সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

মালা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
মালা

ফজলুল কবীর
আমার প্রতিটি ধাক্কায়
তোমার ওই হাতের কাঁচের চুড়ির শব্দ
শুনতে ভীষণ ভালো লাগছিল।

যেন রাস্তার ধারে পাথর ভাঙা
অর্ধনগ্ন ছেলেটির হাতুড়ির শব্দ ঠক ঠক ঠক।

এভাবে আর কতদিন চলবে
আমাদের ফ্রি ভিসা।

চলো না
ওই শান্তিশালা থেকে
দুজনা দুটি
মালা পরে আসি

 

Ads small one

লেখক, গায়ক ও সুরকার: সংস্কৃতির ত্রয়ী, সমাজের বিবেক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:২৫ অপরাহ্ণ
লেখক, গায়ক ও সুরকার: সংস্কৃতির ত্রয়ী, সমাজের বিবেক

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ যতই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করুক না কেন, তার আত্মপরিচয় নির্মিত হয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু তার আত্মাকে জীবন্ত রাখে সাহিত্য ও সংগীত। আর এই সাহিত্য ও সংগীতের প্রাণ ভোমরা হলেন লেখক, গায়ক ও সুরকার। এই তিন সৃজনশীল শক্তির সমন্বয়েই একটি গান জন্ম নেয়, একটি কবিতা সমাজকে আন্দোলিত করে, একটি সুর মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে।

 

তাঁরা কেবল শিল্পী নন; তাঁরা সময়ের দালিলিক সাক্ষী, সমাজের নৈতিক দিক নির্দেশক এবং মানবিকতার অনন্ত প্রবাহের বাহক। একজন লেখক শব্দের মাধ্যমে সমাজের প্রতিচ্ছবি আঁকেন। তাঁর কলমে ধরা পড়ে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রতিবাদ ও আকাক্সক্ষা। একজন সুরকার সেই শব্দকে সুরের আবরণে নতুন জীবন দেন। তিনি অনুভূতির এমন এক ভাষা তৈরি করেন, যা শব্দ ছাড়িয়ে সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে যায়। আর একজন গায়ক সেই সৃষ্টি কণ্ঠে ধারণ করে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এই তিনজনের সম্মিলিত সৃষ্টিই একটি গানকে কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে।

 

বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাস এই ত্রয়ীর শক্তির উজ্জ্বল উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতা যেমন মানবিকতার গভীরতা শেখায়, তেমনি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। তাঁদের পরবর্তী যুগেও অসংখ্য লেখক, সুরকার ও গায়ক মানুষের জীবন ও সমাজকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি উৎসব, পারিবারিক আনন্দ-বেদনা এমনকি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশেও গান ও সাহিত্য ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ।কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এই ত্রয়ীর ভূমিকা ও অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব সাহিত্য ও সংগীতকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে।

 

এখন একটি গান বা লেখা মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল সুযোগ। কিন্তু একই সঙ্গে এটি শিল্পের গভীরতা ও মানের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।আজকের দিনে জনপ্রিয়তা অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে ভিউ, লাইক, শেয়ার বা ট্রেন্ডের ওপর। ফলে অনেক সময় গভীর সাহিত্য গুণ সম্পন্ন লেখা বা সুর অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত থেকে যাচ্ছে, আর চটকদার ও দ্রুতগ্রাহ্য কনটেন্ট সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

 

এই প্রবণতা ধীরে ধীরে শিল্পের মানদ-কে পরিবর্তন করছে। শিল্প এখন আর শুধু সৃষ্টিশীলতার প্রতিফলন নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বাজার প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের একটি বড় সমস্যা হলো বাণিজ্যিকীকরণ। সাহিত্য ও সংগীত যখন কেবল বাজারের পণ্য হয়ে ওঠে, তখন তার মূল উদ্দেশ্যÑমানবিকতা, চিন্তার গভীরতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাÑঅনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি গান কত দ্রুত ভাইরাল হলো, একটি বই কত বিক্রি হলোÑএই হিসাবই যেন অনেক ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রকৃত শিল্পের মূল্য কখনো তাৎক্ষণিক সাফল্যে নির্ধারিত হয় না; বরং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার মধ্যেই তার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো স্বীকৃতির অসমতা। একটি গান জনপ্রিয় হলে সাধারণত গায়কের নামই বেশি আলোচিত হয়, অথচ সেই গানের পেছনে থাকা গীতিকার ও সুরকার অনেক সময় আড়ালেই থেকে যান। এটি শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং শিল্পের সামগ্রিক মর্যাদার প্রশ্নও বটে। একটি গান কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়; এটি একাধিক সৃজনশীল মস্তিষ্কের সম্মিলিত ফল। তাই গীতিকার, সুরকার ও গায়কÑতিনজনেরই সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আরেকটি নতুন বাস্তবতা হলো কপিরাইট লঙ্ঘন।

 

অনেক সময় অনুমতি ছাড়া গান, লেখা বা সুর ব্যবহার করা হয়। এতে প্রকৃত স্রষ্টারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটি সৃজনশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। যদি একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান না পান, তবে নতুন সৃষ্টির প্রতি তাঁর আগ্রহও কমে যেতে পারে। প্রযুক্তির আরেকটি দিক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। এখন গান, সুর এমনকি লেখা পর্যন্ত এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এটি একদিকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও অন্যদিকে মৌলিক সৃষ্টির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তি অবশ্যই সৃজনশীলতার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা যদি মানুষের মৌলিক সৃষ্টিকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে, তবে সাংস্কৃতিক জগতের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এই পরিস্থিতিতে লেখক, গায়ক ও সুরকারদের সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও বেড়ে যায়। তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতা, অন্যায়, বৈষম্য, ভালোবাসা, মানবিকতা ও প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ পায়। তাঁরা কেবল বিনোদন দেন না; তাঁরা মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেন। একটি ভালো গান বা লেখা মানুষের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে, সমাজে নতুন চেতনার জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

কপিরাইট আইন কার্যকর করা, নতুন প্রতিভাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, মানসম্মত শিল্পচর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রকৃত শিল্পীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে কেবল জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে গুণগত মানকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেও দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক চর্চা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, সংগীত শোনার রুচি এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল ভোক্তা হবে, স্রষ্টা নয়। সবশেষে বলা যায়, লেখক, গায়ক ও সুরকার কেবল শিল্পের মানুষ নন; তাঁরা সমাজের আত্মা। তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে একটি জাতি নিজের পরিচয় খুঁজে পায়, নিজের স্বপ্ন দেখে এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে।

 

যদি তাঁদের সৃষ্টি মানবিকতা, সত্য ও ন্যায়বোধে সমৃদ্ধ হয়, তবে সমাজও সমৃদ্ধ হবে। আর যদি শিল্প কেবল বাজারের চাপে পরিচালিত হয়, তবে তা ধীরে ধীরে তার আত্মা হারাবে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কেবল জনপ্রিয়তাকে মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে তাঁদেরই, যাঁরা সময়কে ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। তাই এই ত্রয়ীর মর্যাদা রক্ষা করা, তাঁদের সৃজনশীল স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং শিল্পকে আবারও মানবিকতার পথে ফিরিয়ে আনা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।

লেখক: সংবাদকর্মী

মতামত: অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:১৯ অপরাহ্ণ
মতামত: অবৈধ পাইপে ভাঙছে ইছামতির বাঁধ

তরিকুল ইসলাম

সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তঘেঁষা ইছামতি নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর ধরে কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিস্বার্থে নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ কেটে কিংবা ফুটো করে অবৈধভাবে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি ওঠানামার ব্যবস্থা করছে। সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় তারা যে ক্ষতি করছে, তার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে পুরো জনপদকে।

কালিগঞ্জ উপজেলার শুইলপুর থেকে দেবহাটা উপজেলার ভাতশালাসহ ইছামতি নদীর বিভিন্ন অংশে বর্তমানে এমন অসংখ্য অবৈধ পাইপের অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও বাঁধ কেটে, কোথাও আবার বাঁধের নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে নদীর পানি মাছের ঘেরে বা চিংড়ি চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে থেকে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভয়াবহ পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

একটি বেড়িবাঁধ কেবল মাটির স্তূপ নয়; এটি একটি বৈজ্ঞানিক নকশায় নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে বাঁধ নির্মাণ করে, তার প্রতিটি স্তর নির্দিষ্ট প্রকৌশলগত মান অনুসরণ করে তৈরি করা হয়। সেই বাঁধের কোনো অংশ কেটে বা ফুটো করে পাইপ বসানো মানে পুরো কাঠামোকেই দুর্বল করে দেওয়া। বর্ষাকাল কিংবা পূর্ণ জোয়ারের সময় পানির তীব্র চাপ সবচেয়ে আগে আঘাত হানে এই দুর্বল অংশগুলোতে। ফলাফল-একসময় হঠাৎ করেই বাঁধ ভেঙে যায়, আর মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

প্রতিবছর সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলে, দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানায়, মানববন্ধন করে, সংবাদ সম্মেলন করে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনা হয়-এই বাঁধ দুর্বল হওয়ার পেছনে স্থানীয়ভাবেই কতটা অবহেলা বা অবৈধ কর্মকান্ড দায়ী ছিল।

বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই যেসব বাঁধ পরে ভেঙে যায়, সেগুলোর গায়ে আগেই অসংখ্য অবৈধ পাইপ বসানো হয়েছিল। ব্যক্তিগত ঘেরে পানি ওঠানোর সুবিধার জন্য বাঁধের স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়। পরে যখন দুর্যোগ আসে, তখন ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো সমাজ এবং রাষ্ট্র।

এর আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব পড়ে কৃষিতে। লবণাক্ত নদীর পানি যখন বাঁধ ভেঙে ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ে, তখন শুধু একটি মৌসুম নয়, বহু বছর ধরে সেই জমির উৎপাদনক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ধান, পাট, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য ফসল চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কৃষক হারান তাঁর পুঁজি, শ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

শুধু কৃষিই নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। অপরিকল্পিতভাবে পাইপ বসানোর ফলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এতে নদীর তীর ক্ষয়, পলি জমার ধরন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ নদী ধীরে ধীরে পরিবেশগত ভারসাম্য হারাতে শুরু করে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব কর্মকান্ড কোনোভাবেই বৈধ নয়। সরকারি বেড়িবাঁধ কাটা, ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা অনুমতি ছাড়া নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য বাঁধে পাইপ বসানো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ। তারপরও প্রকাশ্যে দিনের পর দিন এই কাজ চললেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি বা আইন প্রয়োগ চোখে পড়ে না। কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া, কোথাও প্রশাসনিক উদাসীনতা-সব মিলিয়ে অবৈধ কর্মকান্ড যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নতুন করে বাঁধ কেটে পাইপ বসানো হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে অবৈধ পাইপ অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মাছ বা চিংড়ির ঘেরে পানি নেওয়ার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য নদীর বাঁধ ধ্বংস করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রকৌশলগতভাবে অনুমোদিত স্লুইসগেট, নিয়ন্ত্রিত খাল অথবা পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। নদী রক্ষা করেও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালানো যায়-প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজ একজন ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য বাঁধ কাটছেন, কিন্তু আগামীকাল সেই বাঁধ ভেঙে তাঁর নিজের ঘরবাড়ি, জমি কিংবা ব্যবসাও পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। তাই এটি শুধু প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন।

ইছামতি নদী আমাদের ঐতিহ্য, সীমান্তের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নদী ও এর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষা করা মানে হাজারো মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জনস্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

আজ যদি আমরা অবৈধভাবে বাঁধ কাটাকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ ভেবে এড়িয়ে যাই, তাহলে আগামী দিনের ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ের দায় আমাদের সবাইকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই সময়-অবৈধ পাইপ অপসারণ, বাঁধ কাটা বন্ধ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের। কারণ, বেড়িবাঁধ ভাঙে একদিনে; কিন্তু তার ক্ষত শুকাতে লেগে যায় বহু বছর।

লেখক: তরিকুল ইসলাম, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী, মোবাইল: ০১৭১৫২৬১৮২৭
ইমেইল: tarikulbdnews@gmail.com

বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরপ্রস্থান/ এম.এম হায়দার আলী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:০৯ অপরাহ্ণ
বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরপ্রস্থান/ এম.এম হায়দার আলী

এম.এম হায়দার আলী

বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও মননশীল চিন্তার আকাশ থেকে আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর প্রস্থান শুধু একটি মানুষের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুতে জাতি হারাল একজন চিন্তাশীল শিক্ষক, একজন নির্ভীক গবেষক এবং বাংলা ভাষার এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। গত রোববার রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ফজলুল হক জ্ঞানের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সদ্য প্রয়াত এই মনীষীর জীবনি ঘেঁটে যতটুকু জানা সম্ভব হল, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে কেবল পাঠদানই করাননি, তাঁদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাহিত্যবোধের দীপ্তি। বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর লেখনী ছিল সময় সচেতন, বিশ্লেষণধর্মী এবং সমাজমনস্ক।

 

মুক্তিসংগ্রাম, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য, মানুষ ও তার পরিবেশ, সাহিত্যজিজ্ঞাসা, সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার, ‘জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল, আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’,এসব গ্রন্থ আজও গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকের কাছে মূল্যবান সম্পদ।

 

দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের রাজনৈতিক আদর্শের বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বচিন্তার দুয়ারও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। সম্পাদক হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ, ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং স্বদেশচিন্তা সহ একাধিক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সুন্দরম ও লোকায়ত’ সাময়িকীর মাধ্যমে তিনি নতুন চিন্তা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন।

তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পুরস্কার নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মুক্তবুদ্ধির মানুষ, যিনি সত্য, যুক্তি এবং মানব কল্যাণের পক্ষে আজীবন কলম ধরেছিলেন। একজন প্রকৃত মনীষীর মৃত্যু কখনো তাঁর চিন্তার মৃত্যু নয়। মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দর্শন এবং তাঁর আলোকিত চিন্তা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রচনা, গবেষণা ও চিন্তার আলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে,এটাই আমাদের বিশ্বাস।

 

আজ তাঁর শূন্যতায় বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গভীরভাবে শোকাহত। মহান আল্লাহ যেন এই প্রাজ্ঞ মনীষীকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী ও অসংখ্য গুণগ্রাহীকে এই শোক বহনের শক্তি দান করেন।বিদায় প্রাজ্ঞ মনীষী। আপনার কলম থেমে গেছে, কিন্তু আপনার চিন্তার আলো বাংলার আকাশে দীর্ঘদিন জ্বলে থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।