বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সাড়ে পাঁচ দশকের পুরনো ঐতিহ্যবাহী লাল-সবুজ লোগো পরিবর্তনের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আগস্টের শেষের দিকে বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি’ শিরোনামে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে নতুন লোগোর ডিজাইন ও আইডিয়া আহ্বান করা হয়। এরপরই এই বিতর্কটি সামনে আসে।
দেশের সংস্কৃতিকর্মীদের একটাই প্রশ্ন লোগো বদলালেই কি বদলে যাবে বিটিভি? দেখে নেওয়া যাক সংস্কৃতিজনদের কে কী বলেছেন-
খ.ম. হারূন (সাবেক উপমহাপরিচালক ও নন্দিত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘বিটিভির স্বর্ণালী সময়ের একটি আবেগ এখনও টিকে আছে, সেটি হলো বিটিভির লোগো। এই লোগোকে আরও আকর্ষণীয় করা যেতে পারে, কিন্তু সেটা হতে হবে ঐতিহাসিক ‘লোগো’টিকে টিকিয়ে রেখে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘এখন এনালগ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে গেছে বিটিভি। প্রতিদিন প্রযুক্তি আরও আধুনিক হচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের সম্প্রচার কর্মীদের সেভাবে প্রস্তুত করতে পারিনি এটা আমাদের ব্যর্থতা।’
আবুল হায়াত (অভিনেতা)
বিটিভির লোগো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আমার কাছে পাগলামি মনে হয়। এটা একটা হাস্যকর বিষয়। কাউকে দামি পোশাক পরালে কি সে কখনো জ্ঞানী হয়? এর আগেও আমরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করতে দেখেছি, পোশাক পরিবর্তন করতে দেখেছি। কিন্তু নাম ও পোশাক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে কী আমরা ভালো কিছু পেয়েছি?
বিটিভির কর্তৃপক্ষের উচিত দর্শক কেন বিটিভি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, কেন দর্শকের বিটিভির ওপর আস্থা নেই এসব বিষয় নিয়ে কাজ করা। লোগো নিয়ে পড়ে না থেকে অনুষ্ঠান বা কনন্টের মান বাড়ানো উচিত বিটিভির। এই লোগো যদি গত ৫০ বছর থাকতে পারে তাহলে আগামীতে থাকতে সমস্যা কোথায়? লোগোর মধ্যে তো আমরা কোনও সমস্যা দেখি না। যেসব বিষয়ে সমস্যা আছে সেগুলো চিহিৃত করে ঠিক করতে পারলেই মানুষ বিটিভিমুখী হবে আমি মনে করি।
ডলি জহুর (অভিনেত্রী)
আমার প্রশ্ন হলো এই লোগো কেন পরিবর্তন করতে হবে। বিটিভি কর্তৃপক্ষ যদি এই কেন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে তাহলে পরিবর্তন নিয়ে আমার আপত্তি নেই। লোগো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তো বিটিভির অন্য কিছুতে পরিবর্তন হবে না। বিটিভির মানহীন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছু পরিবর্তনের সুযোগ আছে। আমি মনে করি কর্তৃপক্ষকে সে সব বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিটিভিকে দর্শকমুখী করার জন্য লোগোর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। দর্শক কী চায় সেই বিষয়গুলো সঠিকভাবে কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারলেই চলবে।
শেখ সাদী খান (সংগীত পরিচালক ও সুরকার)
সামাজিক যোগামযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘একটা কিছু না করলে নাম থাকবে কেমন করে? এ ধরনের নতুন কিছু করতে গেলে প্রথমে একটা বিজ্ঞ কমিটি গঠন প্রয়োজন! সেই কমিটির যুক্তি মতামতকে প্রাধান্য দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত! এটা তো কারও ব্যক্তিগত সংসার না। এসব চিন্তা ছেড়ে মান সম্মত অনুষ্ঠান এবং সুস্থ সমাজ গড়ার দিকে নজর দিলে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে! সবচেয়ে আগে বিটিভির স্বচ্ছতা প্রয়োজন। অভিশপ্ত জাতির মঙ্গল হোক।’
আশরাফ বাবু (গীতিকার ও সুরকার)
লোগো চেঞ্জ করে কি বিটিভির মান ঠিক করা যাবে? আবার আরেক সরকার এসেই লোগো আবার চেঞ্জ করবে। বরং সাধারণ জনগণ থেকে আইডিয়া নিতে পারে কি ধরনের কি মানের প্রোগ্রাম তারা দেখতে চায় । বিটিভিরমান পরিবর্তনে অনেক কিছু করণীয় দরকার।
যা বললেন বিটিভির বর্তমান মহাপরিচালক
এদিকে তীব্র সমালোচনার মুখে বিটিভির বর্তমান মহাপরিচালক কাজী জেসিন বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লোগো পরিবর্তনের কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। কেবল তরুণ প্রজন্ম (জেন-জি) এবং সাধারণ দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আইডিয়া জানতেই এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগটি বিটিভির সার্বিক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র। এর পাশাপাশি নতুন কনটেন্ট তৈরি, আর্কাইভ আধুনিকায়ন, কর্মীদের সম্মানী কাঠামো এবং বিলিং পলিসিতেও বড় ধরনের সংস্কারের কাজ চলছে।’