বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ
মো. মামুন হাসান
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু শিল্প, কৃষি কিংবা রপ্তানির ওপর নির্ভর করে না। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় পর্যটন এমন একটি খাত, যা একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং একটি দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত পর্যটন উন্নয়নের পরিবর্তে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকের পর্যটন উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত রোডম্যাপ।
সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটনের অবদান ছয় থেকে সাত শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কেবল নতুন পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব ছিল। তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ কখনোই কার্যকর হতে পারে না। তাই পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনার অন্যতম শক্তি হলো দেশের এক হাজার চারশো আটানব্বইটি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা। এতদিন দেশের পর্যটন উন্নয়ন অনেকাংশে কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন পরিকল্পনা সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে।
পর্যটন সম্পদকে তিপ্পান্নটি ক্লাস্টারে ভাগ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দূরদর্শী। কারণ প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। একই নীতিতে সব অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতির বিকাশ ঘটাবে।
তবে এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন।পর্যটন এমন একটি খাত, যেখানে একক কোনো মন্ত্রণালয় সফল হতে পারে না। সড়ক, রেল, নৌপরিবহন, বিমান, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, বন, প্রতœতত্ত্ব, সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা এবং তথ্য প্রযুক্তিসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অতীতে সমন্বয়ের অভাবই বহু সম্ভাবনাময় প্রকল্পকে কাঙ্খিত সফলতা থেকে বঞ্চিত করেছে। তাই এই মহাপরিকল্পনার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিশ্বমানের পর্যটন অবকাঠামো এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা কেবল কক্সবাজারকেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট, খুলনা এবং অন্যান্য অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা ড়ে তোলার উদ্যোগ দেশের পর্যটনকে বহুকেন্দ্রিক করে তুলবে। এর ফলে কক্সবাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন।বিশ্বের কোনো পর্যটন শিল্পই দক্ষ জনবল ছাড়া সফল হয়নি। আধুনিক পর্যটন শিল্পে শুধু হোটেল নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ ফ্রন্ট অফিস কর্মী, শেফ, হাউসকিপিং বিশেষজ্ঞ, ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। জাতীয় হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বিনিয়োগ।
এক্ষেত্রে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পর্যটন শিক্ষাকে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক করতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও আগামী দিনের পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি হতে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল ট্যুর, স্মার্ট ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার, অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল গাইডিং সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যটন সেবা বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে। ভবিষ্যতের পর্যটক প্রথমে ইন্টারনেটে ভ্রমণ করেন, পরে বাস্তবে গন্তব্যে পৌঁছান। তাই ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।
তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর বহু পর্যটন গন্তব্য অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর, নদী এবং উপকূলীয় পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ইকো ট্যুরিজম, কমিউনিটি ট্যুরিজম এবং জলবায়ু সহনশীল পর্যটন উন্নয়নকে এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।
স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। বরং স্থানীয় মানুষকে উদ্যোক্তা, গাইড, হোমস্টে পরিচালনাকারী, কারুশিল্প উৎপাদক এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপক হিসেবে যুক্ত করতে পারলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যাবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের পর্যটন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ এবং টেকসই পর্যটনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের নদী, বন, সমুদ্র, পাহাড়, লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন এবং আতিথেয়তার ঐতিহ্য এই পরিবর্তিত বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে মহাপরিকল্পনা সফল হবে তখনই, যখন এটি কেবল একটি সরকারি নথি হয়ে থাকবে না; বরং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পাবে।
আজ যে মহাপরিকল্পনার সূচনা হয়েছে, সেটি যদি ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বয়ের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী দুই দশকে পর্যটন শুধু বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাতই থাকবে না; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, ব্যাপক কর্মসংস্থানের উৎস, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।






