ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানির বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সামগ্রিকভাবে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে এই পতনের চেয়েও বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ইইউতে কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অর্থাৎ ইইউর বাজারে চাহিদা কমার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়লেও বাংলাদেশ শুধু বাজার সংকোচনের কারণে কমেনি; বরং সামগ্রিক বাজারের তুলনায় আরও বেশি হারে বাজার হারিয়েছে।
ইইউর আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৪ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৫১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি কমেছে প্রায় ২ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন ইউরো।
শুধু মূল্য নয়, আমদানির পরিমাণও কমেছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে ইইউ ২ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন কেজি পোশাক আমদানি করেছিল। এ বছর তা কমে হয়েছে ২ হাজার ৬০১ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন কেজি—পতন ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সুগন্ধি চাল নিয়ে কী ঘটেছিল? দাম চড়তেই অর্ধেক হলো রফতানি কোটা
অর্থাৎ ইইউর পোশাক বাজারে ক্রেতারা এ বছর আগের তুলনায় কম পোশাক কিনছেন। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্যও কমেছে। সব উৎস মিলিয়ে গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৯ দশমিক ৮৪ ইউরো হয়েছে।
বাংলাদেশের পতন বাজারের চেয়েও বেশি
এই সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেই বাংলাদেশের চিত্র আরও চ্যালেঞ্জিং। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি মূল্য কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
অর্থাৎ পরিমাণের তুলনায় মূল্যের পতন অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশের পোশাকের গড় রফতানি মূল্য কমে যাওয়া।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তুলনায় এটি ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন গড় মূল্য।
ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—রফতানির পরিমাণ কমছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের দামও কমছে। এর ফলে মোট রফতানি আয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
অপরদিকে, ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের কয়েকজন ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে।
চীনের পোশাক আমদানি মূল্য ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ যখন ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য ৫ শতাংশের বেশি কমেছে, তখন এই দুই দেশ বাজারে তাদের সরবরাহ বাড়াতে পেরেছে।
এখানে ভিয়েতনামের গড় ইউনিট মূল্যও বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার গড় মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ এসব দেশের ক্ষেত্রে বাজারের অংশ ধরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি এর বিপরীত। বাংলাদেশ কম দামে পোশাক সরবরাহ করেও বাজারের অংশ ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তবে জুন-জুলাইয়ে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
সামগ্রিক জানুয়ারি-জুলাই হিসাব এখনো বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক। কিন্তু মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
চলতি বছরের জুন ও জুলাই—টানা দুই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে।
জুনে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ২০২৫ সালের ১ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১ হাজার ৩৬৭ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে রফতানি ছিল ১ হাজার ৬৬৭ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ইউরো। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৯ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ইউরো—প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।
জুন থেকে জুলাইয়ের ব্যবধানও উল্লেখযোগ্য। এক মাসে বাংলাদেশের রফতানি মূল্য বেড়েছে ৩৬২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, যা ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশের মাসিক বৃদ্ধি।
এই দুই মাসের প্রবৃদ্ধির কারণে জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রফতানির যে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন ছিল, জানুয়ারি-জুলাই শেষে তা কমে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ ক্রমপুঞ্জীভূত পতন ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
এখনই পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না
তবে এই পরিবর্তনকে এখনই বাজার পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সাত মাসের হিসাবে বাংলাদেশের রফতানি এখনো দ্বিগুণ অঙ্কে কম। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে।
বরং জুন ও জুলাইয়ের তথ্যকে আপাতত পতনের গতি কমে আসার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী দুই মাসে তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আগামী মাসগুলোতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে কি না। যদি জুন-জুলাইয়ের মতো প্রবৃদ্ধি পরবর্তী মাসগুলোতেও ধরে রাখা যায়, তাহলে বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া বড় ঘাটতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আবার প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হলে সাত মাসের এই সাময়িক উন্নতির প্রভাবও দ্রুত ম্লান হয়ে যেতে পারে।
কম দাম কি বাংলাদেশের জন্য সুবিধা, নাকি চাপ?
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পোশাকের ইউনিট মূল্য। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো, যা তুলনামূলকভাবে সর্বনিম্ন। অথচ এই কম দাম বাংলাদেশের বাজার অংশ ধরে রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।
এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় বাস্তবতা সামনে আসে—শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহ করে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সময়ে প্রতিযোগী কিছু দেশ তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেও বাজার বাড়াতে পারছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সাম্প্রতিক মাসগুলোর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, জানুয়ারি-জুলাইয়ের সামগ্রিক চিত্র এখন নেতিবাচক হলেও জুন ও জুলাইয়ে টানা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে জানুয়ারি-জুনের ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন সাত মাসে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার বলা ঠিক হবে না; বরং পতনের গতি কমে আসার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়।
ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। তাই এই বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়া, প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ার প্রবণতা—তিনটি বিষয়ই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে
জুন-জুলাইয়ের ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখা গেলে পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বেশি মূল্য সংযোজনের পোশাক, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, সরবরাহ সক্ষমতা এবং ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কারণ সাত মাসের তথ্য আপাতত একটি দ্বিমুখী বার্তা দিচ্ছে—ইইউর বাজার সংকুচিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংকোচনের মধ্যে সব সরবরাহকারী সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বাংলাদেশ যেখানে কম দামে পোশাক বিক্রি করেও বাজার হারিয়েছে, সেখানে চীন ও ভিয়েতনাম বাজার বাড়িয়েছে। আবার জুন ও জুলাইয়ের টানা প্রবৃদ্ধি বলছে, বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি একমুখী নেতিবাচকও নয়।