়।

Ads small one

ন্যাশনাল রাগবি সেভেন্স চ্যাম্পিয়ানশিপে সাতক্ষীরা জেলা দল, জার্সি উন্মোচন ও শুভেচ্ছা বিনিময়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
ন্যাশনাল রাগবি সেভেন্স চ্যাম্পিয়ানশিপে সাতক্ষীরা জেলা দল, জার্সি উন্মোচন ও শুভেচ্ছা বিনিময়
নিজস্ব প্রতিনিধি: আসন্ন ন্যাশনাল রাগবি সেভেন্স চ্যাম্পিয়ানশিপ ২০২৬-এ অংশগ্রহণ করছে সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া সংস্থা। এ উপলক্ষে জেলা রাগবি দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও জার্সি উন্মোচন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মিস্ আফরোজা আখতার। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের জার্সি উন্মোচন করেন এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা ক্রীড়া অফিসার মাহবুবুর রহমান, জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সদস্য ও তুফান কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডা. আবুল কালাম বাবলা, সাতক্ষীরা রাগবি ক্লাবের সভাপতি ও লেকভিউয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানজিম কালাম তমাল এবং রাগবি ফেডারেশনের মিডিয়া ম্যানেজার ও আরডিএম আল ইমরান।
শেষে খেলোয়াড়রা চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো ফলাফল অর্জনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, যথাযথ প্রস্তুতি ও দলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলা দল এবারের আসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পারফরম্যান্স উপহার দিতে প্রস্তুত।

বজ্রের আঘাতে মৃত্যু: সতর্কতার অভাব, নাকি নীরব দুর্যোগ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:০৮ অপরাহ্ণ
বজ্রের আঘাতে মৃত্যু: সতর্কতার অভাব, নাকি নীরব দুর্যোগ?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বৈশাখের আকাশ যখন হঠাৎ কালো হয়ে ওঠে, দূরে কোথাও মেঘ গর্জে ওঠে, তখন প্রকৃতির এই স্বাভাবিক দৃশ্যই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হতে পারে মৃত্যুফাঁদে। বজ্রপাত-যা একসময় ছিল বিচ্ছিন্ন ও অপ্রত্যাশিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা-এখন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে নিয়মিত এক দুর্যোগে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় একদিনেই একাধিক প্রাণহানির ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সংকট আর উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রশ্ন উঠছে-এই মৃত্যু কি শুধুই নিয়তির নির্মমতা, নাকি আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতির ফল? এক দিনের চিত্র: বহু জীবনের অবসানসম্প্রতি দেশের অন্তত সাতটি জেলায় বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, নাটোর ও পঞ্চগড়-এই বিস্তৃত ভূগোল যেন একটাই বার্তা দেয়: বজ্রপাত এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একসঙ্গে তিন তরুণের মৃত্যু, মাঠে কাজ করতে গিয়ে কৃষকের প্রাণহানি, নদীর চরে গরু চরাতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মৃত্যুবরণ-এই ঘটনাগুলো কেবল সংখ্যা নয়, এগুলো বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের নির্মম প্রতিচ্ছবি। তাদের অধিকাংশই তখন জীবিকার প্রয়োজনে খোলা আকাশের নিচে ছিলেন-যেখানে বজ্রপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বজ্রপাতে নিহতদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে-তারা প্রায় সবাই কৃষক, দিনমজুর, জেলে বা শ্রমজীবী মানুষ। অর্থাৎ যারা দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন।

 

শহরের মানুষ যখন দালানকোঠায় নিরাপদে থাকেন, তখন গ্রামাঞ্চলের কৃষক খোলা মাঠে কাজ করতে বাধ্য হন। তাদের জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নেই, নেই তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা। বিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাত বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ার ফলে বায়ুম-লে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটে, যা বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা বাড়ায়।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, সেখানে এই প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়াই স্বাভাবিক। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: যদি বজ্রপাত বৃদ্ধির পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী হয়, তাহলে এই মৃত্যু কি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক? নাকি এটি আংশিকভাবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ? ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

 

এর আগে বজ্রপাতে মৃত্যুর কোনো সরকারি হিসাবও রাখা হতো না। এই স্বীকৃতির ফলে অন্তত বিষয়টি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব পেয়েছে।কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই স্বীকৃতির পরও মাঠপর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন, গ্রামভিত্তিক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আর্থিং ব্যবস্থার প্রসার-এসব উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর বেশিরভাগ ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য।

 

কিছু সাধারণ সতর্কতা মানলেই অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব:বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে না থাকা, উঁচু গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে আশ্রয় না নেওয়া, পানিতে অবস্থান না করা, দ্রুত দালান বা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া, ঘরের ভেতরে ধাতব বস্তু স্পর্শ না করা, এই নির্দেশনাগুলো সহজ, কিন্তু সমস্যা হলো-এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার ঘাটতি এখনো বড় বাধা। বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

ধারণা করা হয়, উঁচু গাছ বজ্রকে মাটিতে নামিয়ে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু একটি তালগাছ বড় হতে ১৫-২০ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে কীভাবে বর্তমান ঝুঁকি মোকাবিলা করা হবে? অন্যদিকে বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু এটি ব্যয়বহুল এবং পরিকল্পিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এখনো দেশের অধিকাংশ গ্রামে এ ধরনের কোনো অবকাঠামো নেই। বজ্রপাতে মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান এখনো নির্ভরযোগ্য নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, ফলে অনেক ঘটনাই অজানা থেকে যায়।

 

এছাড়া আহত হয়ে পরে মারা যাওয়া বা মানসিক ট্রমার কারণে মৃত্যুর ঘটনাগুলোও পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে সমস্যার প্রকৃত গভীরতা আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি না। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করে বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। কিন্তু এই তথ্য কি মাঠপর্যায়ের কৃষকের কাছে পৌঁছায়? মোবাইলভিত্তিক সতর্কবার্তা, স্থানীয় পর্যায়ে সাইরেন বা মাইকিং ব্যবস্থা-এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব। বজ্রপাত মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল নীতিনির্ধারণ নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।

 

গ্রামভিত্তিক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন, আর্থিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি জোরদার করা, কৃষকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু প্রায়ই ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। প্রকৃতি তার নিয়মে চলবে, কিন্তু মানুষের দায়িত্ব হলো সেই ঝুঁকি কমানো। পরিকল্পনার অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা-এই তিনটির সমন্বয়েই বজ্রপাত এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বজ্রপাতের শক্তিকে কাজে লাগানোর স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা দেখছেন-এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

 

কিন্তু তার আগে প্রয়োজন এই দুর্যোগ থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করা। প্রতিটি প্রাণহানি একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়, একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়। তাই বজ্রপাতকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। এখনই সময় এটিকে একটি অগ্রাধিকার জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা, এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। না হলে প্রতি বৈশাখে আকাশের গর্জনের সঙ্গে আমাদের শুনতে হবে আরও অনেক মৃত্যুর খবর-যা আসলে ছিল প্রতিরোধযোগ্য।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

নাচ জীবনের প্রতিবিম্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:০২ অপরাহ্ণ
নাচ জীবনের প্রতিবিম্ব

প্রকাশ ঘোষ বিধান

নাচ বা নৃত্য জীবনেরই একটি জীবন্ত প্রতিবিম্ব। যা মানুষের চাওয়া-পাওয়া, আবেগ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের কথা ছন্দে ও ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তোলে। নাচ শুধু বিনোদন নয়, বরং প্রাচীনকাল থেকে সমাজের রীতিনীতি, প্রতিবাদ, প্রেম ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। শরীরের নড়াচড়ায় জীবনের গল্প, সুখ-দুঃখ এবং মানসিক অবস্থার শৈল্পিক রূপই হলো নাচ।
নাচ জীবনের এক শৈল্পিক প্রতিফলন। এটি মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি এবং যাপনের গল্পকে শরীরের ভাষায় ফুটিয়ে তোলে। নাচের প্রতিটি মুদ্রায় লুকানো থাকে আনন্দ, বেদনা, প্রাপ্তি কিংবা না-পাওয়ার না বলা কথা। নাচ মানুষের অব্যক্ত কথা, প্রতিবাদ, রাগ, অনুরাগ এবং ভালোবাসা প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

প্রাচীনকাল থেকেই নাচ বিভিন্ন সমাজ ও ঐতিহ্যের গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে আসছে। মানুষ তার মনের গভীরতম অনুভূতিগুলো, যা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তা ছন্দের তালে তালে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। একজনের নাচের ভঙ্গি বা স্টাইল অনেক সময় তার ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতাকে প্রকাশ করে। নাচ মানুষের মেধা ও মনন বিকাশে এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। সহজ কথায়, নাচ হলো আত্মার লুকানো ভাষা যা জীবনের গতি ও ছন্দকে অর্থবহ করে তোলে।

 

নিয়মিত নাচ স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানের দক্ষতা বাড়াতে এবং মানসিক চাপ ও অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের মতো অসুখও দূরে থাকে। নাচ হল কাজ করার একটি চমৎকার উপায়। এটি শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখে এবং মানুষের চিন্তা ও গল্প ফুটিয়ে তোলে। প্রতিদিন ১ ঘণ্টা নাচ করলে শরীর সুস্থ, সবল, নমনীয় ও ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

২৯ এপ্রিল সারা বিশ্বে নানা উৎসব-আয়োজনের মধ্য দিয়ে নৃত্য দিবসটি উদযাপিত হয়। ব্যালে নৃত্যের স্্রষ্টা জ্যঁ জর্জ নভেরের জন্মদিন উপলক্ষে দিবসটি উদ্যাপন করা হয়। ইউনেস্কো ১৯৮০ সালে তার জন্মদিন ২৯ এপ্রিলকে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস ঘোষণা করে। তখন থেকে পৃথিবীব্যাপী এ দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হয়। নৃত্য বা নাচ মানুষের মনোজাগতিক প্রকাশভঙ্গি। কেননা, নৃত্য ও এর ভাষা কাজ করে একসূত্রে। নাচের মাধ্যমেই সহজে মনের আবেগকে তুলে ধরার গুরুত্ব থেকে দিবসটি সারাবিশ্বে উদযাপন করা হয়।

১৭২৭ সালের ২৯ এপ্রিল বিশ্ব নৃত্য সংস্কারক জ্যঁ জর্জ নোভের জন্মগ্রহণ করেন প্যারিসে। তিনি ১৭৫৪ সালে ব্যালে নৃত্য আবিষ্কার করেন। নৃত্য সংস্কারক হিসেবেও ছিল তার খ্যাতি। নভেরে নৃত্যকে ক্ষুদ্র গন্ডি ও সংকীর্ণতা মুক্ত করে অপেরায় উন্নীত করেন। এর পর ১৭৬০ সালে রচনা করেন লেটারস অন দ্য ড্যান্স গ্রন্থ। নোভের ব্যালে রচনার পাশাপাশি ব্যালের বিন্যাস, নির্দেশনা, পোশাক সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন।

 

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল নৃত্যশিল্পী, বাদক, শিল্পনির্দেশক সবার সমন্বয়। ব্যালের শেক্সপিয়ার হিসেবে পরিচিত নোভেরের মোট কম্পোজিশন ১৫০টি। ওই সময় তার কম্পোজিশন পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। নোভেরের ব্যালের ব্যাপক পরিমার্জন করেন ইতালির নৃত্যবিদ ডাবরভেল ও সেলভেটর ভিগেনোর। তবে তাদের শিক্ষক নৃত্যবিদ কার্লো ব্লাসিস নোভেরের সৃষ্টিকে সুমহান মর্যাদা দিয়েছিলেন। নোভেরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যালের মধ্যে রয়েছে অ্যাডমিটেড অ্যারসেট, লে মোট দ্য হারক্লি, মিড ইট জ্যাসন, দ্য পাস্ট অব হিউম্যান, ডিয়ার লেস অ্যাজামনুন, অ্যাপলস ইট ক্যাম্পপেসপে প্রভৃতি। ১৮১০ সালের ১৯ অক্টোবর নোভেরের প্রয়াণ ঘটে।

সব সংস্কৃতির আদি জননী হচ্ছে নাচ বা নৃত্য। নাচ সাংস্কৃতিক শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম। ফলে গবেষণা ও শিক্ষার উপাদান হিসেবে সারা বিশ্বেই নাচের জনপ্রিয়তা রয়েছে। নাচ মানুষের মেধা ও মননকে বিকশিত করে। নাচে দেহভঙ্গিমার মাধ্যমে শৈল্পিকভাবে পার্থিব ও অপার্থিব সব ভাবকে মানুষ প্রকাশের সুযোগ পায়। এ প্রকাশভঙ্গিতে থাকে গতি ও ছন্দ। সেই গতি ও ছন্দের তালে তালে ফুটে ওঠে প্রেম, ভালোবাসা, রাগ, অনুরাগ, প্রতিবাদ। সমাজ কিংবা গল্প-ইতিহাসের কথাও নাচের মাধ্যমে উঠে আসে। নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায় জীবনের কথা, চাওয়া-পাওয়া বা না-পাওয়ার কথা। সব মিলিয়ে নাচ শুধু বিনোদনমাত্র নয়, নাচ জীবনের প্রতিবিম্ব।

নাচ বা নৃত্য হলো গীতবাদ্যের ছন্দে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আবেগ, অনুভূতি, সামাজিক বা ধর্মীয় ভাব প্রকাশের একটি ললিতকলা। নৃত্য ছবি ও রঙের মতো। চিত্রকর্মের বিচিত্র রূপের সঙ্গে নৃত্যের বিন্যাস ঘটে। সংগীত ব্যতীত নৃত্য বোধগম্য নয়। সৃজনশীল উপায়ে সব দেহটাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দেহের ছন্দকে মানুষের কাছে তুলে ধরা জরুরি। আর একটা জিনিসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন, সেটা হলো অভিব্যক্তি। এ ক্ষেত্রে আত্মার গতিশীল আলোড়ন ফুটে ওঠে মুখমন্ডলের মাধ্যমে। নাচের বিভিন্ন প্রকারভেদের মধ্যে লোকনৃত্য, শাস্ত্রীয় এবং আধুনিক নাচ অন্যতম। এটি মনোরঞ্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

নাচ বা নৃত্য হলো মানুষের মনের ভাব প্রকাশের একটি ছন্দময় শৈল্পিক মাধ্যম। বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় নৃত্য থেকে শুরু করে লোকজ বা ফোক নাচ অত্যন্ত জনপ্রিয়। যেকোনো দেশের মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রেরণা হয়ে কাজ করে সে দেশের সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মাধ্যমেই মানুষ বৃহৎ পরিসরে নিজেকে মেলে ধরতে পারে। সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই একজন মানুষের যেমন, তেমনি একটি জাতির রুচিবোধেরও পরিচয় মেলে। সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়েই সংহতি, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহযোগিতার বন্ধন তৈরি হয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট