বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ণ
দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প

মো. কায়ছার আলী

‘জীবে দয়া করে যে জন, সে জন সে বিছে ঈশ্বর।’ বাঙালি সাধক স্বামী বিবেকানন্দের এ মহান কালজয়ী উক্তি দিনে ২২ ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম করে এক বিস্ময়কর প্রশান্তি অর্জন করে ‘সেবাই ধর্ম’ এ মর্মবাণীকে বড় প্রেরণা মনে করে নিজ জীবনকে মানবতার জন্য সারা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন তিনি হলেন আধুনিক নার্সিং এর প্রবর্তক মমতাময়ী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। এক মুহূর্তের জন্যে ও তাঁর স্বভাবের কোন বিরক্তি, কোন ব্যস্ততা, ব্যবহারে কোন বিভ্রান্তি প্রকাশ করত না। খাদ্য, বিশ্রাম বা গরম তাঁর মহান কাজে কখনো বাধার সৃষ্টি করতে পারত না।

 

১৮২০ সালের ১২ই মে জমিদার ধনী, বৃটিশ বাবা মায়ের কণ্যা ইটালির ফ্লোরেন্স শহরে ভ্রমনের সময় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান ফ্লোরেন্স শহরের নামানুসারেই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে পারিবারিক স্বচ্ছলতার কারণে কোন কিছুর চাহিদা অপূর্ণ রাখেননি তাঁর পরিবার। ১৭ বছর বয়সে তিনি যে অন্তর থেকে অনুভব করতে শুরু করলেন মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে দিয়ে কিছু করাতে চান। কিন্তু কি বিষয় সেটা উপলব্ধি করতে করতে পেরিয়ে গেল বেশ কয়েক বছর। তাঁর ছোটবেলা ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ার অঞ্চলে তাঁদের পুরনো বাড়িতে কেটেছে।

 

নাইট ক্লাবে যাওয়া বা কেতাদুরস্ত জীবন কখনো কোমল মনের অধিকারী ফ্লো কে ভালো লাগত না, বরং গ্রাম্য পরিবেশ আর দুস্থ-অসহায় মানুষের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি,ভেড়া অসুস্থ হলে তিনি সেবা করতেন। অপরিসীম মমতা থাকার কারণে তিনি মানুষের দুর্ভাগ্যকে নিজের দুর্ভাগ্য হিসেবে মনে করতেন। আহত মানুষের কথা শুনলে তাঁর চোখ গভীর মমতায় ছলছল করে উঠত। তাদের জন্য কিছু করার একটা তাগাদা সববসময় অনুভব করতেন।

 

নিজের মহল্লার মধ্যে কোন আহত বা অসুস্থ মানুষের কথা শুনলে কালবিলম্ব না করে ছুটে যেতেন সেই ছোট্ট বয়সেই। চেষ্টা করতেন কিভাবে সেবা করা যায়? ফলে আশেপাশের সামাজিক পরিবেশে তিনি সকললের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বাল্যকালেই দেখলেন একদিন এক নির্দয় বালক একটি কুকুরকে পাথর দিয়ে ঢিল মেরে আহত করলেন। তিনি দেখলেন যে আহত কুকুরটি হাঁটতে পারছে না। তিনি কুকুরটিকে তুলে আনলেন এবং সেবা করে সুস্থ করে তুললেন। এ ঘটনা তাঁর মনকে সেবিকা হওয়ার পেছনে অনুপ্রেরণ যোগায়।

 

২০ বছর বয়সেই তিনি সঙ্গীত, ছবি আঁকার পাশাপাশি গ্রীক, ল্যাটিন, জার্মানি, ফ্রেঞ্চ ভাষা আয়ক্ত করে ফেললেন। পিতার পাশাপাশি পড়াশোনা বিষয়ক প্রকৃত গাইড হিসেবে ছিলেন তাঁর বোন প্যানথেনোপ। তাঁদের পিতা অভিজাত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হওয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রী, বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি তিনি সামান্যতম আকর্ষণ অনুভব করতেন না। বরং তাঁর ইচ্ছা ছিল কিভাবে সেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে পালন করা যায়। সে সময় সেবাকে কোন পেশা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হত না।

 

হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল যেমনি ভয়াবহ তেমনি করুন। সেবিকা হওয়ার ইচ্ছার কথা শুনে তাঁর পিতা-মাতা চমকে উঠলেন। আপত্তির ঝড় উঠল সামাজিক ও পরিবারিক পর্যায়ে। মেয়ের ইচ্ছার যেন পরিবর্তন হয় তাই তাঁকে দেশ ভ্রমণে পাঠিয়ে দিলেন। ভ্রমনে গিয়ে তিনি রোমান ক্যাথলিক কনভেন্টে সন্ন্যাসিনীদের সেবামূলক কাজ দেখে উৎসাহিত হলেন। তিনি সেখানে (জার্মানে) তিন মাস প্রশিক্ষণ নিলেন এবং ভাবলেন ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে এ ধরনের একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন।২৮ বছর বয়সে ৩৮ বছরের সম্ভান্ত, সুঠাম চেহারার সিডনি হার্বাটের সাথে ইউরোপ ভ্রমনের সময় প্রগাড় বন্ধুত্ব হয়। তিনি জানতেন বিয়ে করলে সেটা সেবার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

 

ইউরোপের হাসপাতালের কাজকর্ম কাজের পদ্ধতি তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন। হাসপাতাল ছিল রীতিমতো আতঙ্কের জায়গা। সেখানে যেতে লোকেরা ভয় পেত। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, দূষিত পরিবেশ, বিভিন্ন রোগের আক্রান্তদের গাদাগাদি করে একসঙ্গে রাখা স্যাঁতস্যাঁতে ছাতা পরা মেঝে, ভ্যাপসা গন্ধ এগুলো ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে এলে তাঁর পিতামাতা মনে করলেন তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে। কিন্তু তিনি আবার বললেন আমি সেবিকা হতে চাই। পুনরায় মেয়ের কথা শুনে বাবা-মা চমকে উঠলেন। বিভিন্ন ভাবে বাধা দিয়ে ব্যর্থ হলেন এবং পরিশেষে অশ্রুসিক্ত চোখে মেয়ের ইচ্ছার সম্মতি দিলেন।

 

১৮৫৪ সাল। তখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনী পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা কোন যুদ্ধে হারবে না এটা প্রত্যেক ব্রিটেন বাসী মনে করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং তুর্কির সাথে জোট বেঁধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল। ঝকমকে ইউনিফর্ম পড়া সৈন্যরা জাহাজে ঊঠেছে, যে জাহাজ তাদের নিয়ে যাবে কৃষ্ণ সাগরের এক উপদ্বীপ ক্রিমিয়ায়। রোদে ঝলমল করছে পতাকা, ব্যান্ড বাজছে, প্যারেডের পুরোভাগে গর্বিত ভঙ্গিত ড্রাম বাজছে। এই দৃশ্যটা ইতিহাসের সোনালি পাতায় আজও লেখা রয়েছে অবরুদ্ধ তুর্কিদের সাহায্য করতে উত্তরের দিকে জাহাজ নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অগ্রসর হল। তখনও কেউ ভাবতে পারেনি তারা পর্যদুস্ত হবে রোগ, বিশৃঙ্খলা, ঠান্ডার প্রকোপ আর ক্ষুধার কাছে।

 

যুদ্ধ শিবিরে হঠাৎ ভয়ানক কলেরা মহামারীর আকারে রূপ নিল। ব্রিটিশ সেনারা শুনতে লাগল পানিতে মৃতদেহ ছুড়ে ফেলার ঝপাং ঝপাং শব্দ। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই সমগ্র সেনাবাহিনী প্রায় অকেজো হয়ে পড়ল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কৃষ্ণ সাগর পেরিয়ে সেবাস্তোপোলের দিকে শুধুমাত্র সৈন্যদের নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মালবাহী পশু, তাঁবু, উনুন, ঔষধপত্র, হাসপাতাল, বিছানা অন্যান্য জিনিসপত্র সব পরে রইল খোলা মাঠে জন্তু-জানোয়ারের নাদিমাখা খড়ের উপর। চিকিৎসা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেল।

 

ব্রিটিশ পত্রিকায় এমন খবর প্রকাশ হলে জনগনের চাপে সরকার বাধ্য হয়ে আহত অসুস্থ সৈন্যদের তত্ত্বাবধান করবার মত কেউ না থাকায় আত্মীয় পরিজনের সব বাধা উপেক্ষা করে ফ্লোরেন্স নাইপিঙ্গেল ৩৮জন মহিলার একটি দল তৈরী করে যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য রওনা হলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে দেখলেন খোলা বারান্দা, নোংরা ওয়ার্ড, পাঁক ভর্তি ডোবা আর রাবিশে ভরা চারিদিক। চার মাইল লম্বা বিছানার সারি ফুটাখানেক তফাতে আহতরা শুয়ে আছে। সংক্রমক রোগ আর কীট-পোকা অনায়াসে বিচরণ করছে সেনা নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালে। পরিকাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে, মূল্যবান খাদ্য সামগ্রী নষ্ট হয়ে পঁচে যাচ্ছে সংরক্ষনের অভাবে। নেই অপারেশন টেবিল, ঔষধপত্রের যোগান, আসবাবপত্র, নার্সদের ঘরে ছিল ইঁদুর আর নীল মাছির উৎপাত কোন স্যসপেন বা কেটলি নেই।

 

যে পাত্রে মাংস ফোটানো হয়েছে। সেই পাত্রেই চা তৈরী হচ্ছে। প্রয়োজনীয় লন্ঠন ও মোমবাতি নেই, রাতে শোনা যেত ইঁদুর চলাফেরার শব্দ। রুগ্ন ও আহতদের এক বিশাল তরঙ্গ আছড়ে পড়ল স্কুতারির উপর। নিকটবর্তী ছাউনিটি পরিবর্তিত হল আবর্জনার একস্তুপে মৃতদেহ, আর কেটে বাদ দেয়া হাত-পা ভাসতে লাগলো সেই তরঙ্গহিন সমুদ্রে। দুর্গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠল। প্রচন্ড শীত, গরম খাবারের অভাব, ঠান্ডায় জমে যাওয়া মাটি ছাড়া শোবার কোন জায়গা নেই। চারদিকে অসুখ আর গ্রাংগ্রীণ- সেএক নারকীয় অবস্থা।

 

বাঁধ ভাঙা পানির মত অসুস্থদের ঢেউ আর ঢেউ। মেঝের প্রতিটি ইঞ্চি ভরে গেল মানুষে। বালিশের অভাবে জুতা মাথায় দিয়ে তারা খালি তক্তার ওপরেই শুয়ে পড়ত। কুড়িটি বিষঠা পাত্র থাকলেও অন্তত এক হাজার মানুষ ভুগছিল পেটের রোগে। কথায় আছে ‘মরার উপর খড়ার ঘা’। নভেম্বরের ১৪ তারিখে এল এক প্রবল ঝড়। সৈন্য বাহিনীর সব তাঁবু উড়ে গেল। শুধু লোকগুলো পড়ে রইল একেবারে খোলা আকাশের নীচে। প্রতিটি জাহাজ ডুবে গেল। সদ্য জাহাজে আসা অতি প্রয়োজনীয় গরম কাপড় ও জিনিসপত্র সেটিও বাদ রইল না।

 

সেই আতঙ্কজনক পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়ের ইতিহাসে তুলনাহীন বিপর্যয়’ বলা হয়। মানুষের অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসা ফ্লোরেন্সকে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি যেমনি দয়ার প্রতিমূর্তি তেমনি কাজের ক্ষেত্রে কঠিন, কঠোর অর্থাৎ সামান্যতম বিশৃঙ্খলা বিচ্যুতি সহ্য করতে পাতেন না। কখনো কখনো আট ঘন্টা এক নাগাড়ে হাটুতে ভর দিয়ে ক্ষতস্থান পরিস্কার করে আহতদের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন।

 

কখনো তাদের পোশাক পড়িয়ে দিয়েছেন। নিজ হাতে রোগীদের জন্য খাবার তৈরী করেছেন এবং সহকর্মীর হাতে হাত লাগিয়ে হাসপাতালের আঙিনা পরিষ্কার করেছেন। যখন কারো অস্ত্রোপচার করতেই হতো তখন তিনি তার পাশে থাকতেন। তাদের মনে আশার সঞ্চর করতেন, তাদের সাথে কথা বলতেন হেসে হেসে। দিনে সম্ভব না হলে তিনি রাতে তুর্কি প্রদীপ হাতে নিয়ে সেই চার মাইল লম্বা বিছানার সারি ধরে ঘুরে দেখতেন। যখন আলো হাতে নিয়ে ঘুরে দেখতেন তখন রোগীরা মুদ্ধ বিষ্ময় চোখে তাঁকে দেখত।

 

তাদের মনে হতো এক মূর্তিময়ী দেবী যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারা সব দু:খ যন্ত্রণা মুহূর্তে ভুলে যেতেন। একজন সৈনিক চিঠিতে লিখেছিলেন, যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হাঁটতেন, এক অনির্বচনীয় আনন্দে আমাদের মন প্রাণ ভরে উঠত, তিনি প্রত্যেকটি বিছানা অতিক্রমের সময় তাঁর ছায়া পড়ত আমাদের শয্যার উপর। সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধার সাথে সেই ছায়াকে চুম্বন করত। প্লিজ পাঠকেরা ভাবুনতো এতবড় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পাওয়া কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব? এজন্যই তো তিনি মানব ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

 

তখন তারা বলত, “দীপ হাতে রমনী” এই নামেই তিনি সমস্ত পৃথিবীর মাঝে অমর হয়ে রইলেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালের দুরত্ব কিন্তু কম ছিল না। তথাপি কোন দায়িত্ব ভার গ্রহণে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করতেন না। প্রবল তুষারপাত বৃষ্টির মধ্যেই তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় মুত্যুর হার হাজারে থেকে ষাটে এসে দাঁড়াল।

 

যুদ্ধের পরে তাঁর কাজ শেষে ফিরে করে আসার সময় নিজ ডায়েরীতে লিখলেন ‘হায় আমার দুর্ভাগ্য সন্তানেরা, আমি অত্যন্ত দুষ্টু মায়ের মত তোমাদের ক্রিমিয়ার কবরে ফেলে রেখে নিজে ঘরে ফিরলাম। ছ’মাসে আটটা রেজিমেন্টার ৭৩ শতাংশই শুধু অসুখে মারা গেল-কে আর ভাবে এখন সে কথা’। ক্রিমিয়-জ্যোতি হিসেবে সারাদেশে ভরে গেল স্মারক, মগ, প্লেট, মাটির তৈরি আবক্ষ মূর্তি, কবিতা, রেসের ঘোড়ার নাম, লাইফ বোটের নাম আর জীবনীতে। তখন তাঁর মা ফ্যানি আবেগে অভিভূত হয়ে পড়লেন।

 

ফ্লোকে তিনি চিঠিতে লিখলেন, মেয়ের জন্য আজ তার কত গর্ব। অতীতকে এক পাশে সরিয়ে রেখে ফ্লোরেন্স উত্তরে লিখলেন, ‘আমার খ্যাতি আমার কাছে আশীর্বাদ হয়ে আসেনি, তবু যদি তুমি খুশি হয়ে থাক, তাই-ই আমার অনেক।’ ক্রিমিয়া যুদ্ধের (১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬) পর নার্সদের জন্য যা যা দরকার তা তাঁর চোখে পড়ল। তিনি উপলব্ধি করলেন, কিভাবে নাসিং কে একটি সম্মানজনক পেশায় পরিনত করা যায়? তার জন্য সংস্কার, নির্দিষ্ট আচরণ বিধি এবং সাফল্যের মাপকাঠি বা ব্যবস্থাপনা এ সম্পর্কে তাঁর চেয়ে আর বেশি কেউ জানত না। আজকের হাসপাতালের ফুলদানিরতে রাখা ফুল আর উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন ও মনোরম ওয়ার্ড তাঁরই কাজের প্রত্যক্ষ ফল। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘নোটস অন হসপিটালস’ নামে একটি বই লিখলেন।

 

এতে তিনি দেখালেন, কেন মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পায় আর কিভাবে এ অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়? তিনি লিখেছেন জীবনযাত্রার ন্যুনতম মানই সৈনিকদের মুত্যুর কারণ। সুষম খাদ্যের অভাব আর বিভিন্ন রোগে ভোগে অযতœ অবহেলায় প্রতিবছর ১৫০০ জন মারা যায়। যদিও সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে শক্ত সামর্থ ছেলেদের ভর্তি নেওয়া হয়। অতিরিক্ত কাজের চাপে বা মন খারাপের ফলে (সাধরণত পারিবারিক কারণে) তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হল। তিনি প্রায় দুর্বলতা, ক্লান্তি আর শ্বাসকষ্টে ভুগতেন। ১৮৭৪ সালে এক কঠিনতম সময়ে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে তিনি শোকে মূহ্যমান হয়ে যান।

 

 

ক্রিমীয় থেকে আসার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁর সম্মানে একটি আলাদা জাহাজ পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করে সকলের সাথেই দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সমস্ত দেশ তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য প্রস্তুত কিন্তু নাম নিয়ে হৈ চৈ করা তাঁর অপছন্দ ছিল। শুধুমাত্র মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি যোগদান করেছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমতে কমতে প্রায় অন্ধ হয়ে গেলেন। ১৯০৭ সালে নভেম্বর মাসে ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম অ্যাডওয়ার্ড ফ্লোরেন্স নাইটঙ্গেলকে ‘অর্ডার অব মেরিট’ সম্মানে ভূষিত করলেন। ১৯১০ সালে মে মাসে অনুষ্ঠিত হল ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল ফর নার্সেস’ এর সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব।

 

১৯১০ সালে ১৩ আগস্ট তিনি ৯০বছর বয়সে ঘুমে ঢলে পড়লেন- সে ঘুম আর ভাঙ্গল না। ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ এর নিজস্ব ইচ্ছা অনুযায়ী এম্বলিতে তাঁদের আদি বাড়ির কাছাকাছি শান্ত স্থানে, অনাড়ম্বরভারে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হল। শুধু একটি ছোট্ট ক্রুশ স্মৃতিফলক হিসেবে চিহ্নিত করছে তাঁর সমাধি। এফ.এন. জন্ম ১৮২০, মৃত্যু ১৯১০ এর চেয়ে মহৎ কোন স্মৃতিসৌধ চাননি মহীয়সী মমতাময়ী, কোমলমতি, চির কুমারী এবং শ্রেষ্ঠ এই নারী।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

 

Ads small one

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বর্ষার স্থায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনার পাইকগাছায় হঠাৎ করেই ডেঙ্গু রোগীর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে এডিস মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, বাসাবাড়ির আঙিনায় কিংবা আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি—যেমন পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ড্রেন ও ডাবের খোসাই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া উপজেলার বাইরে থেকেও আক্রান্ত রোগী আসার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। চিকিৎসকদের বক্তব্য স্পষ্ট—ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা এবং মশারির ব্যবহার প্রাথমিক ও কার্যকর প্রতিরোধক।
তবে বাস্তবতা হলো, কেবল সচেতনতামূলক বার্তা কিংবা পরামর্শ প্রদান করে এমন জনস্বাস্থ্য সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের নিজস্ব সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত সমন্বয় এখানে অত্যন্ত জরুরি।
পাইকগাছার বর্তমান পরিস্থিতি যেন মহামারীর দিকে মোড় না নেয়, সে জন্য অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তা হলোÑ পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উদ্যোগে পাইকগাছার প্রতিটি ওয়ার্ডে অবিলম্বে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ (ফগিং ও লার্ভিসাইড স্প্রে) শুরু করতে হবে। ড্রেন, বদ্ধ জলাশয় ও জমে থাকা পানির স্থানগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়মিত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বর হলেই যেন রোগীরা হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান, সে লক্ষ্যে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য রাখা এবং গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি বাড়াতে হবে। কাজের তাগিদে বা ভ্রমণের কারণে যারা বাইরে থেকে উপজেলায় আসছেন, তাঁদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল রূপ নেওয়ার আগেই সমন্বিত ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসচেতনতাÑএই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া পাইকগাছাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে জোর দেবেনÑএমনটাই প্রত্যাশা।

​মিরপুরে সাবেক গাড়িচালককে ‘হত্যার চেষ্টা’, এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
​মিরপুরে সাবেক গাড়িচালককে ‘হত্যার চেষ্টা’, এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

Oplus_131072

​পত্রদূত ডেস্ক: ​সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসামাজিক কার্যকলাপের গোপন তথ্য জেনে ফেলার কারণে সাবেক গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির বিচার দাবি করে এবং নিজের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী ওবায়দুর রহমান। আবেদনটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে।
​আবেদনে ওবায়দুর রহমান (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ২৩৬৭৪৫০৬৫৩) উল্লেখ করেন, বিগত ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানার উত্তর কালশীর আলীনগরে অবস্থিত ‘রোজ গার্ডেন টাওয়ার ২’-এর একটি ফ্ল্যাটে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
​আবেদনকারীর দাবি, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নির্দেশে তিন ব্যক্তি লাঠিসোটা নিয়ে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেন। হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আবেদনে বলা হয়, ওবায়দুরের চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে তাঁর মা ও ছোট বোন এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি প্রাণভয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
​হামলার পেছনের কারণ হিসেবে ওবায়দুর রহমান আবেদনে দাবি করেন, তিনি এমপি গাজী নজরুলের দীর্ঘদিনের গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। এই সুবাদে এমপির বিভিন্ন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত অসামাজিক কার্যকলাপের তিনি প্রত্যক্ষদর্শী।
​আবেদনে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এলাকায় জমি ও বালুমহাল দখল, ঘুষ গ্রহণ এবং গ্যাং বা ‘মব’ গঠন করে সন্ত্রাসের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে এমপির বিতর্কিত গতিবিধির কয়েকটি নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ের কথা আবেদনে উল্লেখ করে তা সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়। ​এমপি গাজী নজরুলের আদেশে এই হামলা চালানো হয়েছে দাবি করে ওবায়দুর রহমান অভিযুক্ত হামলাকারী এবং নির্দেশদাতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে বিতর্কের মুখেই ২১ জুলাই নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি লিখিত বিবৃতি দিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। লিখিত বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটি গত ১৩ জুলাইয়ের এবং এর পেছনে তাঁর নিজস্ব গাড়িচালকের সুপরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির নীল নকশা রয়েছে।
বিবৃতিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, গত ১৩ জুলাই তিনি তাঁর প্রথমা স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে মগবাজারে অবস্থিত দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তাঁরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। অবস্থানকালে গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ সুকৌশলে ৬ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে ওই কার্যালয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই অপরিচিত ব্যক্তিরা কক্ষে ঢুকে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের পরিচয় জানতে চেয়ে চরম হেনস্তা করে। একপর্যায়ে তাঁদের কার্যালয়ের নিচে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। সে সময় তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা প্রদান করার পরই তাঁরা সেখান থেকে রেহাই পান।
ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতিতে গাজী নজরুল ইসলাম জানতে পারেন যে, এই পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাঁর গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ, যিনি সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা। সংসদ সদস্য জানান, তাঁর শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর দুলাভাইয়ের পারিবারিক পূর্বশত্রুতা ছিল। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ তাঁর কাছে ৫ লাখ টাকা এবং মাসুম বিল্লাহর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং পরিবারের ক্ষতি করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও এমপি গাজী নজরুল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৫০ পূর্বাহ্ণ
দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও এমপি গাজী নজরুল

Oplus_131072

ভিডিওতে ভাইরাল, জামায়াত এখন কী করবে
পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য, তাঁর প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী, শ্বশুর ও দলীয় নেতাদের কাছ থেকে নানা ব্যাখ্যামূলক ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটে দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি বিতর্কিত জীবনবৃত্তান্ত (বায়োডাটা) ও কাবিননামা ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। বিষয়টি মঙ্গলবার টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও স্থান পায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। বিবিসির খবরে বলা হয়Ñ এক তরুণীর সাথে নিজের ‘ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ভিডিও’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলছেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি, তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ই জুন ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।
যদিও সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণীর একটি জীবন বৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবুজ কালির কলমে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন মি. ইসলাম, যাতে তারিখ উল্লেখ আছে ২২শে জুন ২০২৬। ওই জীবন বৃত্তান্তে তরুণীটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।
ভাইরাল হয়ে পড়া ওই জীবন বৃত্তান্ত অনুযায়ী তরুণীটি ২০০৮ সালের ২২শে মে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ৭৭ বছর বয়েসি মি. ইসলামের দাবি অনুযায়ী ১৭ই জুন বিয়ে হলে ওই দিন তরুণীটির বয়স ছিল ১৮ বছর ২৬দিন।
গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদে জামায়াত দলীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছিলেন যে, মি ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ‘মেয়েদের শালীনভাবে চলাফেরা ও মাথায় পর্দা রাখার পরামর্শ’ দেওয়া নিয়ে মি. ইসলামের একটি বক্তব্যের পুরনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে ঘটনাটির দিকে তারা দলীয়ভাবে নজর রাখছেন এবং বেআইনি বা অবৈধ কিছুর প্রমাণ পেলে সে অনুযায়ী দল ব্যবস্থা নিবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার দল জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেও একই বক্তব্য দিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামকে সালোয়ার কামিজ পরিহিত এক তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। তার এই ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মি. ইসলাম ওই তরুণীর এক মামাকে দায়ী করেছেন।
কিন্তু ওই তরুণী তার বিবাহিত স্ত্রী হয়ে থাকলে তার মামা কেন এটি করবে সেই প্রশ্নের কোনো জবাব আসেনি কোনো পক্ষ থেকে।
সোমবার বিকেল থেকেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করলে প্রথম দিকে ফেসবুকে তার সমর্থকরা এটি ‘এআই ব্যবহার করে করা হয়েছে’ উল্লেখ করে পাল্টা প্রচারণা শুরু করে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল নাগাদ কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে যে ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়।
এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মঙ্গলবার বেলা ১২টা ০১ মিনিটে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম।
এতে তিনি দাবি করেন, গত ১৭ই জুন পারিবারিকভাবে তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার বাসভবনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে তার বিরুদ্ধে ‘প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই’ বলে দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন যে, গত ১৩ জুলাই, ২০২৬ ইং তারিখে তিনি তার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ব্যবসায়িক অফিসে যান।
“সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি। আমরা উক্ত অফিসে অবস্থানকালে যোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে ৫/৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লক্ষ টাকা আদায় করে”।
তিনি ওই বিবৃতিতে আরও বলেন, “আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি এসময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মোঃ মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
‘’পরবর্তীতে, হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের একজন এমপিকে তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা বা তার লোকেরা জিম্মি করে টাকা আদায় করবেন- এ দাবি কতটা যৌক্তিক তাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছে মগবাজারে, যেটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছেই। সাধারণত ওই এলাকায় জামায়াতের বহু কর্মী সমর্থকের উপস্থিতি থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “কথাটা হয়তো যৌক্তিক মনে হচ্ছে না কিন্তু এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি তার স্ত্রীদের নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রীরাও সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন। তারপরেও আমরা সাংগঠনিকভাবে দেখবো যে তাকে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে নাকি অন্য কিছু হয়েছে। সেটি দেখে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবো আমরা”।
মঙ্গলবার দুপুরের পর পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মাকসুদা ইসলাম একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে তাকে লিখিত বিবৃতি পড়তে দেখা গেছে।
এতে তিনি বলেছেন, “আমার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামের সহিত মরিয়মের (দ্বিতীয় স্ত্রী) সাথে বিবাহ হয়েছে। যারা এটা নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ থেকে বিরত না থাকলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো”।
এরপর নিজেকে গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী পরিচয় দিয়েও আরেকটি বক্তব্য দেন গাজী নজরুল ইসলামের সাথে দেখা যাওয়া তরুণী। এই ভিডিওতে তাকে মুখে মাস্ক পরা দেখা গেছে। সেখানে ওই তরুণী বলেছেন, “আমার স্বামী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে আমি দেশবাসীর সামনে প্রকৃত ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই।’’
তিনি বলেন, “প্রথমত আমাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৭ই জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগর আমার বাবার বাসায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তেরই জুলাই গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে আমার বাবার অফিসে যান”।
জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদীয় দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে এসেছে এবং তারা এ বিষয়ে নজর রাখছেন।
“সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নানাভাবে এসেছে। ওনার ও তার স্ত্রীদের বক্তব্যও এসেছে। তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু না করেন তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু করে থাকেন তাহলে অবশ্যই জামায়াত দল হিসেবে ব্যবস্থা নিবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “এমপি সাহেব বলেছেন সাথে তার স্ত্রী ছিল। এখন সেই ভিডিও কিভাবে ভাইরাল হলো সেই তথ্য উদঘাটন করতে হবে। এটি কী তাকে হেয় করার চেষ্টা নাকি অন্য কোনো বিষয় সেটি সাংগঠনিকভাবে দেখে, শুনে ও বুঝে আমরা পদক্ষেপ নিব”।
গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল শোরগোলের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, “গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব গাজী নজরুল ইসলাম কে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব খবরাখবর প্রচারিত হয়েছে তার প্রেক্ষিতে আজ ২১শে জুলাই (মঙ্গলবার) এক বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি বলেন, “অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
“ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জনাব গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে,” বিবৃতিতে দলটি বলেছে।