শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১০ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ

মো. মামুন হাসান

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু শিল্প, কৃষি কিংবা রপ্তানির ওপর নির্ভর করে না। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় পর্যটন এমন একটি খাত, যা একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং একটি দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত পর্যটন উন্নয়নের পরিবর্তে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকের পর্যটন উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত রোডম্যাপ।

সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটনের অবদান ছয় থেকে সাত শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কেবল নতুন পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব ছিল। তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ কখনোই কার্যকর হতে পারে না। তাই পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনার অন্যতম শক্তি হলো দেশের এক হাজার চারশো আটানব্বইটি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা। এতদিন দেশের পর্যটন উন্নয়ন অনেকাংশে কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন পরিকল্পনা সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে।

পর্যটন সম্পদকে তিপ্পান্নটি ক্লাস্টারে ভাগ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দূরদর্শী। কারণ প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। একই নীতিতে সব অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতির বিকাশ ঘটাবে।

তবে এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন।পর্যটন এমন একটি খাত, যেখানে একক কোনো মন্ত্রণালয় সফল হতে পারে না। সড়ক, রেল, নৌপরিবহন, বিমান, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, বন, প্রতœতত্ত্ব, সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা এবং তথ্য প্রযুক্তিসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অতীতে সমন্বয়ের অভাবই বহু সম্ভাবনাময় প্রকল্পকে কাঙ্খিত সফলতা থেকে বঞ্চিত করেছে। তাই এই মহাপরিকল্পনার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিশ্বমানের পর্যটন অবকাঠামো এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা কেবল কক্সবাজারকেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট, খুলনা এবং অন্যান্য অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা ড়ে তোলার উদ্যোগ দেশের পর্যটনকে বহুকেন্দ্রিক করে তুলবে। এর ফলে কক্সবাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন।বিশ্বের কোনো পর্যটন শিল্পই দক্ষ জনবল ছাড়া সফল হয়নি। আধুনিক পর্যটন শিল্পে শুধু হোটেল নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ ফ্রন্ট অফিস কর্মী, শেফ, হাউসকিপিং বিশেষজ্ঞ, ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। জাতীয় হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বিনিয়োগ।

এক্ষেত্রে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পর্যটন শিক্ষাকে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক করতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও আগামী দিনের পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি হতে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল ট্যুর, স্মার্ট ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার, অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল গাইডিং সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যটন সেবা বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে। ভবিষ্যতের পর্যটক প্রথমে ইন্টারনেটে ভ্রমণ করেন, পরে বাস্তবে গন্তব্যে পৌঁছান। তাই ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।

তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর বহু পর্যটন গন্তব্য অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর, নদী এবং উপকূলীয় পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ইকো ট্যুরিজম, কমিউনিটি ট্যুরিজম এবং জলবায়ু সহনশীল পর্যটন উন্নয়নকে এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।

স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। বরং স্থানীয় মানুষকে উদ্যোক্তা, গাইড, হোমস্টে পরিচালনাকারী, কারুশিল্প উৎপাদক এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপক হিসেবে যুক্ত করতে পারলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যাবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের পর্যটন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ এবং টেকসই পর্যটনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের নদী, বন, সমুদ্র, পাহাড়, লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন এবং আতিথেয়তার ঐতিহ্য এই পরিবর্তিত বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে মহাপরিকল্পনা সফল হবে তখনই, যখন এটি কেবল একটি সরকারি নথি হয়ে থাকবে না; বরং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পাবে।

আজ যে মহাপরিকল্পনার সূচনা হয়েছে, সেটি যদি ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বয়ের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী দুই দশকে পর্যটন শুধু বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাতই থাকবে না; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, ব্যাপক কর্মসংস্থানের উৎস, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

Ads small one

কপিলমুনিতে চারা গাছের বাজার জমজমাট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৮ অপরাহ্ণ
কপিলমুনিতে চারা গাছের বাজার জমজমাট

পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি (পাইকগাছা): চাল, ডালসহ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি অন্ততঃ একটি করে গাছ যেন চাই…..চাই। জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে মানুষের মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে বৃক্ষায়ন কর্মসূচীতে নেমেছে মানব সমাজ। আর তা’ই হাটের দিনে গাছের চারা কিনছেন সর্বস্তরের ক্রেতারা। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০/৩০০ টাকায় একটি গাছের চারা সংগ্রহ করে তা বাড়িতে নিয়ে রোপন করছেন নিন্ম আয়ের মানুষ। এতে মধ্যবিত্ত্ব বা বিত্ত্বশালীরাও বসে নেই, তারাও রীতিমত বৃক্ষের চারা কিনে ভ্যান বোঝাই করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

 

খুলনার ঐতিহ্যবাহী বানিজ্যিক কেন্দ্র কপিলমুনিতে চারা গাছের বাজারের চিত্রটা প্রত্যক্ষ করলেই মনে হয় যেন প্রত্যেক মানুষ প্রতিযোগীতা শুরু করেছেন। পরিবেশবিদরা মনে করেন, বৃক্ষায়ন কর্মসূচীতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বৃক্ষায়নের এমন দৃশ্যপট আমাদের সামাজিক পরিবেশকে আরোও তরান্বিত করবে।

জানাগেছে, সরকারের বনায়ন কর্মসূচীর আওতায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচী ও জন-সচেতনতা বৃদ্ধিতে তৃণমূল পর্যায় এর কার্যক্রম চলছে। যে কারণে ”গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান” শোগানে একাতœতা প্রকাশ করে এলাকার মানুষ প্রতিদিনকার সাংসারিক খরচ বাঁচিয়ে নুন্যতম একটি গাছের চারা ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

এলাকার বিভিন্ন নার্সারী মালিকরা ফলজ বৃক্ষের পাশাপাশি মেহগনি, শিরিশ, লম্বু, নিম, গামারী, সেগুন ইত্যাদী গাছের উৎপাদন করে তা বাজারে বিক্রি করছেন। ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০/৪০০ টাকায় উন্নত গাছের চারা সরবরাহ ও বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ভাল জাতের চারা গাছ সংগ্রহে আগাম বায়নাও করছেন অনেকেই।

নার্সারী মালিক আমিন মোল্লা জানান, নিজ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে গাছের চারা বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানী করছেন। যে কারণে অধিক মুনাফা উপার্জিত হচ্ছে তাদের। সূত্রমতে, গত ৮০’র দশকের পর হতে দক্ষিণ পশ্চিম উপকুলীয় এলাকা সমুহে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব ও বিভিন্ন সময়ে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস-এ সাবাড় করে দেয় দক্ষিণ উপকুলীয় এলাকার বনবৃক্ষরাজি। বিভিন্ন সময়ে জলোচ্ছাস ও বন্যায় লবণ পানির প্রভাবে মারাগেছে মূল্যবান গাছপালা। আর এ কারণে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ বনায়ন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে; পরোক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ গাছপালা।

 

শুধু তাই নয়, পরপর দেশে স্মরন কালের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড় আইলা, সিডর, নারগীজ, বুলবুল লন্ডভন্ড করেদেয় সুন্দরবন সহ উপকুলীয় এলাকা। যারফলে সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রীতিমত হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে ফলজ বৃক্ষের পাশাপাশি অধিক হারে বৃক্ষরোপন বা বনায়ন করতে পারলে সার্বিক পরিবেশ রক্ষা পাবে।

গাছ ক্রয় করতে আসা প্রতাপকাটী গ্রামের শাহিদা বেগম বলেন, “প্রতি বছর আমি গাছ লাগাই, আমার ভালো লাগে। গাছ হলো অকৃত্রিম বন্ধু। গাছ যেমন ফল ও অক্্িরজেন দেয়, আবার গাছ বিক্রি করলে নগদ টাকা ও পাই। এসব কারণে আমি গাছ লাগাই।”

সাতক্ষীরা একটি জেলা নয়, একটি অসমাপ্ত গবেষণাগার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২২ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা একটি জেলা নয়, একটি অসমাপ্ত গবেষণাগার

মো. মামুন হাসান

সাতক্ষীরাকে আমরা ভুল জায়গা থেকে দেখতে শুরু করেছি। মানচিত্রে সাতক্ষীরা একটি জেলা। পর্যটনের ভাষায় সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। কিন্তু গবেষকের চোখে এটি আরও বড় কিছু। এটি এমন একটি ভূখন্ড, যেখানে একই সঙ্গে প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস, জলবায়ু, অর্থনীতি এবং টিকে থাকার কৌশল প্রতিদিন একে অন্যের সঙ্গে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

সুতরাং সাতক্ষীরার পর্যটন উন্নয়নের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, “আর কোথায় পর্যটনকেন্দ্র বানানো যায়?” প্রশ্ন হওয়া উচিত, “সাতক্ষীরার কোন গল্পটি এখনো পর্যটন হয়ে ওঠেনি?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সুন্দরবনের বাইরেও একটি সম্পূর্ণ নতুন সাতক্ষীরা আবিষ্কার করা সম্ভব।

ধরা যাক, কোনো পর্যটক সাতক্ষীরায় এসে শুধু সুন্দরবন দেখলেন না। তিনি একটি লবণাক্ত গ্রামের মাটির গল্প শুনলেন, দেখলেন কীভাবে একজন কৃষক বদলে যাওয়া পানির সঙ্গে কৃষির নতুন সমীকরণ তৈরি করছেন। কোনো মৌয়ালের কাছ থেকে শুনলেন বন ও মানুষের সম্পর্কের গল্প। কোনো জেলের নৌকায় বসে জানলেন জোয়ারের ভাষা। কোনো নারীর কাছ থেকে শুনলেন ঘূর্ণিঝড়ের পর একটি পরিবারের পুনর্গঠনের কাহিনি। স্থানীয় রান্না খেলেন, একটি পরিবারের বাড়িতে রাত কাটালেন এবং পরদিন ইতিহাসের কোনো স্থানে গিয়ে শুনলেন কয়েক শতাব্দীর গল্প।

তখন পর্যটক শুধু জায়গা দেখছেন না। তিনি একটি ভূখন্ড পড়ছেন। এই ধারণা থেকেই তৈরি হতে পারে “জীবন্ত সাতক্ষীরা”। যেখানে জাদুঘরের দেয়ালে ইতিহাস বন্দী থাকবে না, ইতিহাস ছড়িয়ে থাকবে মানুষের জীবনে। নদী হবে প্রদর্শনী, গ্রাম হবে গবেষণাক্ষেত্র, হোমস্টে হবে শ্রেণিকক্ষ, আর স্থানীয় মানুষ হবেন সেই জীবন্ত জাদুঘরের কিউরেটর।

এটি কল্পনা নয়। সাতক্ষীরার উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট ও মানুষের অভিযোজন নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এবং স্থানীয় জ্ঞান ও সংগঠনের গুরুত্ব উঠে এসেছে। তাহলে কেন সাতক্ষীরায় জলবায়ু পর্যটন হবে না?দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আসবে উপকূলের বাস্তবতা দেখতে। গবেষকরা আসবেন লবণাক্ততার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে। পরিবেশবিদরা দেখবেন ম্যানগ্রোভ ও মানুষের সম্পর্ক। পর্যটক দেখবেন কীভাবে প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার বিজ্ঞান তৈরি করছে।আরও এক ধাপ এগিয়ে সাতক্ষীরাকে করা যেতে পারে বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ উন্মুক্ত পর্যটন গবেষণাগার।

প্রতিটি পর্যটন এলাকায় থাকবে একটি গল্প, একটি গবেষণা বিষয় এবং একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম। কোথাও নদী ও জোয়ার, কোথাও ম্যানগ্রোভ, কোথাও উপকূলীয় কৃষি, কোথাও লোকসংস্কৃতি, কোথাও ধর্মীয় ঐতিহ্য, কোথাও স্থানীয় খাদ্য। পর্যটক চাইলে দর্শক হবেন, চাইলে শিক্ষার্থী, চাইলে গবেষক। এখানে পর্যটনের নতুন মুদ্রা হবে শুধু টাকা নয়, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। আর স্থানীয় মানুষ? তাঁরা পর্যটনের দর্শক নন, অংশীদার। সুন্দরবন এলাকায় কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাতেও স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ চিহ্নিত হয়েছে। তাই সাতক্ষীরার পর্যটন পরিকল্পনায় একটি নতুন হিসাব প্রয়োজন।

একজন পর্যটক কত টাকা খরচ করলেন, শুধু সেটি নয়। তাঁর সেই টাকা থেকে কত অংশ স্থানীয় কৃষকের কাছে গেল, কত অংশ নৌকার মাঝির কাছে গেল, কত অংশ নারী উদ্যোক্তার কাছে গেল, কত অংশ গাইডের আয় হলো, কত অংশ প্রকৃতি সংরক্ষণে ফিরে গেল, সেটিও হিসাব করতে হবে। তখন পর্যটন হবে স্থানীয় সম্পদ থেকে স্থানীয় সমৃদ্ধি তৈরির ব্যবস্থা।

সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ পর্যটন তাই পাঁচ তারকা হোটেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপা উচিত কতটি পরিবার পর্যটন থেকে আয় করছে, কতজন তরুণ গাইড হয়েছে, কতজন নারী উদ্যোক্তা হয়েছে, কতটি স্থানীয় খাবার নতুন বাজার পেয়েছে এবং পর্যটনের আয় থেকে কতটুকু প্রকৃতি সংরক্ষণে ফিরে যাচ্ছে। কারণ সুন্দরবনের মূল্য শুধু তার গাছপালা কিংবা বাঘে নয়। গবেষণায় সুন্দরবনের পর্যটনসেবার অর্থনৈতিক মূল্যও পরিমাপ করা হয়েছে।

 

সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই কোনো একটি দর্শনীয় স্থান নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের অসমাপ্ত গল্প। এই গল্পকে যদি গবেষণা, প্রযুক্তি, স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে সাতক্ষীরাকে আর সুন্দরবনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পরিচয় দিতে হবে না। বরং একদিন পর্যটকের প্রশ্ন হতে পারে, “সুন্দরবন দেখতে এসেছি ঠিকই, কিন্তু সাতক্ষীরার সেই জীবন্ত গবেষণাগারটি কোথায়?” সেদিনই বুঝব, সাতক্ষীরার পর্যটন বদলেছে।আর তার আগে বদলাতে হবে আমাদের চোখ।

লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

সাংবাদিকতা: আমরা কোমন সাংবাদিক চাই?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:১৫ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতা: আমরা কোমন সাংবাদিক চাই?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন সাংবাদিকের হাতে থাকে তথ্য, প্রশ্ন করার সাহস এবং জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব। কিন্তু যখন এই পেশার সঙ্গে নানা ধরনের স্বার্থ, পরিচয়, প্রভাব কিংবা অনৈতিক কর্মকা- জড়িয়ে পড়ে, তখন সাংবাদিকতার মূল চেহারাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়Ñকে প্রকৃত সাংবাদিক, আর কে কেবল সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছে?

 

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিচয়ের পরিধিও বেড়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অনলাইন গণমাধ্যমের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা সংবাদ প্রকাশকে গণতান্ত্রিক করেছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে এক নতুন সংকট। সাংবাদিকতার পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের চেয়ে সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সাংবাদিক এবং নামধারী সাংবাদিকের মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

 

আজ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের মূল পরিচয় সাংবাদিকতা নয়, কিন্তু গলায় একটি পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে কিংবা একটি ছোট্ট অনলাইন পোর্টালের নাম ব্যবহার করে তারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে চান। কোথাও কোথাও সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, তদবির কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের অভিযোগও শোনা যায়। এ ধরনের কর্মকা- শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মানকেও ক্ষুণœ করে।

 

আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সাংবাদিকতার চেয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া। কেউ প্রেসক্লাবের পরিচয়কে সাংবাদিকতার সমার্থক মনে করেন, কেউ আবার বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি কোনো পদ নয়; মূল শক্তি হচ্ছে মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের সাহস।

 

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণও সাংবাদিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একটি অংশ প্রকাশ্যে বা নীরবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ফেলছে। মতাদর্শ থাকা দোষের নয়; কিন্তু সংবাদ পরিবেশনে যদি নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়, তাহলে সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না, সেটি প্রচারণায় পরিণত হয়।

 

সংবাদ ও মতামতের এই সীমারেখা মুছে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ পাঠক। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আরেক ধরনের সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য প্রকাশ, গুজবকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন কিংবা অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দ্রুত হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় নির্ভুল হওয়ার দায়বদ্ধতা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই হলো সত্যতা যাচাই। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে।

 

দেশে এখনো এমন বহু সাংবাদিক আছেন, যারা নীরবে কাজ করে চলেছেন। তারা প্রচারের আলোয় আসেন না, সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন না। কিন্তু মানুষের সমস্যা তুলে ধরেন, দুর্নীতি উন্মোচন করেন, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করেন এবং ঝুঁকি নিয়েও সত্য প্রকাশ করেন। অনেক সময় তাদেরই হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়। তবুও তারা নীতি থেকে সরে যান না। প্রকৃত অর্থে তারাই সাংবাদিকতার প্রাণশক্তি। সাংবাদিকতার সংকট তাই কেবল ব্যক্তির সংকট নয়; এটি প্রতিষ্ঠান, নীতিমালা ও পেশাগত সংস্কৃতিরও সংকট।

 

অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করা, সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং নৈতিকতা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার রোধে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমাজকে ঠিক করতে হবে তারা কেমন সাংবাদিক চায়।

 

এমন সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতার কাছে নতজানু নন; যিনি ব্যক্তিস্বার্থের জন্য কলম বিক্রি করেন না; যিনি সত্যের সঙ্গে আপস করেন না; যিনি মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং তথ্যকে অস্ত্র নয়, দায়িত্ব হিসেবে ব্যবহার করেন। সাংবাদিকের পরিচয় কোনো আইডি কার্ডে সীমাবদ্ধ নয়, কোনো প্রেসক্লাবের সদস্যপদেও নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সততা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থে নির্ভীক অবস্থান।

 

সমাজের প্রয়োজন সেই সাংবাদিক, যিনি খবরের আড়ালের সত্য খুঁজে বের করবেন, মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন এবং গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আজ যখন সাংবাদিকতার নানা রকম পরিচয় নিয়ে আলোচনা হয়, তখন শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেÑআমরা কি সংখ্যায় বেশি সাংবাদিক চাই, নাকি মানে বড় সাংবাদিক? কারণ একটি সমাজকে বদলে দিতে শত সাইনবোর্ডধারী সাংবাদিক নয়, একজন সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকই যথেষ্ট।

লেখক: সংবাদকর্মী