এম. এম হায়দার আলী
একটি শিশুর পৃথিবীতে আসা মানেই একটি নতুন সূর্যের জন্ম। তার প্রথম কান্না শুনে যেমন মায়ের চোখ ভিজে ওঠে, তেমনি বাবার বুকও অদ্ভুত এক আনন্দে ভরে যায়। একটি ছোট্ট হাত যখন মায়ের আঙুল শক্ত করে ধরে, তখন মনে হয় পৃথিবীর সব নিরাপত্তা যেন ওই মুঠোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবীর সব শিশুর ভাগ্যে কি সেই নিরাপদ আশ্রয় লেখা থাকে? এতদিন শুনে এসেছি, সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতককে রাস্তার পাশে, ডাস্টবিনে, ঝোপঝাড়ে কিংবা হাসপাতালের বারান্দায় ফেলে রেখে যাওয়ার নির্মম কাহিনি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, এর চেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্য আর কী হতে পারে ! কিন্তু এবার হৃদয় যেন অন্যরকম ব্যথায় কেঁপে উঠল। দেশের স্বনামধন্য একটি মিডিয়ার সংবাদে দেখলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার খরমপুর কেল্লা বাবা (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে সাত মাস বয়সী একটি পুত্র শিশুকে রেখে চলে গেছে কেউ। অর্থাৎ সে মায়ের বুকের দুধ খেয়েছে, বাবার কোলে হয়তো একদিন হেসেছে, কারও আঙুল ধরে হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। তারপর একদিন হঠাৎ তার পৃথিবী বদলে গেল। যে বুক ছিল তার আশ্রয়, সেই বুকই তাকে অচেনা মানুষের ভিড়ে রেখে অদৃশ্য হয়ে গেল। ভাবতে অবাক লাগে,শিশুটি কি বারবার মায়ের জন্য কেঁদেছিল? সে কি বুঝতে পেরেছিল, যাকে খুঁজছে তিনি আর ফিরবেন না? শিশুরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু তাদের নীরব কান্নার ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ভাষা। সেই ভাষা কি আমরা শুনতে পাই? আজ প্রশাসন শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছে। সমাজসেবা বিভাগ তাকে নিরাপদ আশ্রয় দেবে। হয়তো সে বড় হবে, পড়াশোনা করবে, জীবনের সঙ্গে লড়াই করবে। কিন্তু তার হৃদয়ের একটি প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? আমার মা কে? আমার বাবা কোথায়? এই দুটি প্রশ্ন হয়তো তার জীবনের প্রতিটি জন্মদিনে, প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি সাফল্যের দিনে, প্রতিটি একাকী রাতে তাকে তাড়া করে ফিরবে। একজন মানুষ নিজের নাম পরিবর্তন করতে পারে, ঠিকানা বদলাতে পারে, পেশা বদলাতে পারে। কিন্তু নিজের জন্মপরিচয় বদলাতে পারে না। পরিচয়হীনতার যন্ত্রণা পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা। আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যদি জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই পরিত্যক্ত হয়ে যায়, তাহলে ব্যর্থতা শুধু একটি পরিবারের নয়; ব্যর্থতা আমাদের সমাজের, আমাদের মানবিকতার, আমাদের মূল্যবোধের। আমি জানি না, শিশুটির মা কী অসহায় পরিস্থিতির শিকার ছিলেন। হয়তো দারিদ্র্য, হয়তো সামাজিক লাঞ্ছনা, হয়তো পারিবারিক নির্যাতন কিংবা এমন কোনো অন্ধকার বাস্তবতা, যার খবর আমরা কোনো দিনই জানব না। তাই কাউকে বিচার করার আগে আমাদের সহমর্মিতাও প্রয়োজন। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়,সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সেই নিষ্পাপ শিশুটি, যে কোনো অপরাধ না করেও আজ নিজের পরিচয় হারিয়েছে। আমার মনে হয়, প্রতিটি পরিত্যক্ত শিশু আসলে রাষ্ট্রের দরজায় নয়, আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে। সে যেন নীরবে জিজ্ঞেস করে,আমি কি এতটাই অপ্রয়োজনীয় ছিলাম? হয়তো একদিন এই শিশুটি বড় হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাববে,আমার চোখ কার মতো ? আমার হাসি কার কাছ থেকে পাওয়া ? আমার কপালের রেখাগুলো কি আমার বাবার মতো? আমার মুখে কি মায়ের ছায়া আছে ? কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ দারিদ্র্য নয়, অনাথ হওয়াও নয়,সবচেয়ে বড় অভিশাপ নিজের শেকড়ের পরিচয় না জানা। আমরা চাই না আর কোনো মাজারের বারান্দা, কোনো হাসপাতালের সিঁড়ি, কোনো ডাস্টবিন কিংবা কোনো রাস্তার ধারে আরেকটি শিশুর পরিচয়ের কবর রচিত হোক। আমরা চাই এমন একটি সমাজ, যেখানে প্রতিটি শিশু জন্ম নেবে ভালোবাসার অধিকার নিয়ে, বড় হবে নিরাপদ পরিচয়ে, আর কোনো দিন তাকে প্রশ্ন করতে হবে না,আমার ঠিকানা কোথায়? কারণ পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর প্রথম ঠিকানা হওয়া উচিত তার মায়ের বুক। আর শেষ আশ্রয় হওয়া উচিত মানুষের ভালোবাসা, পরিত্যাগ নয়। আমি অধমের এমনটি প্রত্যাশা। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট