তীব্র গরম, লোডশেডিং ও পানি সংকট: এক জনপদের ত্রিমুখী দীর্ঘশ্বাস
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষি, মৎস্য ও ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত এই জনপদ আজ তীব্র গরম, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং নাগরিক সেবার চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। একদিকে প্রকৃতির রুদ্ররূপ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক চাহিদার কৃত্রিম সংকট—সব মিলিয়ে সাতক্ষীরাবাসী এখন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
গত কয়েকদিন ধরে জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অসহনীয় তাপপ্রবাহ। দিনের বেলায় পারদ ক্রমাগত ওপরে উঠছে, তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। তবে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মানুষের অনুভূত তাপমাত্রা (হিট ইনডেক্স) আরও অনেক বেশি, যা শরীরকে নিমিষেই ক্লান্ত ও অবসন্ন করে দিচ্ছে।
গরমের তীব্রতায় দিনের বেলায় ঘরের বাইরে বের হওয়া যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। রাস্তাঘাট, বাজার, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানÑসবখানেই মানুষের মাঝে ক্লান্তি ও অস্বস্তি স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক ও রিকশাচালকরা। জীবিকার তাগিদে এই তপ্ত রোদ ও লু-হাওয়া উপেক্ষা করেই তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত গরমে অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠায় তাদের দৈনিক আয়ও মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
এই প্রচ- গরমের মধ্যেই আগুনে ঘি ঢালছে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই মানুষের মুখে এখন একটাই আলোচনা, “কবে মিলবে একটু স্বস্তি?” বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই অজুহাত সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারছে না।
বিশেষ করে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হচ্ছে আসল নরকযন্ত্রণা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি ঘরবাড়ি যেন একেকটি উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত হচ্ছে। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের কষ্ট চরমে পৌঁছায়। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতর টিকতে না পেরে বাড়ির আঙিনা, গাছতলা, বাঁশবাগান কিংবা খোলা ছাদে আশ্রয় নিচ্ছেন সামান্য বাতাসের আশায়। স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সাতক্ষীরার মানুষের এই গাছতলায় রাত কাটানোর করুণ ছবি ও খবর উঠে এসেছে।
সাতক্ষীরাবাসীর এই দুর্ভোগের মধ্যেই “মরার ওপর খাঁড়ার ঘা” হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি। গ্রাহকদের অভিযোগ, একদিকে ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সইতে হয়, অথচ মাস শেষে ভূতুড়ে ও বর্ধিত বিলের কাগজ ঠিকই হাতে এসে পৌঁছায়। সেবার মান না বাড়িয়ে এভাবে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকে সাধারণ মানুষ ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত পরিবারগুলো এই বাড়তি বিলের বোঝা টানতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের এই কঠিন সময়ে সাতক্ষীরা পৌরবাসীর জন্য আরও এক বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র পানি সংকট। তীব্র গরমে যেখানে পানির চাহিদা কয়েক গুণ বেশি, সেখানে পৌরসভা থেকে পানি সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। নাগরিকদের অভিযোগ, দিনের পর দিন কল দিয়ে এক ফোঁটা পানিও পাওয়া যায় না। রান্নাবান্না, গোসল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য মানুষ হাহাকার করছে।
সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলোÑ পৌরসভা নাগরিকদের পানি দিতে না পারলেও প্রতি মাসে নিয়মিত পানির বিল ঠিকই পাঠিয়ে দিচ্ছে! পানি সাপ্লাই না দিয়েও মাস শেষে বিলের কাগজ ধরিয়ে দেওয়ার এই অন্যায্য ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে পৌরবাসীর মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। সেবা না পেয়েও কেন প্রতি মাসে বিল গুনতে হবে—এই প্রশ্ন এখন সাতক্ষীরার প্রতিটি নাগরিকের। এই ত্রিমুখী সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জেলার সার্বিক অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে।
কৃষি ও মৎস্য খাতে বিপর্যয়: বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে ফসলের মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো মৎস্য ঘের ও হ্যাচারি। তীব্র গরম ও বিদ্যুতের অভাবে পানি ঠান্ডা রাখার পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ফলে মাছের ঘেরগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এছাড়া বরফকল, ফ্রিজিং প্ল্যান্ট এবং ছোট ছোট উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সচল রাখতে না পেরে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত: সামনে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকলেও গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারছে না। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে বা মোমবাতি-জরুরি আলোর মৃদু আলোয় তাদের পড়তে হচ্ছে। পানির অভাবে এই গরমে তারা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসকদের সতর্কতা: চিকিৎসকরা বলছেন, তীব্র গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, মাথা ঘোরা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই আবহাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। চিকিৎসকরা সবাইকে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন, অথচ সেই পানির জন্যই পৌরবাসীকে চড়া দামে বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে।
প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং পৌরসভার চরম পানি নিষ্ক্রিয়তার যুগপৎ আঘাতে আজ নাকাল সাতক্ষীরাবাসী। তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তীব্র গরম আর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি পানি না পেয়েও বিল দেওয়ার এই দ্বৈত ও ত্রিমুখী যন্ত্রণা দীর্ঘদিন কোনো জনপদের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়।
সাতক্ষীরার মানুষ প্রশাসনের কাছে দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার, বিদ্যুতের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করার এবং অবিলম্বে পৌরসভায় নিয়মিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছেন। প্রকৃতির কাছে তাদের এখন একটাই প্রার্থনা—”একটু বৃষ্টি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আর এক ফোঁটা সুপেয় পানি।” লেখক: সাবেক ব্যাংকার









