মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় সেই যুগ্মসচিব সন্তানকে মোংলা বন্দর থেকে প্রত্যাহার
রাজধানীর মিরপুরে নুরুজাহান বেগম নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনায় তার ছেলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্মসচিব) এ কে এম আনিসুর রহমানকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আনিসুর রহমানকে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। অন্যথায় বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য করা হবে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে একটি বাসা থেকে নুরুজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একা বসবাসরত ওই বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার পর অভিযোগ ওঠে, সন্তানরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও বৃদ্ধা মায়ের যথাযথ দেখাশোনা করেননি। নুরুজাহান বেগমের এক ছেলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্মসচিব) একেএম আনিসুর রহমান, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, একজন ছেলে কানাডা প্রবাসী এবং এক মেয়ে ঢাকার একটি স্কুলের শিক্ষক।
উল্লেখ্য, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী সক্ষম সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেছিলেন আনিসুর রহমান
রাজধানীর মিরপুরে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারের যুগ্মসচিব ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমান প্রথমে নুরজাহান বেগমকে নিজের মা হিসেবে স্বীকার করেননি। পরে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন।
বুধবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার।
তিনি বলেন, আনিসুর রহমান প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন নুরজাহান বেগম তার মা এবং তিনি মারা গেছেন।
সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি?
পরিবারের সদস্যরা উচ্চশিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও একজন মায়ের এমন নিঃসঙ্গ ও মর্মান্তিক মৃত্যু মানবিক দায়বোধ এবং পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, ‘অনেকেই এখন ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত উন্নতির পেছনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন যে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধের বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। মা-বাবার লালন-পালন ছাড়া কেউ আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারতেন না—এই উপলব্ধিও অনেকের মধ্যে কাজ করছে না। স্বার্থ, পদোন্নতি, ক্যারিয়ার ও করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘সমাজে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।’
হাইকোর্টে রিট
এদিকে, নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে।
রিটে ৭৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা, তা তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ সরকার জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। রিটের পক্ষে রয়েছেন ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।









