সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

ট্রাক ক্রয়ের টাকা ও কাগজপত্র না পাওয়ার অভিযোগে কলারোয়ায় সংবাদ সম্মেলন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ
ট্রাক ক্রয়ের টাকা ও কাগজপত্র না পাওয়ার অভিযোগে কলারোয়ায় সংবাদ সম্মেলন

কলারোয়া প্রতিনিধি: কলারোয়ায় পুরোনো ট্রাক কেনার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেওয়া এবং পাওনা টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে কলারোয়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মো. সোহাগ হোসেন নামের এক ব্যক্তি। শাহাপুর গ্রামের অধিবাসী সোহাগ হোসেন লিখিত বক্তব্যে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি সাড়ে সাত লাখ টাকায় একটি পুরোনো ট্রাক কেনেন। কিন্তু টাকা পরিশোধের পরও বিক্রেতা আমিনুর রহমান গাড়ির কাগজপত্র বুঝিয়ে দেননি। পরবর্তীতে পাওনা ফেরত সংক্রান্ত নানা চুক্তি ও চেক দেওয়া হলেও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। এতে সোহাগ হোসেন তাঁর পাওনা টাকা উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

Ads small one

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এবং সামান্য কথন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এবং সামান্য কথন

মো. কায়ছার আলী

“বিদ্যা বড় অমুল্য ধন, সবার চেয়ে দামি। সকাল বিকাল পড়তে এসে জেনেছি তা আমি। মাষ্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই। কোন দিন কেউ যেন বলতে না পারে তোমার কোন বুদ্ধি নাই, ও রহমত ভাই”। আজ থেকে প্রায় ৪০/৪২ বছর আগে এদেশে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছিল অশিক্ষিত সিনেমার এই কালজয়ী গানটি। দস্তখত শব্দের অর্থ স্বাক্ষর বা সই বা Signature যারা পড়তে ও লিখতে পারে সাধারণত তাদেরকেই Literate হিসেবে গন্য করা হয়।

 

আজ ৮ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৫ সালের ইরানের তেহরানে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ৮৯টি দেশের শিক্ষাবিদ, শিক্ষামন্ত্রী ও পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আলোচনা করা হয় পৃথিবীর বর্তমান বিস্ময়কর সভ্যতা শিক্ষার অবদান। শিক্ষা উন্নয়নের পূর্বশর্ত শ্রেষ্ঠত্বের নিয়ামক। মানব সম্পদ উন্নয়নে এর কোন বিকল্প নেই। আধুনিক বিশ্বে সকল আবিস্কার ও উন্নয়নের মূূলমন্ত্র হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাহীন মানুষ আর পশুতে কোন তফাৎ নেই। যার শিক্ষা নেই বলা যায় তার কিছু নেই।

 

সম্মেলনে বিশ্বের সাক্ষরতা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবস্থা, শিক্ষা, শিক্ষাজীবন, জীবিকা ও বয়স্ক নিরক্ষরদের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। শিক্ষা ও জীবিকা পরস্পর অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত বলে উলে¬খ করে নিরক্ষরতাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করে তা দূরীকরণে জোর প্রয়াস নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। মানব সম্পদ উন্নয়নে অব্যাহত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে দিবসটি সারা বিশ্বের মতো যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে আমাদের দেশেও এবার ভিন্ন ভাবে পালিত হচ্ছে।

 

ইউনেস্কো পরবর্তী বছর থেকে সারা বিশ্বে জনগনের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালানোর জন্য দিবা রাত্রী কাজ করে যাচ্ছে। সাক্ষরতা হলো সব ধরনের সফলতার মূলনীতি। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “মানুষ, গ্রহ এবং সমৃদ্ধিও জন্য সাক্ষরতা” সাক্ষরতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের জন্য ইউনেস্কো প্রাণপণে চেষ্টা করলেও, এরপরেও বিশ্বের মোট অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা নিরক্ষর (নারীদের মধ্যে বেশি)। এশিয়া ও আফ্রিকায় রয়েছে আটটি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশও একটি।

 

পৃথিবীর অনেক পিছিয়ে থাকা দেশ অভিযান আকারে সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, নিকারাগুয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে স্বাক্ষর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে আমাদের দেশেও পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মানুষ সামাজিক ও শ্রেষ্ঠ জীব। সিগমন্ড ফ্রয়ড এর তত্ত্ব মতে” প্রতিটি শিশুই জন্ম নেয় একটি পরিস্কার শ্লেভ নিয়ে যার ওপর দাগ পরতে থাকে পরিবেশের প্রভাবে। এই পরিবেশ সাধারণত গড়ে উঠে শিক্ষার উপর ভিক্তি করে।

 

সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই হলো শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগত জ্ঞান লাভের প্রাক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হলো সম্ভাবনার পরিপূর্ন বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। অন্যভাবে বলা যায় শিক্ষা হলো বিকশিত ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ন বিকাশ। বাংলা শিক্ষার শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ শাস ধাতু থেকে যার অর্থ হচ্ছে শাসন করা বা উপদেশ দান করা।

 

শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Educare বা Education থেকে যার অর্থ To lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে নিয়ে আসা। পবিত্র কুরআনের (প্রথম বানী পড়) ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ্ আদম (আ.) কে সকল জিনিসের নাম শেখানোর মাধ্যমে জ্ঞান বা শিক্ষার সূচনা করেন। তারপরে সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাদান পদ্ধতিরও পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন’ শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ’। এরিস্টটল বলেছেন ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরী করা হলো শিক্ষা’।

 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের নায়ক ব্যারিষ্টার অমিত রায় বলেন ‘কমল- হীরের পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার। পাথরের ভার আছে, আলোর আছে দীপ্তি’। মহাকবি আল্লামা ইকবালের মতে ‘মানুষের ‘খুদী’ বা রুহের উন্নয়ন ঘটনোর প্রক্রিয়ার নামই শিক্ষা। মহাকবি মিলটনের মতে ‘দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতি সাধনই শিক্ষা’। জন ডিউই এর মতে, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর যোগ্যতাই শিক্ষা। তাই শিক্ষার জন্য চাই অক্ষর জ্ঞান।

 

অক্ষর জ্ঞান না থাকলে মানুষ পড়বে বা শিখবে কিভাবে বা জ্ঞান অর্জন করবে কিভাবে? বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী প্রানী মানুষ অন্যের কাছে শোনার চেয়ে বা জানার চেয়ে নিজের চোখে পড়তে বা জানতে বা শিখতে বেশি পছন্দ করে। প্রতিটি মানুষ শতভাগ নিজেকে বিশ্বাস করে। এক সমীক্ষায় জানা যায় ৩ ঘন্টা পর মনে থাকে দেখে ৭২% শুনে ৭০% দেখে ও শুনে ৮৫% আবার একই তথ্য ৩ দিন পর মনে থাকে দেখে ২৫% শুনে ১০% দেখে ও শুনে ৬৫%। এই সমীক্ষায় সহজেই অনুমান করা যায় মানুষ দেখে ও শুনে বেশি মনে রাখতে পারে। আর এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো মানুষকে দেখতে, পড়তে উৎসাহিত বা অনুপ্রানিত করা। গভীর বিশ্বাসের জন্য প্রয়োজনে প্রতিটি মানুষকে বাধ্যতামুলক ভাবে অক্ষর জ্ঞান দেয়া জরুরী।

 

১৯৭১ সালে এদেশে শিক্ষার হার ছিল ১৬.৮%, বর্তমানে ২০২৬ সালে ৭৭.০৯%। এই হার আরো বাড়াতে হবে। নিরক্ষরতা একটি জটিল ও ভয়াবহ সমস্যা। কোন জাতীর উন্নতির জন্য প্রথম এবং প্রধান উপকরন হচ্ছে শিক্ষা বা অক্ষর জ্ঞান। নিরক্ষর লোকেরা ভালোমন্দ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তাই দেশের উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। তারা ব্যক্তি জীবন ও জাতীয় জীবনেও অভিশপ্ত। এ অভিশাপ থেকে তাদের মুক্ত করতে না পারলে জাতীয় অগ্রগতি কিছুতেই সম্ভব নয়। নিরক্ষর লোকদের অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করে তোলার জন্য আমাদের তাই বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

বর্তমার সরকার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে অ-নানুষ্ঠানিক এবং উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করেছে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সারাদেশের মানুষকে আলোকিত করা। স্কুল ও কলেজের বাইরে পাহাড়ী এলাকা, দুরবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাওর, বাওর, চর, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলাকা, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, পথশিশু, অতি বঞ্চিত শিশু, শ্রমিক, ঝরে পড়া, পিতৃ পরিচয়হীন সন্তান, হরিজন বা নিচুবর্ণের শিশু এদের শিক্ষার জন্য ওয়ার্ড, এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্প বা হোষ্টেল নির্মান করে শিক্ষার দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। যারা বয়স্ক ও বিধবা ভাতা গ্রহণ করছেন তাদেরকেও নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্বাক্ষর জ্ঞানের জন্য ছাত্র, শিক্ষক, সমাজকর্মী, গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে জোটবদ্ধ কমিটি গঠন করে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের মানুষকে শিক্ষার উপকারীতা বোঝাতে হবে। সমাজের যে কোন অংশের নাগরিকদের বাইরে রেখে দেশের উন্নয়ন হয় না।

 

একজন ডাক্তারের Operation successful যদি না হয় তবে একজন রোগী মারা যাবে। একজন বাস বা ট্রাক চালক, লঞ্চ চালক, বা রেলের চালকদের একটু অবহেলায় অনেক লোকের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হতে পারে তা তাদের বোঝাতে হবে। সরকারী বা বেসরকারী সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষনের মাধ্যমে তাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগাতে হবে। বর্তমান সরকার বৃত্তি মুলক, কারিগরী এবং কর্মমূখী শিক্ষা (হাতে কলমে প্রশিক্ষিত) অর্থাৎ আত্বপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক শিক্ষা চালু করেছে। এর ফলে ছাত্র ছাত্রীরা সে দিকে ধাবিত হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে সাধারণ শিক্ষার দ্বারা মানসিক বিকাশ ঘটলেও কর্ম ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকে না।

 

কর্মমূখী শিক্ষা সেই নিশ্চয়তা বিধান করে জীবনকে হতাশা মুক্ত করে। প্রয়োজনের তুলনায় তবে তা অতি সামান্য, বর্তমানে এ শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং জনগনকে সচেতন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে আমি মনে করি, অক্ষর বা বর্ণমালার মাধ্যমে অর্জিত হয় শিক্ষা, শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব ঘটায় মুক্তি। অর্থাৎ জ্ঞানই শক্তি বা শিক্ষাই শক্তি।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

কলারোয়ায় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
কলারোয়ায় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

কলারোয়া প্রতিনিধি: কলারোয়ায় দুদিনব্যাপী ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উপজেলা পর্যায়ের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে কলারোয়া সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে ট্রফি ও সনদ তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা কামারুজ্জামান, সরকারি পাইলট হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুদীপ বিশ্বাস, উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার তাপস কুমার দাস।
প্রতিযোগিতায় পানিকাউরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শাকদাহ বালিকা বিদ্যালয়, কয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলারোয়া সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাফল্য অর্জন করে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক শেখ শাহাজাহান আলি শাহিন।

ওয়াকআউটের রাজনীতি নয়, সংসদে চাই যুক্তির লড়াই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
ওয়াকআউটের রাজনীতি নয়, সংসদে চাই যুক্তির লড়াই

গাজী মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ

‎গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচনে নয়, নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদ কতটা কার্যকরভাবে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে, তার ওপরও একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা নির্ভর করে। সংসদ হলো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জায়গা, আইন নিয়ে বিতর্কের জায়গা এবং জনগণের স্বার্থে বিকল্প নীতি উপস্থাপনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মঞ্চ। অথচ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধের একটি পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল হয়ে আছে ওয়াকআউট বা অধিবেশন বর্জন। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও সেই পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের শক্তি শুধু প্রতিবাদ বা ওয়াকআউটে নয় তার আসল শক্তি হলো যুক্তি, তথ্য, বিকল্প নীতি এবং ভোটের লড়াইয়ে। সরকার কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধী দল সংসদে দাঁড়িয়ে সেটি খ-ন করতে পারে। কোনো বিলের ধারা নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশোধনী দিতে পারে। প্রয়োজন হলে সংসদীয় কমিটিতে গিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করতে পারে। আর শেষ পর্যন্ত ভোটে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে জনগণের কাছে ফিরে যেতে পারে।

‎বারবার কক্ষ ত্যাগ করলে প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বার্তা তৈরি হতে পারে, সংবাদ শিরোনামও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ওয়াকআউট যদি নিয়মিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে সেটি প্রতিবাদের শক্তিশালী অস্ত্রের পরিবর্তে একঘেয়ে ও হাস্যকর রাজনৈতিক দৃশ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জনগণ সংসদে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে কথা বলার জন্য চুপচাপ কক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য নয়। এখানেই বাংলাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতির সঙ্গে উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সে বিরোধী দল সরকারের কঠোর সমালোচনা করে। প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় Prime Minister’s Questions বা PM’s-G-এ। বিতর্ক কখনো উত্তপ্ত হয়, রাজনৈতিক আক্রমণও তীব্র হয়, কিন্তু সংসদই থাকে রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রধান মঞ্চ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্রিটিশ বিরোধী দল ঝযধফড়ি ঈধনরহবঃ-এর মাধ্যমে সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করে। অর্থাৎ বিরোধী দলের লক্ষ্য শুধু সরকারকে আক্রমণ করা নয়, জনগণের সামনে নিজেদের বিকল্প সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

‎যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও বিরোধিতার জন্য বিভিন্ন সংসদীয় কৌশল রয়েছে। সিনেটে Filibuster দীর্ঘ বিতর্কের মাধ্যমে কোনো আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার একটি পরিচিত কৌশল। ১৯৫৭ সালে সিনেটর স্ট্রম থারমন্ড Civil Rights Act-এর বিরোধিতা করতে ২৪ ঘণ্টা ১৮ মিনিট বক্তব্য রেখেছিলেন। মার্কিন ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না; দুই দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো আলাদা। কিন্তু এখান থেকেও একটি বিষয় স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা সংসদের ভেতরেই পরিচালিত হতে পারে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও প্রশ্নোত্তর, বিতর্ক, সংসদীয় কমিটি এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

 

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই উন্নত গণতন্ত্র মানে বিরোধী দল সরকারের সঙ্গে একমত হবে, এমন নয়। বরং বিরোধী দল যত বেশি শক্তিশালীভাবে সরকারের সমালোচনা করবে, সংসদ তত বেশি প্রাণবন্ত হবে। কিন্তু সেই বিরোধিতা হতে হবে সংসদের ভেতরে, যুক্তির ভিত্তিতে এবং বিকল্প নীতির মাধ্যমে। তবে দায় শুধু বিরোধী দলের নয়। সরকার ও সংসদ পরিচালনাকারীদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। বিরোধী দল কি যথেষ্ট সময় নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে? গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হচ্ছে কি? বিরোধী দলের সংশোধনী ও প্রস্তাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি? সংসদীয় কমিটিগুলো কি দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে সত্যিকার অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখছে? কারণ গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের অধিকার তৈরি করে, কিন্তু বিরোধী মতকে উপেক্ষা করার লাইসেন্স দেয় না। একইভাবে বিরোধী দলও নির্বাচিত হওয়ার পর শুধু সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে আপত্তি জানালেই দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। তাদের দেখাতে হবে সরকারের নীতি ভুল হলে সঠিক নীতি কী। কোনো আইন সমস্যাযুক্ত হলে তার বিকল্প কী। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের পরিকল্পনা কী।

‎জামায়াতে ইসলামী যদি বর্তমান সংসদে একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাদের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে ওয়াকআউটের পরিবর্তে যুক্তির লড়াই, স্লোগানের পরিবর্তে নীতির লড়াই এবং শুধু সরকারের সমালোচনার পরিবর্তে বিকল্প রাষ্ট্রনীতি উপস্থাপনের রাজনীতি। একই প্রত্যাশা সরকারি দলের কাছেও। বিরোধী দলের প্রতিটি বক্তব্যকে রাজনৈতিক শত্রুতা হিসেবে দেখা যেমন গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি প্রতিটি মতবিরোধে সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়াও দায়িত্বশীল সংসদীয় সংস্কৃতির পরিচয় নয়।

‎বাংলাদেশের জনগণ এখন এমন সংসদ দেখতে চায় যেখানে সরকারকে কঠিন প্রশ্ন করা হবে, বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে, বিল নিয়ে গভীর বিতর্ক হবে, সংসদীয় কমিটি কার্যকর হবে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ওয়াকআউটের রাজনীতি হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ায়, কিন্তু যুক্তির রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়া সহজ; সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন। বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর কাতারে যেতে চায়, তাহলে আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতিরও পরিবর্তন করতে হবে। সরকারকে শিখতে হবে বিরোধী মত শুনতে, আর বিরোধী দলকে শিখতে হবে সংসদের ভেতরে থেকে লড়াই করতে।
‎কারণ সংসদ শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গা নয়, এটি জনগণের আমানত। গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ওয়াকআউট নয় যুক্তি। ‎আর একজন সংসদ সদস্যের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি জনগণের প্রতিনিধি।