তারিক ইসলাম
সভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির জ্ঞানচর্চা, মননশীলতা এবং উৎকর্ষ সাধনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত বাহন হলো বই। প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল মাধ্যমের অভূতপূর্ব বিপ্লবের যুগে আজ চারদিকে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দানা বাঁধছে—ডিজিটাল স্ক্রিন, ই-বুক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়েও কি বইয়ের আবেদন অপরিবর্তিত থাকবে? নাকি এর কোনো বিকল্প চলে এসেছে? গভীর ও সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে একটি সত্যই সামনে ভেসে ওঠে—তা হলো, বইয়ের বিকল্প কেবল আরেকটি বই-ই হতে পারে, অন্য কিছু নয়।
আজকের দিনে তথ্য প্রাপ্তির পথ অত্যন্ত সহজলভ্য। ইন্টারনেটের এক ক্লিকেই হাজারো তথ্য, নিবন্ধ ও সারসংক্ষেপ চোখের সামনে চলে আসে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। তথ্য আমাদের সাময়িক কৌতূহল মেটায় বা কাজের সুবিধা করে দেয়, আর জ্ঞান আমাদের ভেতরটাকে সমৃদ্ধ করে, চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে এবং জীবনদর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়। এই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানলাভের একমাত্র এবং প্রধান মাধ্যম হলো বই পড়া। একটি পূর্ণাঙ্গ বইয়ের পাতায় পাতার সঙ্গে যখন একজন পাঠকের চোখ ও মনের সংযোগ ঘটে, তখন সেখানে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা শুরু হয়, যা কোনো টুকরো তথ্য বা ডিজিটাল স্ক্রিনের ক্ষণস্থায়ী স্ক্রোলিংয়ে পাওয়া অসম্ভব।
বই পড়ার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গভীর ও ইন্দ্রিয়গ্রাহী। কাগজের ঘ্রাণ, পাতা উল্টানোর শব্দ এবং একটি আস্ত কাহিনীর ভেতরে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি কেবল একটি বস্তুগত বইই দিতে পারে। এর বিপরীতে, ডিজিটাল মাধ্যমে পড়ার সময় মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেশি থাকে। নোটিফিকেশন, পপ-আপ বিজ্ঞাপন বা ইন্টারনেটের নানা প্রলোভন পাঠকের মনোযোগকে বারবার ছিন্ন করে। ফলে লেখকের মূল ভাবনার গভীরে পৌঁছানো বা তার সাথে মানসিক ঐক্য স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বই আমাদের এক ধরনের একাগ্রতা শেখায়, যা আজকের দ্রুতগতির বিক্ষিপ্ত যুগে বড় বেশি দুর্লভ।
অনেকে মনে করেন, ই-বুক বা অডিওবুক বইয়ের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। নিঃসন্দেহে এগুলো প্রযুক্তির চমৎকার উপহার এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু এগুলোকে বইয়ের পরিপূরক বলা চলে, বিকল্প নয়। অডিওবুক শোনার সময় আমাদের কল্পনাশক্তির ওপর শ্রোতা হিসেবে একধরনের সীমাবদ্বতা তৈরি হয়, কারণ কথক বা কণ্ঠশিল্পীর উচ্চারণের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। অথচ নিজে বই পড়ার সময় পাঠক নিজেই তার কল্পনার রঙে চরিত্র ও দৃশ্যপটকে জীবন্ত করে তোলেন। বই পড়ার এই সৃজনশীল প্রক্রিয়াটি একান্তই পাঠকের নিজস্ব।
সবশেষে বলা যায়, সমাজ পরিবর্তনশীল, প্রযুক্তির রূপ বদলায়, বিনোদনের মাধ্যমও নতুন থেকে নতুনতর হয়; কিন্তু মানুষের মননশীলতার খোরাক জোগাতে বইয়ের আসন চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকে। একটি ভালো বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, সুসময়ের আনন্দ এবং দুর্দিনের সান্ত¡না। তাই যত আধুনিকতাই আসুক না কেন, মানুষের বিবেক, বুদ্ধি ও আবেগের সঠিক বিকাশ ঘটাতে বইয়ের স্থান কেউ দখল করতে পারবে না। বইয়ের বিকল্প কেবল বই-ই। লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।