মান্দারবাড়িয়া: বাংলাদেশের পরবর্তী পর্যটন বিস্ময় হওয়ার অপেক্ষায়
মো. মামুন হাসান
বাংলাদেশের পর্যটনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন কিংবা কুয়াকাটার নাম। অথচ দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলে এমন একটি সমুদ্র সৈকত রয়েছে, যার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত গুরুত্ব এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা একসঙ্গে বিবেচনা করলে সেটি শুধু একটি নতুন পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উপকূলীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। সেই সৈকতের নাম মান্দারবাড়িয়া।
অদ্ভুত এক বৈপরীত্য হলো, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পাশেই প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকত আজও দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা। সুন্দরবনের পশ্চিম অংশ ঘেঁষে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই সৈকত একদিকে যেমন অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি, টেকসই পর্যটন এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের এক অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতার কারণে এই সম্পদ এখনো জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।
বিশ্বের অনেক দেশ আজ তাদের অর্থনীতির বড় অংশ গড়ে তুলেছে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের ওপর। তারা বুঝতে পেরেছে, পাহাড়, বন, নদী কিংবা সমুদ্র শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এগুলো জাতীয় সম্পদ। বাংলাদেশও যদি একই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, তাহলে মান্দারবাড়িয়া হতে পারে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের নতুন কেন্দ্র।
মান্দারবাড়িয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অনন্য ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান। এক পাশে সুন্দরবনের নিবিড় ম্যানগ্রোভ বন, অন্য পাশে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। একই ভ্রমণে একজন পর্যটক সমুদ্র, বন, নদী, বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। পৃথিবীর খুব কম পর্যটন গন্তব্যেই এমন সমন্বিত অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। এই বৈশিষ্ট্যই মান্দারবাড়িয়াকে কক্সবাজারের প্রতিযোগী নয়, বরং সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি আন্তর্জাতিক ইকো ট্যুরিজম গন্তব্যে পরিণত করতে পারে।
বর্তমান সময়ে পর্যটনের নতুন ধারা হলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ। মানুষ এখন কেবল সমুদ্র দেখতে চায় না; তারা প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায়। তারা চায় পাখির ডাক শুনতে, ম্যানগ্রোভের নৌপথে ভেসে যেতে, লাল কাঁকড়ার বিচরণ দেখতে, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে জানতে। মান্দারবাড়িয়া এই সবকিছু একসঙ্গে দিতে সক্ষম।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড়ায়। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মান্দারবাড়িয়া কেন আজও জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে যথাযথ স্থান পায়নি? উত্তরটি খুবই স্পষ্ট। আমরা এখনো পর্যটনকে ব্যয় হিসেবে দেখি, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। ফলে যেখানে পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রয়োজন ছিল, সেখানে বছরের পর বছর কেটেছে অবহেলায়। অথচ পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ মানে শুধু রাস্তা বা রিসোর্ট নির্মাণ নয়; এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে তোলা, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
এখন সময় এসেছে মান্দারবাড়িয়াকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। এটি শুধু একটি সমুদ্র সৈকত নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের প্রথম ম্যানগ্রোভ ইকো কোস্ট। এখানে পরিকল্পিতভাবে কার্বন নিরপেক্ষ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে সৌরবিদ্যুৎচালিত নৌযান, পরিবেশবান্ধব ভাসমান ইকো লজ, সীমিত ধারণক্ষমতাভিত্তিক পর্যটন, গবেষণা কেন্দ্র এবং কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম একসঙ্গে পরিচালিত হবে। এতে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, তেমনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীও পর্যটনের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হবে।
আরও একটি সাহসী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকার চাইলে মান্দারবাড়িয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ম্যানগ্রোভ রিসার্চ অ্যান্ড ইকো ট্যুরিজম ইনোভেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, পরিবেশবিদ, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে গবেষণা পরিচালনা করবে। এতে বাংলাদেশ শুধু পর্যটন নয়, জলবায়ু গবেষণার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক পরিচিতি অর্জন করতে পারবে।
বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় পর্যটন জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। উপযুক্ত পরিকল্পনা, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং কার্যকর প্রচারণার মাধ্যমে মান্দারবাড়িয়াও কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত হতে পারে। এই সম্ভাবনার কথাই বিভিন্ন বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।
মান্দারবাড়িয়ার সৌন্দর্যের অভাব নেই। অভাব রয়েছে দূরদর্শী পরিকল্পনার। ইতিহাস সাক্ষী, যে দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বুঝতে পারে, সেই দেশই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য মান্দারবাড়িয়া সেই বিরল সুযোগগুলোর একটি, যা এখনো আমাদের হাতছাড়া হয়নি। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সময় থাকতে এই সম্ভাবনাকে চিনতে পারব, নাকি আরেকটি জাতীয় সম্পদও অবহেলার ইতিহাসে হারিয়ে যাবে?
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।






