পরিবেশ দিবসে অস্তিত্বের সন্ধিক্ষণে সুন্দরবন ও উপকূল
সোহাগ হোসেন
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জন্য এই দিবসের গুরুত্ব আরও গভীর।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আজ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান এই অঞ্চলে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সুপেয় পানির সংকট উপকূলের মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ করে তুলছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর বিরূপ প্রভাবের অন্যতম প্রধান শিকার এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে এনেছে। দুর্যোগ শেষ হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। জলোচ্ছ্বাসের নোনা পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করে ফসল উৎপাদন ব্যাহত করছে, অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে এবং জীবিকার অনিশ্চয়তায় মানুষ বাধ্য হচ্ছে স্থানান্তরিত হতে।
অন্যদিকে, দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় সুন্দরবনও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য প্রভাবে বনের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং মিষ্টি পানির উৎস কমে যাওয়া উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়লে উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই বাস্তবতায় সুন্দরবন ও উপকূল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
প্রথমত, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাঁধগুলোর নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কপোতাক্ষ, বেতনা, ইছামতী, শিবসাসহ উপকূলীয় নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।
তৃতীয়ত, সুন্দরবনে অবৈধ শিকার, বন উজাড়, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চতুর্থত, উপকূলজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারণ করে প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসলের চাষ সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ষষ্ঠত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সপ্তমত, মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমে। সবশেষে, সরকার, স্থানীয় জনগণ, গবেষক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; কারণ সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া সুন্দরবন ও উপকূল রক্ষা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সুপেয় পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও সময়ের দাবি। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া বন সংরক্ষণের প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবকল্যাণকে সমন্বিত করেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের মনে রাখতে হবে, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপকূল ও সুন্দরবন রক্ষা করা মানে দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তাই সময় এসেছে আনুষ্ঠানিকতার গন্ডি পেরিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারলেই প্রকৃতি আমাদের রক্ষা করবে-এই উপলব্ধিই হোক বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক: সোহাগ হোসেন, পরিবেশ কর্মী, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, মাস্টার্স (শেষ বর্ষ), সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা।









