জীবন এক অফুরন্ত বিস্ময়
সৌহার্দ সিরাজ
শহরের পুরোনো কলেজটির নাম ছিল নবদিগন্ত মহাবিদ্যালয়। একসময় এই কলেজে পড়াশোনা করাই ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের বড় স্বপ্ন। কলেজের অধ্যাপকদের মধ্যে তরুণাভ সেন ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত মানুষদের একজন। ইতিহাস পড়াতেন তিনি। ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর, কিন্তু সহৃদয় শিক্ষক; সহকর্মীদের কাছে যুক্তিবাদী ও নীতিবান মানুষ। তরুণাভর সংসার ছিল ছোট। স্ত্রী মাধবী এবং একমাত্র ছেলে অর্কÑএই তিনজনকে নিয়েই তাঁর পৃথিবী। মাধবীও শিক্ষিতা নারী। কলেজজীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়েছিলেন। বিয়ের পর সংসার সামলালেও বই পড়া, গান শোনা আর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তাঁর অভ্যাস ছিল। তরুণাভ কখনো তাঁকে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে বাঁধা দেননি।
তবু সংসারের ভেতরে কোথাও যেন একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই দূরত্বের কথা তরুণাভ বুঝতে পারেননিÑঅথবা বুঝেও গুরুত্ব দেননি। নবদিগন্ত কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন রেজাউল করিম। প্রভাবশালী, বিত্তবান এবং কিছুটা রক্ষণশীল মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। তাঁর একমাত্র ছেলে রাকিব বাবার মতো নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া রাকিব ছিল স্বাধীনচেতা, সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমী। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার যাতায়াত ছিল। মাধবীর সঙ্গে রাকিবের পরিচয়টা খুব সাধারণভাবেই হয়েছিল। প্রথমে বই নিয়ে কথা। তারপর কবিতা। তারপর গান। তারপর দীর্ঘ আলাপ। কখন যে সেই আলাপ দুজনের জীবনে অন্য অর্থ নিয়ে এল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি। মাধবী জানতেন, এই সম্পর্কের কোনো সহজ ভবিষ্যৎ নেই। তিনি বিবাহিতা। তাঁর একটি পরিবার আছে, সন্তান আছে। রাকিবও জানত এখানে সম্পর্ক তৈরি হওয়া একটা সামাজিক অপরাধ। এই অনৈতিক সম্পর্ক ব্যাভিচারের পর্যায়ভুক্ত। এসব বাইরে জানাজানি হলে তার বাবার মাথা হেট হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষ কখনো কখনো নিজের যুক্তির চেয়ে নিজের অনুভূতির কাছে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। রকিব একদিন বলেছিল, ‘তুমি যদি আমার সঙ্গে থাকতে চাও, আমি সবকিছু ছেড়ে তোমার পাশে থাকব’। মাধবী অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
Ñ’সবকিছু ছেড়ে দেওয়া খুব সহজ কথা নয়, রাকিব’। ’তবু চেষ্টা করা যায়’।
সেই চেষ্টা একদিন সত্যিই চরম পর্যায়ে পৌঁছাল। মাধবী নিজের পরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং বহু বছরের সংসারকে পেছনে রেখে রাকিবের সঙ্গে চলে গেলেন। নতুন জীবনের জন্য তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। রাকিবের পরিবারও আশ্চর্যজনকভাবে তাঁকে গ্রহণ করল। হয়তো পরিবারের সম্মান, হয়তো ছেলের জেদ, হয়তো পরিস্থিতির চাপÑকোনটি কাজ করেছিল বলা কঠিন।
রাকিবের বাড়িতে মাধবীর জন্য আলাদা ঘর করা হলো। প্রথম কয়েক সপ্তাহ যেন সবকিছু স্বপ্নের মতো ছিল। কিন্তু স্বপ্নের জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। রাকিবের পরিবার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। পোশাক-পরিচ্ছদ, চলা-ফেরা, আত্মীয়দের সঙ্গে আচরণ, সামাজিক অনুষ্ঠানÑপ্রতিটি বিষয়েই ছিল নির্দিষ্ট নিয়ম। মাধবী নিজের নতুন বিশ্বাসকে সম্মান করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস, চিন্তাভাবনা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সেই পরিবেশের সংঘাত ক্রমে বাড়তে লাগল।
একদিন মাধবী রাকিবকে বললেন,
Ñ’আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু তোমাদের বাড়ির প্রতিটি নিয়ম মেনে নিজেকে বদলে ফেলতে পারছি না’। রাকিব বলল, ’আমার জন্য একটু চেষ্টা করো’।
Ñ’আমি তো চেষ্টা করছি। কিন্তু ভালোবাসার জন্য কি একজন মানুষকে নিজের সমস্ত সত্তা বদলে ফেলতে হয়’?
রাকিব কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কয়েক মাস পর মাধবী ফিরে এলেন নিজের পুরোনো বাড়িতে, স্বামীর কাছে, সন্তানের কাছে। তরুণাভ দরজা খুলে তাঁকে দেখে কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাধবী মাথা নিচু করে বলেছিলেন,
Ñ’আমি ফিরে এসেছি’।
তরুণাভ শুধু বলেছিলেন,
Ñ ‘ভেতরে এসো’। কোনো প্রশ্ন করেননি। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই ছিল অসংখ্য প্রশ্ন।
অর্ক তখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। মায়ের ফিরে আসার ঘটনায় সে ভিতর থেকে ভেঙে পড়েছিল। সে মাকে ভালোবাসত, কিন্তু রাকিবকে কোনোভাবেই ক্ষমা করতে পারছিল না। তরুণাভ নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক। চেষ্টা করলেন সংসারটাকে আবার স্বাভাবিক করতে।
এক রাতে তিনি মাধবীকে বললেন,
Ñ’ভুল মানুষের জীবনে হতেই পারে। কিন্তু কোনো ভুলকে যদি আমরা সারাজীবন আঁকড়ে থাকি, তাহলে সেটা আর ভুল থাকে নাÑধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়’।
মাধবী জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
Ñ’আমি জানি’।
Ñ ‘তাহলে রাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করো’।
অতিশয় ভদ্রলোক তরুণাভ ভদ্রভাবে শান্তশিষ্ট ভাবেই মাধবীকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন।
মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
Ñ’সবকিছু কি এত সহজ’?
Ñ’সংসার সহজ নয়, মাধবী। কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়’।
মাধবী চুপ করে রইলেন। তরুণাভ বুঝলেন, তিনি তাঁর স্ত্রীকে বোঝাতে পারছেন না।
দিন যেতে লাগল। বাইরে থেকে সংসার স্বাভাবিক। কিন্তু ভেতরে ছিল অদৃশ্য আগুন।
মাধবী আর রাকিবের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অর্ক বিষয়টি বুঝতে পেরে মাকে একদিন বলল,
Ñ’তুমি কি আবার সেই মানুষের কাছে যাবে’?
মাধবী বললেন, ‘তুমি আমাকে বিচার করো না, অর্ক’।
Ñ‘আমি তোমাকে বিচার করছি না। আমি শুধু বুঝতে পারছি নাÑবাবা এত কষ্ট পাওয়ার পরও তুমি কীভাবেÑ’কথাটা শেষ করতে পারল না সে। মাধবী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘তুই তো আমাকে মা হিসেবে দেখিস, মানুষ হিসেবে দেখেছিস কখনও’ ?
অর্ক উত্তর দিতে পারলো না। সেই প্রশ্ন তার ভেতরে গেঁথে রইল তীর্যকভাবে।
এক বর্ষার বিকেলে তরুণাভ কলেজের কাজে শহরের বাইরে গেলেন। বাড়িতে মাধবী একা। রাকিব এল। তাদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা হলো। পুরোনো অভিমান, ভালোবাসা, অপরাধবোধÑসবকিছু মিশে ছিল সেই কথায়। তারা জানত, তাদের সম্পর্কের পরিণতি সুখের হবে না। তবু বহুদিনের টান তাদের আবার কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
ঠিক সেই সময় অর্ক হঠাৎ বাড়িতে ফিরে আসে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তারপর যা ঘটল, তা এত দ্রুত ঘটেছিল যে কেউ থামানোর সুযোগ পেল না। অর্ক রাকিবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচ- রাগে তাকে আঘাত করতে থাকে।
মাধবী চিৎকার করে বললেন, অর্ক! থাম’!
কিন্তু অর্ক তখন আর কিছুই শুনতে পেল না। তার চোখে ছিল বহু বছরের অপমান, বাবার কষ্ট এবং নিজের ভেঙে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি। শেষ পর্যন্ত রাকিব গুরুতরভাবে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। হঠাৎ অর্কের রাগ থেমে গেল। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে কী করে ফেলেছে।
মাধবী ছুটে গেলেন রাকিবের কাছে। অর্ক পিছিয়ে গেল।
Ñ’আমি… আমি এটা করতে চাইনি’,
সে অস্পষ্ট স্বরে বলল। মাধবী তার দিকে তাকালেন। সেই চোখে রাগ ছিল না, ছিল অসীম আতঙ্ক। এবার আমার ছেলের কী হবে? মুহূর্তে মাধবী প্রেমিকা থেকে মা হয়ে গেলেন। মাধবী উন্মাদিনী হয়ে গেলেন ছেলের চিন্তায়, রাকিব তো মারা গেছে, আমার ছেলের কী হবে!
অর্ক আর দাঁড়াল না। অন্ধকারে গা ঢাকা দিলো। সেদিন রাতেই সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। পরদিন খবর ছড়িয়ে পড়লÑঅর্ক সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছে। কেউ বলল, সে ভয়ে পালিয়েছে। কেউ বলল, অপরাধবোধে। কেউ বলল, পরিবারের ভাঙন সহ্য করতে না পেরে গেছে।
তরুণাভ ফিরে এসে সব শুনলেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললেন না। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে বললেন,
Ñ’আমরা সবাই কোথাও না কোথাও ভুল করেছি’।
মাধবী কাঁদছিলেন।
Ñ’আমি কী সব নষ্ট করে দিলাম’!
তরুণাভ জানালার বাইরে তাকালেন।
Ñ’একজন মানুষ একা কোনো সংসার ভাঙে না। অনেকগুলো নীরবতা, অভিমান, ভুল সিদ্ধান্ত আর অপূর্ণতা মিলে একটা সংসার ভাঙে’।
মাধবী বললেন,
Ñ’রাকিবের কী হবে? ও বাঁচবে তো’?
তরুণাভ শান্ত কণ্ঠে বললেন,
Ñ’বেঁচে থাকলে তারও জীবন আছে। তাকে তার জীবন বেছে নিতে হবে’।
Ñ’আর অর্ক’?
মাধবীর আকুল প্রশ্ন। তরুণাভ এবার চোখ বন্ধ করলেন। বিড়বিড় করে বললেন,
Ñ’ওকেও ফিরতে হবে। কিন্তু শুধু বাড়িতে নয়Ñনিজের কাছে’।
কয়েক মাস কেটে গেল। রাকিবের বাবা কিংবা তার পরিবার কেউ অর্কের বিরুদ্ধে মামলা করলেন না। সীমান্তের ওপার থেকে অর্কের কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া গেল না। মাধবী প্রতিদিন সন্ধ্যায় একা বারান্দায় বসে থাকেন। ছেলের মঙ্গলের জন্য ঈশ্বরকে ডাকেন। তাঁর পাশে পড়ে থাকে শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ। মাঝে মাঝে তিনি বইটি খুলতেন, কিন্তু পড়তে পারতেন না।
রাকিব আর আগের মানুষটি ছিল না। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে গেলেও ঘটনার অভিঘাত তার জীবনে গভীর দাগ রেখে গেল।
আর তরুণাভ?
তিনি আবার কলেজে পড়াতে শুরু করলেন। একদিন ক্লাসে তিনি ছাত্রদের বলছিলেন,
Ñ’মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ধর্ম, পরিবার বা সামাজিক অবস্থান নয়। তার সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñসে একজন মানুষ। আর মানুষ যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তের দায়ও তাকে বহন করতে হয়’।
ক্লাস শেষ হলে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। দূরে সন্ধ্যার আলো। হয়তো কোনো একদিন অর্ক ফিরবে। হয়তো মাধবী নিজের জীবনের সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়াবেন।
হয়তো রাকিবও অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন জীবন শুরু করবে। কিন্তু যে সম্পর্ক একবার মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে যায়, তাকে মুছে ফেলা যায় না। শুধু তার অর্থ বদলে যায়। কখনো প্রেম হয়ে থাকে। কখনো অপরাধবোধ। কখনো স্মৃতি। আর কখনো ফেরার পথের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ নীরবতা।











