শোক ও শ্রদ্ধায় শহিদ স. ম. আলাউদ্দীনকে স্মরণ
ঘাতকের বুলেটে স্তব্ধ স্বপ্নের ৩১ বছর
নিজস্ব প্রতিনিধি: সময়টা ছিল ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন। গভীর মগ্নতায় নিজের প্রিয় সংবাদপত্র দপ্তরে কাজ করছিলেন এক অকুতোভয় শব্দসৈনিক। ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেট এসে স্তব্ধ করে দিয়েছিল তাঁর কণ্ঠ। তিনি সাতক্ষীরার সীমান্ত জনপদের আলো, দৈনিক পত্রদূতের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য স. ম. আলাউদ্দীন। শুক্রবার (১৯জুন) তিন দশক পেরিয়ে সাতক্ষীরার আকাশে-বাতাসে যেন নতুন করে অনুরণিত হলো সেই চেনা হাহাকার। গভীর শোক, অপরিসীম শ্রদ্ধা, বেদনা আর গৌরবের অম্লান স্মৃতি বুকে নিয়ে পালিত হলো এই জননেতার ৩১তম শাহাদতবার্ষিকী।
শুক্রবার সকালে এক বুক বিষাদ আর গভীর ভালোবাসা নিয়ে শহিদ স. ম. আলাউদ্দীনের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তাঁর স্বজনেরা। পরম শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত এই বীরের স্মৃতির প্রতি নিবেদন করা হয় হৃদয়ের অর্ঘ্য। পুষ্পস্তবক অর্পণে উপস্থিত ছিলেন শহীদের স্বজন স. ম আক্তার-উল-আলম ও মোহাম্মদ ইখতিয়ার হোসেন।
বিকেলে দৈনিক পত্রদূত কার্যালয়ে নেমে আসে এক আবেগঘন পরিবেশ। সেখানে আয়োজন করা হয় স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের। চার দেয়ালে তখন কেবলই প্রিয় নেতার স্মৃতি আর তাঁকে হারানোর দীর্ঘশ্বাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক গাজী শাহজাহান সিরাজ। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে স্মৃতির মণিকোঠা উন্মোচন করেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।
পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক এস এম শহীদুল ইসলামের সঞ্চালনায় একে একে উঠে আসে একটি গোটা জনপদের থমকে যাওয়ার ইতিহাস। শোকাতুর হৃদয়ে স্মৃতিচারণ করেন দ্য এডিটরস্-এর নির্বাহী সম্পাদক শেখ তানজির আহমেদ, দৈনিক পত্রদূতের সহকারী সম্পাদক সাখাওয়াত উল্যাহ, চিফ রিপোর্টার আব্দুস সামাদ, সিনিয়র রিপোর্টার আইনজীবী খায়রুল বদিউজ্জামান, অনলাইন ইনচার্জ আসাদুজ্জামান সরদার এবং বার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম-এর মৃত্যুঞ্জয় রায়।
অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধার অবদানের কথা স্মরণ করে আরও বক্তব্য দেন দ্য এডিটরস্-এর সিনিয়র রিপোর্টার মো. রিজাউল করিম, দৈনিক পত্রদূতের নিজস্ব প্রতিনিধি ও মানবজমিনের জেলা প্রতিনিধি আইনজীবী এস এম বিপ্লব হোসেন, ঢাকা টাইমস-এর জেলা প্রতিনিধি মো. হোসেন আলী, টাইগার নিউজের জেলা প্রতিনিধি মিলন বিশ্বাস এবং পত্রদূতের নিজস্ব প্রতিনিধি শেখ আব্দুল আলিম, সেলিম হোসেন, সিরাজুল ইসলাম ও পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শেখ বেলাল হোসেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, স. ম. আলাউদ্দীন ছিলেন দক্ষিণবঙ্গের এক অকুতোভয় আলোকবর্তিকা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের কনিষ্ঠতম সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হলেও তাঁর যুদ্ধ শেষ হয়নি; সেই যুদ্ধ ছিল প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির। ভোমরা স্থলবন্দর, সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স, ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সাতক্ষীরা নারকেলতলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের মতো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার আধুনিক রূপকার।
বক্তারা গভীর ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করে বলেন, যে মানুষটি একটি অঞ্চলের স্বপ্ন বুনেছিলেন, তাঁকে নিজ কার্যালয়েই নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। দীর্ঘ ৩১টি বছর পার হয়ে গেলেও কেবল প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় এই মহান নেতার হত্যাকা-ের বিচার সম্পন্ন হয়নি, যা সাতক্ষীরাবাসীর জন্য এক চরম অপমানের ও বেদনার। ঘাতকেরা সেদিন কেবল একজন মানুষকে হত্যা করেনি, বরং স. ম. আলাউদ্দীনকে কেড়ে নিয়ে সাতক্ষীরার সামগ্রিক উন্নয়নকে শত বছর পিছিয়ে দিয়েছে। আলোচনা শেষে এক আবেগঘন পরিবেশে শহিদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশের কল্যাণে তাঁর আদর্শ ধরে রাখার আকুতি জানিয়ে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।












