সমন্বিত চাষে বিদ্যুতের ‘শিল্প’ হার, সংকটে উপকূলের কৃষক
নিজস্ব প্রতিনিধি: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একমুখী কৃষি ছেড়ে ধান, মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষে ঝুঁকেছিলেন সাতক্ষীরার হাজারো কৃষক। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগের শ্রেণি পরিবর্তন ও সেচ ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই অভিযোজন ব্যবস্থাই এখন নতুন সংকটের মুখে পড়েছে। সমন্বিত চাষে ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে কৃষি সেচের আওতায় এনে নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
একসময় সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের জমিতে বছরের একাধিক মৌসুমে ধান ও বিভিন্ন ফসল ফলাতেন কৃষকেরা। তবে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় সেই কৃষিব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সেখানে বছরে একটি ধানের ফসল তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শুধু ধান থেকে পাওয়া আয় দিয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বাস্তবতায় একই জমিতে ধানের পাশাপাশি মাছ ও সবজি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকেছেন কৃষকেরা। জমির পানিতে মাছ, জমিতে ধান আর উঁচু আইল বা ঘেরের পাড়ে মাচা তৈরি করে লাউ, করলা, শসাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন তাঁরা। এটি সমন্বিত চাষাবাদ নামে পরিচিত। এ ধরনের চাষে একটি খাতে ক্ষতি হলেও অন্য খাত থেকে আয় দিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে সাতক্ষীরায় সমন্বিত চাষের হার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এটি একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা মৎস্য দপ্তর প্রশিক্ষণ, বীজ ও কারিগরি পরামর্শ দিয়ে এ ধরনের চাষে উৎসাহ জোগাচ্ছে। তবে এই অভিযোজন ব্যবস্থাই এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জটিলতায় থমকে গেছে।
সরকারের সেচ নীতিমালা অনুযায়ী, ধান ও মৌসুমি সবজি চাষের জন্য কৃষি সেচে বিশেষ বিদ্যুৎ হার ও ভর্তুকির সুবিধা রয়েছে। তবে একই জমিতে ধান, মাছ ও সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের শ্রেণি কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের সংযোগকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে কৃষি সেচের জন্য প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৮০ পয়সার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৪৯ পয়সায়। একই সঙ্গে বন্ধ হয়েছে ২০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিও।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নিলেখালীর কৃষক নারায়ণ সরকার বলেন, ‘আগে যেই বিল দিতাম এখন তার অনেক গুণ বেশি দিতে হচ্ছে। আমরা তো আগের মতোই চাষ করছি, আগের মতোই মাছ বাঁচাতে মেশিন চালাচ্ছি। কিন্তু বিল এমনভাবে আসছে, যেন আমরা কোনো ভারী শিল্পকারখানা চালাই। এভাবে চললে সমন্বিত চাষ বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না।’
সমন্বিত চাষে মাছের জন্য পানিতে অক্সিজেন নিশ্চিত করতে অনেক কৃষক এয়ারেশন মেশিন ব্যবহার করেন। তীব্র গরম বা জলাবদ্ধতার সময় এটি জরুরি হয়ে পড়ে। মৎস্য দপ্তরের মতে, এটি মাছ বাঁচিয়ে রাখার কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি, কোনো কারখানা পরিচালনার কাজ নয়।
একই গ্রামের কৃষক বিভূতি সরকারের বিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জুন মাসে ১ হাজার ২০০ ইউনিট ব্যবহারে বিল এসেছিল ৬ হাজার ২৪০ টাকা। জুলাইয়ে ব্যবহার বেড়ে ১ হাজার ৭১০ ইউনিট হলে সংযোগটি ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ দেখিয়ে বিল করা হয় ২৩ হাজার ৬৮ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বিল বেড়েছে প্রায় চার গুণ। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় অনেক কৃষক রাতে এয়ারেশন চালানো কমিয়ে দিচ্ছেন, যা মাছের মারণঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদার শেখ মগফুর রহমান জানান, মাঠে সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে সংযোগ ব্যবহারের শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়। নোটিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, যা সংশোধন করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মুহা. আজিজুর রহমান সরকার উল্লেখ করেন, একই মিটার দিয়ে একাধিক কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলে সর্বোচ্চ হারের শ্রেণিটি কার্যকর করার নিয়ম রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা আবেদন করলে তা পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে।
এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা মাধব দত্ত বলেন, উপকূলীয় এলাকায় সমন্বিত চাষ ছাড়া কৃষকের টিকে থাকার পথ নেই। এটিকে শিল্প বিবেচনা করলে কৃষি অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। নোটিশ ছাড়া ভর্তুকি বন্ধ করা অন্যায়।
কৃষকদের দাবি, সংযোগের শ্রেণি পুনর্বিবেচনা, সেচ-ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং নীতিমালায় সমন্বিত চাষে বিদ্যুতের শ্রেণি স্পষ্ট করা জরুরি, যাতে জলবায়ু অভিযোজনের এই প্রয়াস ব্যাহত না হয়।






