বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

বুধহাটা বিবিএম কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধির মিত্রের পরলোকগমন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ
বুধহাটা বিবিএম কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধির মিত্রের পরলোকগমন

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা বি বি এম কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধির কুমার মিত্র (৮৫) পরলোকগমন করেছেন। গত মঙ্গলবার বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়।
অধির কুমার মিত্র দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন আদর্শ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসীর কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

 

 

 

 

Ads small one

ইনানীর আগুন ও আমাদের দায়হীনতার সংস্কৃতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩০ অপরাহ্ণ
ইনানীর আগুন ও আমাদের দায়হীনতার সংস্কৃতি

মো. মামুন হাসান

সমুদ্রের কাছে মানুষ যায় নিজেকে একটু ভুলে থাকতে। ঢেউয়ের শব্দে ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে, নোনা বাতাসে জীবনের ব্যস্ততা কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরিয়ে রাখতে। কিন্তু সেই সমুদ্রের তীরেই যদি একটি রাতের ঘুম পরিণত হয় জীবনের শেষ রাতে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু একটি অগ্নিকান্ডের থাকে না; প্রশ্ন ওঠে আমাদের পর্যটনচিন্তা, আতিথেয়তার দর্শন এবং মানুষের জীবনের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে।

কক্সবাজারের ইনানীতে অগ্নিকান্ডে দশজন মানুষের প্রাণহানি তাই নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনার সামনে রাখা একটি কঠিন আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, পর্যটককে স্বাগত জানানোর জন্য আমাদের যতটা প্রস্তুতি, তাঁকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি তার তুলনায় কতটা দুর্বল।

পর্যটনশিক্ষার একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বরাবরই মনে করি, একটি গন্তব্যের সৌন্দর্য তার পাহাড়, সমুদ্র, বন, নদী কিংবা স্থাপত্যে যতটা, তার চেয়ে বেশি নিহিত থাকে মানুষের অভিজ্ঞতায়। একজন পর্যটক একটি গন্তব্যে যান আনন্দের প্রত্যাশা নিয়ে। তিনি সেখানে অর্থ ব্যয় করেন, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করেন, মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেন। বিনিময়ে তাঁর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি চান সম্মান, স্বস্তি এবং নিরাপত্তা। পর্যটন শিল্পের ভাষায় এটিই গন্তব্যের মৌলিক প্রতিশ্রুতি।

ইনানীর ঘটনায় সেই প্রতিশ্রুতিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় তুপতুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ভবনটির নির্মাণে কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণ ব্যবহারের কথা এসেছে। ফায়ার সেফটি সনদ না থাকা এবং ভবনটি আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তেই নিশ্চিত হবে। কিন্তু পর্যটন ব্যবস্থাপনার একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ঝুঁকি আগে থেকেই জানা থাকলে সেখানে পর্যটকদের থাকার সুযোগ কীভাবে অব্যাহত থাকে? এখানেই দুর্ঘটনা আর অব্যবস্থাপনার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানী জেমস রিজনের ‘সুইস চিজ মডেল’ আমাদের শেখায়, বড় দুর্ঘটনা সাধারণত একটি ভুলের কারণে ঘটে না। নিরাপত্তাব্যবস্থার একাধিক স্তরে ছোট ছোট দুর্বলতা জমতে জমতেই একসময় সেগুলো একই সরলরেখায় এসে দাঁড়ায়। তখন একটি সামান্য ত্রুটিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইনানীর ঘটনাকে এই দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যায়, একটি সম্ভাব্য আগুনের উৎসের পাশাপাশি নির্মাণব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনিরাপত্তা, তদারকি এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থার মতো বহু প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে আসে। অর্থাৎ আগুন হয়তো কয়েক মিনিটে ছড়িয়েছে, কিন্তু বিপর্যয়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছে অনেক আগে।

সমাজবিজ্ঞানী ডায়ান ভনের ‘নরমালাইজেশন অব ডিভিয়েন্স’ তত্ত্বও এখানে প্রাসঙ্গিক। কোনো নিয়ম একবার ভাঙার পর যদি বড় বিপদ না ঘটে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সেই নিয়মভঙ্গকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। একসময় জরুরি বহির্গমনপথ না থাকাও অস্বাভাবিক মনে হয় না, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতিও তেমন উদ্বেগ তৈরি করে না, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেও ব্যবসা চলতে থাকে। বিপর্যয় না ঘটার প্রতিটি দিন তখন নিরাপত্তার প্রমাণ বলে মনে হয়। অথচ সেটি নিরাপত্তা নয়, সৌভাগ্য। পর্যটনশিল্প সৌভাগ্যের ওপর চলতে পারে না।

একজন পর্যটক যখন কোনো হোটেল বা রিসোর্টে রাত কাটান, তখন তিনি ধরে নেন প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ। তিনি সাধারণত ভবনের নকশা পরীক্ষা করেন না, ফায়ার সেফটি সনদ দেখতে চান না, জরুরি বহির্গমনপথের প্রকৌশলগত মান যাচাই করেন না। এসব নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং সেবা প্রদানকারীর। পর্যটক তাঁর অর্থ দিয়ে একটি কক্ষ ভাড়া নেন, নিজের জীবন বন্ধক রাখেন না। এই সত্যটি আমরা যত দ্রুত বুঝব, আমাদের পর্যটন তত বেশি মানবিক হবে।

পর্যটনের অর্থনীতি নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা, স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, খাদ্যসেবা সবকিছুই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পর্যটনের সবচেয়ে অদৃশ্য এবং সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো আস্থা। একজন পর্যটক যদি কোনো গন্তব্য সম্পর্কে মনে করেন সেখানে তিনি নিরাপদ, তাহলে সেই আস্থা অন্য পর্যটককেও সেখানে নিয়ে যায়। আবার একটি বড় দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে শোকাহত করে না; তা একটি গন্তব্যের ভাবমূর্তিতেও দীর্ঘ ছায়া ফেলে।

পর্যটন গবেষণায় ‘ডেস্টিনেশন ইমেজ’ বা গন্তব্যের ভাবমূর্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মানুষ কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে শুধু ছবি দেখে না, সেই জায়গার নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান এবং পূর্ববর্তী পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করে। ফলে ইনানীর আগুনের খবর শুধু কক্সবাজারের একটি রিসোর্টের খবর হয়ে থাকে না; এটি বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যের নিরাপত্তা নিয়ে সম্ভাব্য পর্যটকের মনে একটি প্রশ্ন তৈরি করে। আর পর্যটনে একটি প্রশ্ন অনেক সময় একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

আমরা যদি সত্যিই বাংলাদেশকে একটি প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গঙে তুলতে চাই, তাহলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তাকেও ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করতে হবে। একটি পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশপথে শুধু ‘স্বাগতম’ লেখা থাকলেই হবে না; সেখানে পর্যটককে বোঝাতে হবে, তাঁর নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে। হোটেল বা রিসোর্টের বুকিংয়ের সঙ্গে খাবারের তালিকা, কক্ষের ছবি ও মূল্যতালিকার মতোই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্যও দৃশ্যমান হওয়া উচিত।

প্রযুক্তি এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের ফায়ার সেফটি অবস্থা, লাইসেন্স, জরুরি বহির্গমনপথ এবং সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিদর্শনের তথ্য কিউআর কোডের মাধ্যমে পর্যটকের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ হলে অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মে তার সতর্কতাও দৃশ্যমান করা যেতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ পর্যটকের হাতেও চলে আসবে।

তবে বাজারের শক্তির ওপর সব দায় ছেড়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন তদারকির পরিবর্তে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা দরকার। ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ কর্তৃপক্ষ, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সবার কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। কারণ দুর্ঘটনার পর ‘এটি আমার দায়িত্ব ছিল না’ ধরনের বক্তব্য একটি প্রাণও ফিরিয়ে আনতে পারে না।

দূরবর্তী পর্যটন এলাকায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ফায়ার স্টেশন থেকে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট জরুরি উদ্ধারকেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা দরকার। পর্যটনের ভাষায় এটিই হবে ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম সেফটি’। স্থানীয় মানুষকে শুধু পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার করলে হবে না, তাঁদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশীদারও করতে হবে।

এখানে পর্যটন শিক্ষারও একটি নতুন দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন শুধু হোটেলের ফ্রন্ট অফিসে অতিথিকে স্বাগত জানাতে শেখে, তা যথেষ্ট নয়। তাঁদের জানতে হবে কীভাবে জরুরি অবস্থায় একজন অতিথিকে বের করে আনতে হয়, কীভাবে আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে আগুনের প্রাথমিক প্রতিরোধ করতে হয় এবং কীভাবে একটি নিরাপদ আতিথেয়তা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হয়। কারণ আধুনিক আতিথেয়তা শুধু হাসিমুখে সেবা দেওয়ার নাম নয়; এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও একটি পেশা।

দার্শনিক হান্স জোনাসের ‘দায়িত্বের নীতি’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতা কোনো ঐচ্ছিক নৈতিকতা নয়। পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই দর্শন প্রযোজ্য। একটি রিসোর্টের মালিকের কাছে কাঠের নকশা হয়তো ব্যবসার সৌন্দর্য, কিন্তু একজন অতিথির কাছে সেটি নিরাপত্তার প্রশ্ন। একজন উদ্যোক্তার কাছে একটি সিঁড়ি নির্মাণের খরচ হয়তো ব্যয়, কিন্তু আগুনের মুহূর্তে সেটিই হতে পারে একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর পার্থক্য। এই উপলব্ধিটিই আমাদের পর্যটন দর্শনের কেন্দ্রে আনতে হবে।

রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ আমাদের মানুষকে কোনো হিসাবের অঙ্কে পরিণত না করে মানুষ হিসেবেই দেখতে শেখায়। পর্যটকও তাই। তিনি কোনো ‘কাস্টমার নম্বর’ নন, কোনো ‘বুকিং আইডি’ নন। তিনি একজন মানুষ, যাঁর সঙ্গে তাঁর পরিবারের ভালোবাসা, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। তাঁকে নিরাপদ রাখা তাই ব্যবসায়িক কর্তব্যের পাশাপাশি মানবিক কর্তব্যও।

ইনানীর আগুনে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরবেন না। তাঁদের পরিবারের শূন্যতা কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু যদি আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনার দর্শন বদলে দেয়, যদি একটি রিসোর্টের নকশা থেকে একটি পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যন্ত নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, তাহলে সেই শোক ভবিষ্যতের বহু প্রাণ রক্ষার কারণ হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটন মানে মানুষকে কোথাও নিয়ে যাওয়া নয়; পর্যটন মানে মানুষকে একটি অভিজ্ঞতার কাছে নিয়ে যাওয়া। আর সেই অভিজ্ঞতার প্রথম শর্ত আনন্দ, শেষ শর্ত নিরাপদ প্রত্যাবর্তন। আমরা পর্যটককে সমুদ্র দেখাতে পারি, সূর্যাস্ত দেখাতে পারি, পাহাড়ের মেঘ দেখাতে পারি, সুন্দরবনের নীরবতা শোনাতে পারি। কিন্তু তাঁর ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা দিতে না পারলে আমাদের সব আতিথেয়তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ইনানীর আগুন তাই শুধু একটি রিসোর্ট পোড়ায়নি; এটি আমাদের পর্যটনচিন্তার একটি অন্ধকার দিকও উন্মোচিত করেছে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি আগুন নিভিয়ে আবার আগের মতো ফিরে যাব, নাকি এই আগুনের আলোয় নিজেদের ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নতুন করে দেখতে শিখব? কারণ একজন পর্যটককে আমন্ত্রণ জানানো সহজ। তাঁকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে দেওয়াই আসল আতিথেয়তা।

মো. মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১৪ অপরাহ্ণ
জীবনানন্দের ‘বনলতা’র খোঁজে

তারিক ইসলাম

‎‘সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;/ থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

‎বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে তীব্র এক আবেশের নাম ‘বনলতা সেন’। মাত্র বারো লাইনের একটি কবিতা, অথচ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে তা বুনে চলেছে এক চিরন্তন রূপকথা। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা ক্লান্ত এক পথিকের একমাত্র আশ্রয় হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন নাটোরের এই নারী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে এই বনলতা সেন? তিনি কি কবির কল্পনার কোনো মানসকন্যা, নাকি রক্ত-মাংসের কোনো বাস্তব চরিত্র? নাকি রূপক অর্থে জীবনানন্দের পরম প্রশান্তির রূপায়ণ?

‎সাহিত্য গবেষকদের মধ্যে বনলতা সেনের পরিচয় নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। কবির ব্যক্তিগত খাতা ও ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর জীবনে বেশ কয়েকজন নারীর উপস্থিতি ছিল। কেউ বলেন, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দিনগুলোতে কবির পরিচিত কোনো তরুণীই পরবর্তীতে নাটোরের প্রেক্ষাপটে রূপ পেয়েছেন। আবার অনেক গবেষকের মতে, শোভনা বা ‘ওয়াই’ ছদ্মনামের যে নারীর উল্লেখ কবির ডায়েরিতে বারবার এসেছে, তিনিই হয়তো এই বনলতা। তবে তথ্য-উপাত্তের চেয়ে বড় সত্য হলো, জীবনানন্দ তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ে আটকে রাখেননি।

‎বরিশাল থেকে কলকাতা কিংবা দিল্লির নির্জন জীবনপথে কবি বহন করেছেন এক গভীর একাকিত্ব। পৃথিবীর কোলাহল, সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর ঘুরে আসা পথশ্রান্তি শেষে তিনি যে আশ্রয়ের খোঁজ করেছিলেন, বনলতা সেন মূলত সেই শান্তির প্রতীক। নাটোর শহর যেমন ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি ও নীরবতার জন্য পরিচিত, তেমনি ‘নাটোরের বনলতা’ যেন এক চিরন্তনী রূপক, যা স্পর্শ করলে মুছে যায় সমস্ত জরা ও ক্ষয়।

‎আজকের দ্রুতগতি, প্রযুক্তি নির্ভর ও মানসিক অস্থিরতার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন শ্রান্ত পথিক। চারপাশের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও নিঃসঙ্গতার মাঝে আমরাও যেন প্রতিনিয়ত একটু নির্ভেজাল প্রশান্তি খুঁজে ফিরি। তাই একুশ শতকে এসেও বনলতা সেনের আবেদন সামান্যতমও কমেনি। তিনি কেবল ১৯৪২ সালে প্রকাশিত একটি কবিতার চরিত্র নন; বরং আধুনিক মানুষের বুকে লুকিয়ে থাকা গভীর এক স্বস্তির আকুলতা।

‎জীবনানন্দ দাশ তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন, জীবনের সব হিসেব-নিকেশ ও লেনদেন শেষে মানুষের আসল প্রাপ্তিটুকু থাকে ভালোবাসায় এবং আত্মিক শান্তিতে। বনলতার চোখের সেই ‘পাখির নীড়ের মতো’ ছায়া আজও আমাদের ডেকে যায়। তাই বনলতা সেনের খোঁজে কবির যে যাত্রা, তা আসলে একাকী কোনো কবিপুরুষের নয়-তা আমাদের সবারই নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক চিরন্তন প্রয়াস।

লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হোক জাতীয় অগ্রাধিকার, সম্মিলিত দায়িত্ব হোক বাস্তবায়নের শক্তি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৫ অপরাহ্ণ
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হোক জাতীয় অগ্রাধিকার, সম্মিলিত দায়িত্ব হোক বাস্তবায়নের শক্তি

শেখ আমিনুর হোসেন

‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ’-এমন প্রত্যাশাকে সামনে রেখে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান নিয়ে পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দিবসটি ঘিরে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি এখনো বাংলাদেশের অন্যতম বড় জননিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, আহত হয়ে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দিতে পারে, থামিয়ে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কিংবা কেড়ে নিতে পারে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে।

সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিপর্যয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট জাতীয় উন্নয়নের পথেও বাধা সৃষ্টি করে। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কোনো আনুষ্ঠানিক দিবসের প্রতিপাদ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, রোড সেফটি সেল, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, চালক, পথচারী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিক-সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

দিবসের তাৎপর্য ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ-
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, প্রচারাভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির সুফল পেতে হলে সারা বছর ধরে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু চালকদের সচেতন করলেই চলবে না; একই সঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের যোগ্যতা, সড়কের নকশা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

দিবসটির প্রতিপাদ্য যে প্রত্যাশার কথা বলে, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটাতে হলে সড়ক ব্যবহারকারী প্রত্যেককে বুঝতে হবে-সড়ক নিরাপত্তা কারও একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার।

দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ-
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং চালকের ক্লান্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং যাত্রী তোলার জন্য যানবাহনের মধ্যে পাল্লাপাল্লি করার প্রবণতা।

অন্যদিকে, অপরিকল্পিত সড়ক নকশা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব, অস্পষ্ট সড়কচিহ্ন, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র পার্কিং, অনিরাপদ পারাপার এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

অনেক ক্ষেত্রে সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের সময় পথচারী ও সাইকেলচালকদের নিরাপত্তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও জনবহুল এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন।

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে অনুমানের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোন স্থানে, কী কারণে এবং কোন পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, তা শনাক্ত করা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।

জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি-
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে জেলা প্রশাসন।

জেলার দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া, নিয়মিত সমন্বয় সভা করা এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা জরুরি। বিশেষ করে বাজার, বাসস্ট্যান্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও জনবহুল এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং, অনুমোদনহীন স্ট্যান্ড এবং যত্রতত্র যানবাহন থামানোর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি নিরসনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারাভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ শুধু সভা বা নির্দেশনা জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব ও আইনের প্রয়োগ-
সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা অপরিহার্য। ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশকে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, অতিরিক্ত গতি, অবৈধ পার্কিং এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুধু অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিথিলতা কিংবা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক হয়রানি-কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।

মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যানবাহনের গতিনিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সতর্কতা নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের বৈধ কাগজপত্র, লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার, যান চলাচল স্বাভাবিক করা এবং যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে সাহায্য করার পরিবর্তে ভিড় সৃষ্টি বা ভিডিও ধারণের প্রবণতা বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের করণীয়-
নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে উন্নত ও ঝুঁকিমুক্ত অবকাঠামোর বিকল্প নেই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে সড়কের নকশা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপর্যাপ্ত দৃশ্যমানতা, ভাঙা সেতু বা কালভার্ট এবং বিপজ্জনক প্রবেশপথ দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

মহাসড়কে যথাযথ সড়কচিহ্ন, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, রোড মার্কিং, প্রতিফলক এবং প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা নিশ্চিত করতে হবে। জনবহুল এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারের কাছে নিরাপদ পারাপার এবং উপযুক্ত গতিনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

নির্মাণ বা সংস্কারকাজ চলাকালে বিকল্প চলাচলের পথ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন করতে হবে। কারণ অপর্যাপ্ত সতর্কতার কারণে নির্মাণাধীন সড়কেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে উন্নয়ন করতে হবে। শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, বিদ্যমান সড়কগুলোকে নিরাপদ রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রোড সেফটি সেল ও বিআরটিএর কার্যকর ভূমিকা-
সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিকল্পনা গ্রহণ, তথ্য বিশ্লেষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়ে রোড সেফটি সেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে কোন সড়কে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

অন্যদিকে, বিআরটিএকে চালকের লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ এবং পরিবহনসংক্রান্ত বিধিবিধান বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে। চালকের দক্ষতা যাচাই ছাড়া লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ফিটনেস সনদ নবায়ন কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচলের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর ঝুঁকি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল শেখানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবহন মালিকদেরও যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকদের উপযুক্ত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করতে হবে।

চালক, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের দায়বদ্ধতা-
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চালকদের দায়িত্ব সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং পরিহার এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার না করে গাড়ি চালানো প্রতিটি চালকের কর্তব্য।

ঘুম ঘুম অবস্থায়, অসুস্থ শরীরে কিংবা মাদক গ্রহণ করে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। দীর্ঘ যাত্রায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে এবং যাত্রী তোলার জন্য প্রতিযোগিতা কিংবা নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর অতিরিক্ত চাপ পরিহার করতে হবে।

পরিবহন মালিকদের ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে নামানো বন্ধ করতে হবে। চালকের বৈধ লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি যানবাহনের ব্রেক, টায়ার, হেডলাইট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

শ্রমিক সংগঠনগুলো চালকদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি পেশাগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। ন্যায্য মজুরি, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত হলে চালকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ কমবে। সড়ক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।

পথচারী ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা-
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পথচারীদেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভারব্রিজ কিংবা নির্ধারিত পারাপারের স্থান ব্যবহার করা জরুরি। চলন্ত যানবাহনের সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া, মোবাইল ফোনে মনোযোগ রেখে হাঁটা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সড়ক নিরাপত্তার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্রাফিক আইন, সড়কচিহ্ন, নিরাপদ পারাপার, গণপরিবহনে ওঠানামা এবং মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীরা নিজেরা নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের অন্যদেরও সচেতন করতে পারে। এভাবে সড়ক নিরাপত্তাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করা সম্ভব।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা-
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্ঘটনার কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের অবস্থা, যানবাহনের ফিটনেস, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা প্রয়োজন।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদেরও সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক আচরণ, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

আনুষ্ঠানিকতা নয়, চাই কার্যকর বাস্তবায়ন-
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে-সচেতনতার বার্তা দেওয়ার পরও কেন সড়কে মানুষের নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে পড়ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, দক্ষ চালক তৈরি, ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা-এসব উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য প্রকাশ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সরকারকে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে হবে, প্রশাসনকে সমন্বয় ও তদারকি করতে হবে, পুলিশকে আইন প্রয়োগ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে এবং চালক ও পথচারীদের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অঙ্গীকার হোক-সড়ক সবার জন্য নিরাপদ করা। একটি দুর্ঘটনাও যেন অবহেলা, অনিয়ম কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে না ঘটে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রত্যেককে কাজ করতে হবে। কারণ প্রতিটি প্রাণ অমূল্য, প্রতিটি পরিবার নিরাপত্তার অধিকারী এবং নিরাপদে চলাচল করা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক প্রত্যাশা।

আসুন, দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি। সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলি এমন বাংলাদেশ, যেখানে সড়কে বেরিয়ে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।

নিরাপদ সড়ক হোক সবার অধিকার, সবার দায়িত্ব-সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: শেখ আমিনুর হোসেন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী, সাতক্ষীরা।