সবুজের বুকে রোমাঞ্চ: আমার চোখে প্রথমবার সুন্দরবন ভ্রমন
মাসুদ রানা
পেশাগত ব্যস্ততা, ব্যবসার হিসাব-নিকাশ আর মাস্টার্সের পড়াশোনার চেনা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে জীবনকে একটু অন্য রঙে রাঙাতে কার না মন চায়! সেই চাওয়া থেকেই এবার জীবনের প্রথমবার পা বাড়ালাম বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন-সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে। তবে এবার শুধু একজন পর্যটক হিসেবে নয়, কাঁধে ছিল এক বিশাল দায়িত্ব। ১৫ জনের একটি চঞ্চল ও উৎসবমুখর টিমের ‘টিম লিডার’ বা দলনেতা হিসেবে পুরো ট্যুরটি পরিচালনার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর।
যাত্রার আগের প্রস্তুতি:একটি সফল ভ্রমণের মূল ভিত্তি হলো সঠিক পরিকল্পনা। ভ্রমণের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমরা পুরো টিম একসাথে বসে ইউটিউবে সুন্দরবনের বিভিন্ন ভিডিও দেখে তথ্য সংগ্রহ শুরু করি। ট্রলার ভাড়া, ফরেস্ট অফিসের পাসের খরচ-সবকিছু হিসাব কষে মাথাপিছু চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো।
ভ্রমণের আগের দিনই দুপুরের রান্নার সব বাজার সম্পন্ন করা হলো। যেহেতু দুপুরের কড়া রোদে ডি-হাইড্রেশনের ভয় থাকে, তাই ফার্স্ট এইড হিসেবে আমরা সাথে নিলাম খাবার স্যালাইন ও প্যারাসিটামল। আর সকালের হালকা নাস্তার জন্য কেনা হলো কলা, পাউরুটি, বিস্কুট এবং রসালো তরমুজ। রান্নার জন্য আমাদের সাথে একজন দক্ষ বাবুর্চিও যুক্ত হলেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভ্রমণের আগেই আমরা ট্যুরিস্ট পুলিশের অফিসার ইনচার্জকে আমাদের ভ্রমণের বিবরণ জানিয়ে রেখেছিলাম। তিনি সদয় হয়ে আমাদের নিরাপত্তার জন্য দুজন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত করলেন।
ভোরের আলোয় যাত্রা শুরু: ২৮ এপ্রিল, নির্ধারিত দিনে সকাল ঠিক ৬টায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের মাছখোলা বাজার থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। ভ্রমণের আনন্দ দ্বিগুণ করতে আমরা বেছে নিয়েছিলাম একটি ছাদখোলা মিনি পিকআপ। আমাদের গাড়ি যখন ধীরলয়ে শ্যামনগর বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসের দিকে এগিয়ে চলছিল, তখন চারপাশের ঠান্ডা হাওয়া আর ছোট সাউন্ড বক্সে বাজা দেশাত্মবোধক গানগুলো আমাদের মাঝে এক অন্যরকম আবেগের সৃষ্টি করছিল। এরই মাঝে চলল দলবেঁধে সেলফি তোলার ধুম।
প্রায় দুই ঘণ্টার দীর্ঘ জার্নি শেষে সকাল ৮টায় আমরা পৌঁছালাম বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসে। সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে দেখা করে আমাদের কাঙ্খিত ‘কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম’ এবং ‘দোবেকি ইকো ট্যুরিজম’ কেন্দ্র ভ্রমণের ট্রলার পাস সংগ্রহ করলাম।
নীলডুমুর ঘাট থেকে গহীন বনে: সকাল ১০টায় নীলডুমুর ট্রলার ঘাট থেকে দুজন পুলিশ সদস্য এবং ফরেস্ট অফিসের একজন প্রতিনিধিকে সাথে নিয়ে আমাদের ট্রলারটি সুন্দরবনের বুক চিরে ছুটে চলল। নদী কেটে ট্রলার এগিয়ে যাওয়ার ২০ মিনিট পর আমরা সবাই মিলে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। এই রোদে সকালের নাস্তায় ঠান্ডা তরমুজের স্বাদ যেন অমৃতের মতো লাগল!
ফরেস্ট অফিসের সদস্য আমাদের হুট করেই সতর্ক করলেন, “আপনারা সবাই একদম চুপ হয়ে যান। বন্যপ্রাণীরা মানুষের শব্দ পেলে দূরে চলে যায়। যত নীরব থাকবেন, বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ তত বাড়বে। “তার কথা শুনে আমরা সবাই নিশ্চুপ মেরে গেলাম। চোখ জোড়া চাতক পাখির মতো বনের দিকে চেয়ে রইল-এই বুঝি ‘বাঘ মামা’র দেখা মিলল! কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, যাওয়ার পথে একটা বক ছাড়া আর কোনো প্রাণীর দেখা পেলাম না।
আমাদের ট্রলার যখন বিশাল মালঞ্চ নদীর মোহনায় গিয়ে পৌঁছাল, তখন চারপাশের উত্তাল রূপ দেখে আমরা কিছুটা আতঙ্কিত ও রোমাঞ্চিত হলাম। মালঞ্চের বুক চিরে ওঠা বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছিল আমাদের ট্রলারে। ফরেস্ট অফিসের সদস্য জানালেন এখানে হরিণ দেখার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু এবারও আমরা হতাশ হলাম।
দোবেকি, বাঘের পায়ের ছাপ আর গোল ফলের গল্প: কোস্ট গার্ডের একটি স্টেশন পার হয়ে আমাদের ট্রলার অবশেষে দোবেকি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের জেটিতে ভিড়ল। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে সেখানে নামলাম। প্রবেশ করতেই বামে চোখে পড়ল সুন্দরবনে অবৈধভাবে মাছ ধরার অপরাধে বন বিভাগের জব্দ করা বেশ কিছু ছোট ছোট নৌকা। আরেকটু এগোতেই দেখা মিলল প্রায় এক একর আয়তনের এক বিশাল মিঠা পানির পুকুর। পুকুরের চারপাশ আরসিসি রাস্তা দিয়ে বাঁধানো, আর পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে দুটি চমৎকার গোল ঘর। এখানে দুটি ওয়াচ টাওয়ার আছে-একটি পুরনো আর অন্যটি নবনির্মিত। আমরা পুরো টিম একসাথে নতুন ওয়াচ টাওয়ারে উঠলাম। উপর থেকে চারপাশের সুন্দরবনের যে রূপ চোখে পড়ল, তা এককথায় অনবদ্য, চিরসবুজ!
টাওয়ার থেকে নেমে মনের ভেতরের রোমাঞ্চ চেপে রাখতে না পেরে আমরা গহীন অরণ্যের কাদাভরা রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। চারপাশে সুনসান নীরবতা। হঠাৎ খেয়াল করলাম, মাটিতে হরিণের একদম টাটকা পায়ের ছাপ! ফরেস্ট প্রতিনিধি জানালেন, এই এলাকায় বাঘের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। মনের মধ্যে তখন এক অদ্ভুত ভয় আর উত্তেজনা-এই বুঝি বাঘ মামা সামনে চলে এলো! বাঘের দেখা না পেলেও বনের ভেতর থেকে আমরা একটি ‘গোল ফল’ সংগ্রহ করলাম, যা আমাদের জন্য ছিল এক দারুণ স্মৃতি।
বনের ভেতর ছবি তোলা আর ভিডিও ডকুমেন্টারি শেষ করে আমরা সেই মিঠা পানির পুকুরে গোসল করতে নামলাম। দুপুরের তপ্ত রোদে সেই পুকুরের জল যেন আমাদের শরীরে স্বর্গীয় প্রশান্তি এনে দিল। পরে জানতে পারলাম, এই পুকুরটি এলাকার একমাত্র মিঠা পানির উৎস হওয়ায় গভীর রাতে বাঘ মামারাও নাকি এখানে পানি খেতে আসে! গোসল শেষে ট্রলারে ফিরে আমরা বাবুর্চির রান্না করা ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খিচুড়ি দিয়ে দুপুরের খাবার তৃপ্তি সহকারে খেলাম।
কলাগাছিয়া,বানরের আক্রমণ আর মদনটাক: আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র। জেটিতে ট্রলার ভিড়তেই আমরা নেমে পড়লাম। কলাগাছিয়ায় পা রাখতেই স্বাগত জানাল একঝাঁক বানর। এখানে একটা নিয়ম আছে-হাতে বা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ঢুকলে বানরের দল দলবেঁধে আক্রমণ করে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। আমার সাথেও ঠিক তাই ঘটল! বানরের সেই চটজলদি হামলা থেকে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলাম।
কলাগাছিয়ার প্রবেশপথের ডানপাশে রয়েছে বিশ্রামের গোল ঘর আর বামপাশে ঘেরাও করা অবস্থায় কিছু হরিণ। তবে এখানকার সবচেয়ে বড় চমক ছিল একটি বিরল প্রজাতির ‘মদনটাক’ পাখি। পাখিটির খুব কাছে গিয়ে বেশ কয়েকটি দারুণ ছবি তোলার সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। এখানেও চারপাশ ঘুরে দেখার জন্য আরসিসি ঢালাই রাস্তা এবং বনের সৌন্দর্য দেখার জন্য সুন্দর একটি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। শুনলাম এখানে খাঁচায় একটি কুমিরও আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের টিমের কেউ সেটির দেখা পেল না। এখানেও মনের মতো কিছু ছবি ও ভিডিও ধারণ করে আমরা ফেরার পথ ধরলাম।
ঘরে ফেরা: নদীপথে যাওয়া-আসা মিলিয়ে ট্রলারে আমাদের প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় কেটেছিল। অবশেষে আমাদের ট্রলার পুনরায় নীলডুমুর ঘাটে এসে পৌঁছাল। ততক্ষণে বিকেলের আলো ফুরিয়ে এসেছে। সেখান থেকে আমরা আবার আমাদের গাড়িতে উঠে মাছখোলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।










