বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

নাম নিয়ে আলোচিত বগুড়ার সেই চার ইউপিতে প্রশাসক নিয়োগ পেলেন যারা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ১০:৫৯ অপরাহ্ণ
নাম নিয়ে আলোচিত বগুড়ার সেই চার ইউপিতে প্রশাসক নিয়োগ পেলেন যারা

বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় নবগঠিত আলোচিত চারটি ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নামকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) চার ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো।

এর মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলায় নবগঠিত মীরবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান, মোকামতলা উপজেলায় স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, সীমান্ত ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশল নাজমুল হোসাইন এবং দিগন্ত ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আল মামুন।

স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে: মীর শাহে আলমস্বৈরাচারের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে: মীর শাহে আলম
সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বগুড়ার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রাজিয়া সুলতানা। এর আগে মঙ্গলবার বিকালে শিবগঞ্জ ও মোকামতলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের কাছে এই চার প্রশাসক নিয়োগের নাম প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।

রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‌‘চার ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন শিবগঞ্জের ইউএনও। প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চার ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে।’

১১ জুন বগুড়া জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি এবং মোকামতলা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়। এতে শিবগঞ্জ উপজেলায় গঠিত নতুন ইউনিয়নের নামকরণ হয়েছে ‘মীরবাড়ি ইউনিয়ন’। অন্যদিকে নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় গঠিত নতুন তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ হয়েছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গেজেট অনুযায়ী ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে স্বর্ণগ্রাম, সৈয়দপুর ইউনিয়ন ভেঙে সীমান্ত এবং দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে দিগন্ত ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর ‘মিরাকল’ বলা চার ইউপির প্রশাসক হচ্ছেন কারা?প্রতিমন্ত্রীর ‘মিরাকল’ বলা চার ইউপির প্রশাসক হচ্ছেন কারা?
স্থানীয় লোকজন বলছেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাসভবন মীরবাড়ির নামে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে মীরবাড়ি। অপরদিকে তার দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ও মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে যথাক্রমে সীমান্ত ও দিগন্ত। স্থানীয় এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, শুধু ছেলেদের নামে নয়, লন্ডনে থাকা ভাতিজির নামেও ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজিকে পরিবারে স্বর্ণা বলে ডাকা হয়। তাই তার নামানুসারে মোকামতলায় ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন নামকরণ হয়েছে।

বিষয়টি জাতীয় সংসদেও সমালোচনা হয়েছে। গত সোমবার জাতীয় সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর দলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। পরে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাই করে গণশুনানি করে নতুন নামকরণ করেছেন। সৈয়দপুর ইউনিয়ন গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় এটার নাম করা হয়েছে ‘সীমান্ত’ ইউনিয়ন। আরেকটি গাইবান্ধার কাছে, এটি অনেক দূরবর্তী হওয়ায় এটার নাম রেখেছে ‘দিগন্ত’।মিরাকেলি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকতো, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।’

প্রতিমন্ত্রী দিলেন ডিও লেটার, নাম প্রস্তাব বিএনপি নেতার, সংসদে ‘মিরাকল’প্রতিমন্ত্রী দিলেন ডিও লেটার, নাম প্রস্তাব বিএনপি নেতার, সংসদে ‘মিরাকল’
তবে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন শিবগঞ্জ উপজেলার এক সভায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মাহবুব আলম মানিকসহ দলের কয়েকজন নেতা ইউনিয়নগুলোর নামকরণের বিষয়ে প্রস্তাব দিলে সভায় তা গৃহীত হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন থেকে নামগুলো লিখিত প্রস্তাব আকারে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসক ১১ জুন ‘মীরবাড়ি ইউনিয়ন’ এবং ১৪ জুন ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’ নামে গেজেট জারি করেন।

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকার লোকজনও বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক ‘মীরবাড়ি’ এবং তার দুই ছেলে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’র নামেই নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণ করা হয়েছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯ সালের ১৮ ধারা অনুযায়ী নাগরিক সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নবগঠিত ওই সব ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলে ও পৈতৃক বাড়ির নামে তিন ইউনিয়ন গঠনপ্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলে ও পৈতৃক বাড়ির নামে তিন ইউনিয়ন গঠন
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেছেন, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) পাওয়ার পর দুই উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। নামকরণের আগে এলাকাবাসীর মতামত গ্রহণের জন্য গণশুনানি করা হয়। সেখানে মোকামতলা উপজেলায় দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে দুটি ইউনিয়ন করা হয়েছে। এ কারণে দেউলী নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দিগন্ত ইউনিয়ন নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সৈয়দপুর ইউনিয়ন সোনাতলা ও গাবতলী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হওয়ায় এ ইউনিয়ন ভেঙে সীমান্ত নামকরণ করা হয়েছে।

Ads small one

শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান

এম.এম হায়দার আলী

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। বিগত সরকারের আমলে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ, কালভার্ট, সড়ক-মহাড়ক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, আর সেটা হলো বেকারত্ব। কর্মক্ষম হয়েও যখন একজন মানুষ কাজের সুযোগ পান না, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা আনুমানিক ২৭ থেকে ২৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ এবং নারী প্রায় ১০ লাখ। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে অনেকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ না পেয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকলে অনেকেই হতাশা, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকেন।

 

এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ মাদকাসক্তি, জুয়া, অনৈতিক কর্মকান্ড কিংবা অন্যান্য সমাজ বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। যদিও এসব অপরাধের পেছনে নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণও থাকে। তবুও কর্মসংস্থানের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা, এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাই দেশের প্রতিটি জেলায় শিল্পকারখানা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং দক্ষতা উন্নয়ন ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

 

রাজধানী কেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় পর্যায়েই লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। এতে শহরমুখী জনগ্রোতও কমবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, সহজ ঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে হবে।

 

সরকার, বেসরকারি খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ। একটি কর্মসংস্থান শুধু একজন মানুষের আয়ের পথ খুলে দেয় না; এটি একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, সমাজে স্থিতিশীলতা আনে এবং অপরাধপ্রবণতা কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, মাদক, জুয়া, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেতে পারে।

 

এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার ওপরও, মামলার চাপ কমলে তারা আরও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের সেবা দিতে পারবেন। ফলে দেশের প্রতিটি জেলায় সন্তোষজনক কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই সত্যিকার অর্থে শান্তির সুবাতাস বইবে। সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, বেকারত্ব দূর করা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি একটি মানবিক, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবন বদলে দেয় না,বদলে দেয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও…।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

একটি বীজের ভবিষ্যৎ, একটি বনের অস্তিত্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
একটি বীজের ভবিষ্যৎ, একটি বনের অস্তিত্ব

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়Ñএটি একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি প্রাকৃতিক ঢাল এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনরেখা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও, এর প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত আছে এর প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের ক্ষমতায়।

 

নদী, জোয়ার-ভাটা এবং কাদা-চরের জটিল সমন্বয়ে এই বন নিজেকে প্রতিনিয়ত পুনর্গঠন করে, টিকিয়ে রাখে হাজারো প্রাণ ও মানুষের অস্তিত্ব। সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে “লংমার্চ ফর ফরেস্ট” কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচি কেবল একটি প্রতিবাদ নয়; এটি সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় একটি গভীর সতর্ক সংকেত।

 

কারণ, যেটি একসময় প্রাকৃতিকভাবে বন সৃষ্টি করত, সেই প্রক্রিয়াই আজ মানুষের হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর স্বয়ংক্রিয় পুনর্জন্ম ব্যবস্থা। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুরসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ গাছের ফল ও বীজ জোয়ারের পানিতে ভেসে নদী, খাল ও চরের কাদায় পৌঁছে যায়। সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেগুলো অঙ্কুরিত হয়ে নতুন গাছের জন্ম দেয়।

 

এই প্রক্রিয়ায় মানুষের কোনো পরিকল্পনা বা হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতি নিজেই নির্ধারণ করে কোথায় কোন গাছ জন্মাবে। ফলে যে গাছ জন্মায়, তা সেই পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। নদীর চরে ভেসে আসা বনজ বীজ স্থানীয় কিছু মানুষ জ্বালানি বা অন্যান্য প্রয়োজনে সংগ্রহ করছেন। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষুদ্র ঘটনা মনে হলেও, সমষ্টিগতভাবে এর প্রভাব ভয়াবহ।

অনেকে মনে করতে পারেন, কয়েকটি বীজ সংগ্রহ করলে কী এমন ক্ষতি হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি বীজ একটি সম্ভাব্য গাছ, আর প্রতিটি গাছ একটি সম্ভাব্য বাস্তুতন্ত্র। একটি পরিপূর্ণ ম্যানগ্রোভ গাছ শুধু কাঠ বা ছায়া নয়Ñএটি শতাধিক প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল, নদীর তীর সংরক্ষণের প্রাকৃতিক দেয়াল এবং কার্বন শোষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অর্থাৎ একটি গাছ হারানো মানে একটি পুরো ক্ষুদ্র জীবনচক্রের সম্ভাবনা হারানো। যখন হাজার হাজার বীজ সংগ্রহ করা হয়, তখন ভবিষ্যতের বন গঠনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

এই ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও, দুই বা তিন দশক পরে এর প্রভাব ভয়াবহভাবে প্রকাশ পায়। বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তার অন্যতম ভুক্তভোগী দেশ। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা রেমালের মতো দুর্যোগ সুন্দরবনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার পুনর্জন্ম ক্ষমতা। পুরোনো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নতুন গাছ জন্ম নিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করে। কিন্তু যদি সেই প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তবে বন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

সুতরাং বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধের বিষয়টি কেবল বন সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের সবুজ ঢাল। ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই বন বাতাসের গতি কমায়, জলোচ্ছ্বাসের শক্তি হ্রাস করে এবং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ প্রতিটি নতুন গাছ ভবিষ্যতের একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা স্তম্ভ। একটি বীজ আজ রক্ষা পেলে তা ভবিষ্যতে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে পরিণত হবে, যা হয়তো কোনো এক দুর্যোগে হাজার মানুষের জীবন বাঁচাবে।

 

তাই একটি বীজের গুরুত্ব কেবল পরিবেশগত নয়, এটি মানবিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। তবে সমস্যাটিকে একমাত্র পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাবে না। শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা কিংবা মোংলা অঞ্চলের বহু মানুষ চরম দারিদ্র্েযর মধ্যে বসবাস করেন। বিকল্প জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক সুযোগের অভাবে তাঁরা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। নদীতে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ তাঁদের কাছে সহজ ও সস্তা জ্বালানির উৎস। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। বরং এতে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হলে আগে মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান বন আইন বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও “প্রাকৃতিকভাবে ভেসে আসা বীজ সংগ্রহ” বিষয়ে স্পষ্ট বিধান নেই। ফলে এটি এক ধরনের ধূসর এলাকায় থেকে যায়, যেখানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কঠিন। বন বিভাগের জনবল সীমিত, নদী ও চরের বিস্তৃতি বিশাল, আর স্থানীয় অর্থনৈতিক চাপ অত্যন্ত বেশি।

 

এই বাস্তবতায় শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা, যেখানে পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া আলাদা করে সুরক্ষিত থাকবে। সুন্দরবনের কোন এলাকায় কত বীজ স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, কোথায় পুনর্জন্ম বেশি হচ্ছেÑএ ধরনের তথ্য এখনো সম্পূর্ণভাবে সংগৃহীত নয়। ফলে পরিকল্পনা অনেকাংশে অনুমাননির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বন বিভাগের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ “ম্যানগ্রোভ পুনর্জন্ম মানচিত্র” তৈরি করা জরুরি। এতে করে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।

 

সেখানে “কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট” পদ্ধতিতে মানুষকে বন রক্ষার অংশীদার করা হয়। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় জনগণকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হয়। ফলে বন ধ্বংসের প্রবণতা কমেছে এবং পুনর্জন্ম বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এই ধরনের অংশীদারিত্বভিত্তিক মডেল গ্রহণ করা যেতে পারে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম রক্ষায় কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরিÑপ্রথমত, নদীতে ভেসে আসা বনজ বীজ সংগ্রহ নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জ্বালানি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। চতুর্থত, গবেষণাভিত্তিক পুনর্জন্ম মানচিত্র তৈরি করতে হবে।পঞ্চমত, ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে। সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়Ñএটি বাংলাদেশের জলবায়ু নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।

 

এই বনের প্রতিটি বীজ ভবিষ্যতের একটি গাছ, প্রতিটি গাছ ভবিষ্যতের একটি ঢাল। আজ যে বীজ নদীতে ভেসে আসে, সেটি যদি রক্ষা করা যায়, তবে সেটিই একদিন উপকূলকে রক্ষা করবে। আর যদি সেই বীজ হারিয়ে যায়, তবে হারিয়ে যাবে ভবিষ্যতের বন, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু বন রক্ষার নয়Ñপ্রশ্নটি হলো আমরা কীভাবে আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করব।

একটি ছোট বীজ হয়তো চোখে তুচ্ছ, কিন্তু সেই বীজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি বন, একটি উপকূল এবং একটি জাতির টিকে থাকার সম্ভাবনা।
লেখক: সংবাদকর্মী

কলারোয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে দুই হোটেল মালিককে জরিমানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪৫ অপরাহ্ণ
কলারোয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে দুই হোটেল মালিককে জরিমানা

নিজস্ব প্রতিনিধি: কলারোয়ায় দুই হোটেল মালিককে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত।

 

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে উপজেলা মোড়স্থ রাজ হোটেলের মালিককে ৩ হাজার টাকা ও দুলাল হোটেলের মালিককে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান তানভীর।

 

তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরণেরর অভিযান অব্যাহত থাকবে।