এম এ হালিম, উপকূলীয় অঞ্চল (শ্যামনগর): যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যুব নেতৃত্ব বিকাশের লক্ষ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে জেলা পর্যায়ের দিকনির্দেশনা অধিবেশন ও যুব নেটওয়ার্ক গঠন সভা।
সোমবার (২৭ এপ্রিল ২০২৬) শ্যামনগর উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ‘ইয়ুথ শেয়ার-নেট’ প্রকল্প-এর আওতায় দলিত-এর বাস্তবায়নে সম্পন্ন হয়। প্রকল্পটি সাতক্ষীরাসহ খুলনা বিভাগের খুলনা, যশোর, নড়াইল ও বাগেরহাট জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
আয়োজকরা জানান, বাংলাদেশে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার এখনও একটি সংবেদনশীল ও অনেকাংশে উপেক্ষিত বিষয়। সামাজিক রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার এবং তথ্যের অভাবের কারণে বিশেষ করে দলিত ও প্রান্তিক তরুণ-তরুণীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। এ বাস্তবতায় তরুণদের জ্ঞান ও সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি শক্তিশালী যুব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ২০ জন তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী, স্থানীয় যুব ক্লাবের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মসূচিতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে মৌলিক ধারণা, শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক কলঙ্ক ও বাধা মোকাবেলার কৌশল এবং যুব নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক আলোচনা, দলীয় কাজ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে বিষয়গুলোকে সহজ ও বাস্তবমুখীভাবে তুলে ধরা হয়।
আয়োজকদের মতে, এই দিকনির্দেশনা অধিবেশনের মাধ্যমে একটি জেলা পর্যায়ের যুব নেটওয়ার্ক গঠিত হবে, যা ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২০ জন যুবক নিজ নিজ এলাকায় ছোট ছোট দল গঠন করে প্রায় ২০০ জন প্রান্তিক তরুণ-তরুণীর মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ক ধারণা দেন দলিত-এর ‘ইয়ুথ শেয়ার-নেট’ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাকিকুরুন আক্তার। এ সময় কর্মসূচিতে অংশ নেন দলিত-এর ‘ইয়ুথ শেয়ার-নেট’ প্রকল্পের অর্থ কর্মকর্তা প্রতাপ কুমার দাস ও প্রোগ্রাম অফিসার রতিকান্ত মুন্ডা।
এসময় বক্তারা বলেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে নীরবতা ভাঙতে হবে এবং তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নির্ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। একইসঙ্গে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে যুবকদের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অংশগ্রহণকারীরা জানান, এ ধরনের আয়োজন তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে। তারা ভবিষ্যতে নিজ নিজ এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আয়োজকদের আশা, ‘ইয়ুথ শেয়ার-নেট’ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই যুব নেটওয়ার্ক উপকূলীয় অঞ্চলে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ওরিয়েন্টেশনের সমাপনী পর্যায়ে উপজেলা ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) কর্মকর্তা প্রণব বিশ্বাস বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা। তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, যে কোনো ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনায় নির্ভয়ে আইনি সহায়তা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সব স্তরে এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুব সমাজই পারে সমাজের বিদ্যমান কুসংস্কার ভাঙতে এবং একটি নিরাপদ, সচেতন ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে। তাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় হয়ে কাজ করার মাধ্যমে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।