মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সম্পাদকীয়/উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও প্রবীণদের মানবিক সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও প্রবীণদের মানবিক সংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ও নির্মম অভিঘাত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদকে কীভাবে এক গভীর সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরের সাম্প্রতিক চিত্র তা প্রমান করে। সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’-এর নোনা জলের তোড়ে হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, ধসে পড়া গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্রমাগত মাটির উর্বরতা হ্রাসের ফলে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার নদীর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা যেখানে ২০১৯ সালে ২২ থেকে ২৫ ডেসিসিমেন্স ছিল, ২০২৬ সালে তা ৫০ থেকে ৫৫ ডেসিসিমেন্সে রূপ নিয়েছে। সাগরের নোনা পানির ক্রমাগত অনুপ্রবেশ ও মাটির তলার পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ার কারণে উপকূলের বিপুল আবাদযোগ্য জমি অনাবাদী হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যগত জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তে বাধ্য হচ্ছে।

জীবিকার তাগিদে তরুণ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গ্রাম ছেড়ে জেলা শহরের বস্তি কিংবা দূরদূরান্তে পাড়ি জমাচ্ছে। এই স্থানান্তরের সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছেন প্রবীণরা ও শারীরিকভাবে অসমর্থ নারীরা। সন্তান ও স্বজনদের হারানো ভিটেমাটিতে রেখে যেতে বাধ্য হওয়ায় প্রবীণরা আজ চরম একাকীত্ব, শারীরিক অসুস্থতা ও পুষ্টিহীনতার মুখোমুখি। জীর্ণ খুপরিতে বসে প্রবীণদের বেঁচে থাকার এই লড়াই কোনো একক পরিবারের বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; বরং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কারণে স্থানান্তরিত কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু উপকূলীয় এই বাস্তবতায় কেবল তথ্য-উপাত্তের হিসেব যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন টেকসই ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় উদ্যোগ।

উপকূলের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকায় মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, প্রবীণদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু উদ্বাস্ত রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটের খেসারত দিতে গিয়ে আমাদের প্রবীণদের জীবন যেন নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় ফুরিয়ে না যায়Ñরাষ্ট্র ও সমাজকে এই বিষয়ে এখনই সর্বাধিক গুরুত্ব ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

Ads small one

নোনা জলে মানচিত্র হারাচ্ছে উপকূল: লোকসংস্কৃতির বিনাশ ও স্থায়ী সমাধানের দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ
নোনা জলে মানচিত্র হারাচ্ছে উপকূল: লোকসংস্কৃতির বিনাশ ও স্থায়ী সমাধানের দাবি

আসাদুজ্জামান সরদার: সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের জীবন থেকে স্বজন হারানোর বেদনা এবং গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী বাস্তুচ্যুতির হৃদয়বিদারক চিত্রের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই পর্ব। ভৌগোলিক নাজুকতা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে এখানকার মানচিত্র। জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের এই স্রোত এবং অরক্ষিত ভূগোলের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ উপকূলের মানুষ স্থায়ী টেকসই বাঁধ ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাস্তুসংস্থানের বিনাশ
পরিবেশকর্মী ও গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু উপকূলীয় সংকটের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “এই অঞ্চলে পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়; বিশেষ করে সিডর থেকে শুরু করে আইলা, তারপরে আম্পান, ইয়াস, বুলবুল এবং মোট ১১-১২টা দুর্যোগ গত পাঁচ-সাত বছরের ভিতরে এই উপকূলে আঘাত হেনেছে। উপকূলে অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের করার কারণে এবং অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বাঁধগুলো এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে, সামান্য আঘাতে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পুরো কৃষি জমি লবণপানিতে প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।”


তিনি আরও জানান, উপকূলী এলাকার দুর্গাবাটি, হরিণনগর, সিংহড়তলী, গাবুরা ও জেলেখালী, প্রতাপনগরের হালদার বাড়ি, পদ্মপুকুরের বন্যতলার মতো অনেক এলাকা নদী ভাঙতে ভাঙতে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে এমন পেশায় নামছে যা সে জানে নাÑযেমন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ভ্যান কেনা। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে হচ্ছে।

 

 

হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতি ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন
মানবাধিকারকর্মী ও স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট যেসব ক্ষতি বা হারানো সম্পদ সহজে অর্থে পরিমাপ করা যায় না, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি বলা হয়। এর ফলে মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বকীয় পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক মেলবন্ধন চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কিংবা সরকারি ক্ষতিপূরণ নীতিমালায় কেবল ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাট, বাঁধ বা নষ্ট হওয়া ফসলের মতো দৃশ্যমান আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়; কিন্তু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এই অপূরণীয় ক্ষতিগুলো নীতিমালার কাঠামোর বাইরেই রয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কম থাকা সত্ত্বেও আমরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না ।

 

 

তিনি আরো বলেন, প্রতাপনগর ও গাবুরার মতো এলাকাকে বাঁচাতে হলে জিও ব্যাগ নয়, সিসি ব্লকের তৈরি স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি। একই সাথে যারা জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, তাঁদের খাস জমিতে পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে মানচিত্র থেকে এই উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে।

পরিবেশ সংগঠক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতিÑপৌষ-পার্বণ, নৌকা বাইচ, কবিগান এবং বনজীবী সংস্কৃতির ‘বনবিবি পূজা’ কিংবা মনসার ভেলা ভাসানোর মতো লোকজ ঐতিহ্যগুলো আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অতীতে বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেরা সুন্দরবনে যাওয়ার আগে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচতে অসাম্প্রদায়িক ‘বনবিবির পূজা’ ও বিশেষ গান গাইত। কিন্তু মানুষ পেশা ও এলাকা পরিবর্তন করায় নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে।

দাতিনাখালী এলাকার ভক্ত মুন্ডা বলেন, “মানুষ যখন পেটের তাগিদে সংক্ষুব্ধ হয়, তখন আর গান-বাজনা বা সংস্কৃতির চর্চা থাকে না। আম্পান আর ইয়াসের পর মানুষ বেঁচে থাকার চিন্তায় এত বেশি মগ্ন যে উৎসব-পার্বণের আনন্দ উবে গেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যকার সেই সামাজিক বন্ধন বা অকৃত্রিম সহমর্মিতাও দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে।

গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী তরুণরা ও অভিবাসনের চিত্র
আইলা ও আম্পানের মতো একের পর এক আঘাত এবং তীব্র লবণাক্ততাই এই অভ্যন্তরীণ স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসনের মূল অনুঘটক। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘রিসার্চগেট’ ও ‘গ্লোবাল এনভারমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর ও কয়রা অঞ্চল থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পরিবার স্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। অন্যদিকে, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (ঝজউও) সমীক্ষা বলছে, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৬২ শতাংশ জমি ক্ষতিকর লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ায় সনাতন কৃষি সম্পূর্ণ ব্যহত হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন ও শহরমুখী অভিবাসনের পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।


স্থায়ী টেকসই বাঁধ ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের দাবি
গাবুরা ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ও নদীভাঙনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকা থেকে মানুষের ক্রমাগত শহরমুখী হওয়ার কারণে গ্রামগুলোতে প্রবীণদের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। টেকসই নদীবাঁধ, বিকল্প জীবনজীবিকা এবং পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবে জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা এই জনপদগুলো ধীরে ধীরে ‘প্রবীণদের নিঃসঙ্গ দ্বীপে’ পরিণত হচ্ছে।

গাবুরা ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ফরিদা পারভীন স্থানান্তরের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “গাবুরা থেকে মানুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রধান অনুঘটক হলো জলবায়ু পরিবর্তনÑবিশেষ করে ধারাবাহিক নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র ঘূর্ণিঝড়। পাশাপাশি এলাকায় আয়ের উৎস অত্যন্ত সীমিত। আগে যেখানে ধান চাষের মৌসুমে ২০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো, সেখানে নোনা পানির মাছ বা চিংড়ি চাষে মাত্র ১ জন শ্রমিক দিয়েই কাজ চলে যায়। ফলে বাকি ১৯ জন মানুষ পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।”

তিনি আরও যুক্ত করেন, “বিশেষ করে হতদরিদ্র পরিবারগুলো জীবিকার সন্ধানে সবচেয়ে বেশি স্থানান্তরিত হচ্ছে। সাধারণত তরুণ ছেলে-বউ ও নাতি-নাতনিরা কাজের খোঁজে শহরমুখী হয়, আর বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা গ্রামে একাকী থেকে যান। প্রবীণদের নিজস্ব আয়-রোজগার না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা তাঁদের বোঝা মনে করে রেখে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাবুরার প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ২টি পরিবারই এলাকা ছেড়ে স্থানান্তরিত হয়েছেÑযার মধ্যে নদী তীরবর্তী ও দুর্গম মধ্যবর্তী অঞ্চলের মানুষের হার সবচেয়ে বেশি।”

ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, “দূর্যোগের পর সরকার ও সংস্থার পক্ষ থেকে যেসব ত্রাণ বরাদ্দ আসে, আমরা তা প্রকৃত দুস্থদের মাঝে বণ্টন করি। কিন্তু প্রতিটি দুর্যোগের পর কেবল কিছু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

সমাধানে করণীয়
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক-ই-এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল কোনো পরিবেশগত সংকট নয়; এটি স্পষ্টতই মানবাধিকার লঙ্ঘন। জলবায়ুজনিত লবণাক্ততা ও দুর্যোগের কারণে এলাকার কর্মক্ষম মানুষ কাজ না পেয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ফলে গ্রামগুলোতে চাষাবাদের জন্য তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না; যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে, তাঁরা মূলত প্রবীণ ও বৃদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, ৬০-৭০ বছরের এই প্রবীণ মানুষ ও নারীদের ওপর পরিবারের দায়িত্বের চাপ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তাব হলোÑকৃষি খাতে তরুণদের ধরে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী, তাদের কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ বা তহবিল আদায় করা হবে; তার প্রধান অংশ এই অঞ্চলের প্রবীণ ও কৃষিবান্ধব সমাজ গঠনে ব্যয় করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান কাজ।

এ বিষয়ে মনের বন্ধু-র সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর সোনিয়া আক্তার পুষ্প বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কর্মক্ষম যুবকরা শহরমুখী হওয়ায় বাড়িতে থাকা নারী ও প্রবীণদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। স্বামী বা পরিবারের প্রধান ব্যক্তি দূরে থাকায় নারীদের একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা ও হতাশার পাশাপাশি বৃদ্ধ বাবা-মায়েরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।


এই মানসিক সংকট কাটিয়ে উঠতে তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
জীবন ও জীবিকার তাগিদে বারবার যেন দূরে চলে যেতে না হয়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নিয়মিত যোগাযোগ ও মানসিক ভরসা দিতে হবে। পরিবারের যে সদস্যটি দূরে অবস্থান করছেন, তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং মানসিকভাবে সবসময় পাশে থাকার ভরসা দিতে হবে।

দুর্যোগের ধাক্কা সামলে উঠতে কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া মানসিক সমস্যাকে কুসংস্কার বা অবহেলা না করে সঠিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি ও গাবুরার এই ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতা নিছক কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে প্রকৃত অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায় এবং জাতীয় পর্যায়ে স্থায়ী টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে প্রতাপনগরের হাওলাদার বাড়ির মতো শত শত ভিটেমাটি শুধু নোনা জলে তলিয়েই যাবে না, হারিয়ে যাবে একটি জনপদের শতবর্ষী ইতিহাস ও অস্তিত্ব। (দুই পর্বের শেষ পর্ব প্রতিবেদনটি ইন্টারনিউজের আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের ফেলোশিপের অন্তর্ভুক্ত)।

আশাশুনির বন্যতলায় ফের নদীভাঙন, ঝুঁকিতে প্রতাপনগর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ণ
আশাশুনির বন্যতলায় ফের নদীভাঙন, ঝুঁকিতে প্রতাপনগর

Oplus_131072

সাড়ে ৩০০ ফুট বাঁধে ভাঙন, রাতভর স্বেচ্ছাশ্রমে রক্ষার চেষ্টা
বিএম আলাউদ্দীন, আশাশুনি: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বন্যতলা এলাকায় ফের নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঝোড়ো হাওয়া ও নদীর উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে বেড়িবাঁধের প্রায় সাড়ে ৩০০ ফুট অংশ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মৎস্যঘের প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন করে দুর্যোগের শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ভাঙন শুরু হলে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়। খবর পেয়ে হাজারো মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে এসে বসতভিটা ও জনপদ রক্ষায় বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ডাম্পিং শুরু করেন। রাতের আঁধারেও স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চলে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে নদীর ভাটার টানে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে প্রতাপনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। অতীতে বেড়িবাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙন প্রতিরোধে ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ অংশে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কাজে ব্যবহারের জন্য হাজার হাজার জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হলেও সেগুলো সময়মতো কাজে লাগানো হয়নি বলে দাবি তাঁদের।

বন্যতলার ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, “ভাঙনের খবর পেয়েছি। খুব খারাপ অবস্থা। আমি সঙ্গে সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানিয়েছি। এ ছাড়া শ্যামনগর ইউএনওকেও জানিয়েছি। স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিংয়ের কাজ করছেন।”

এদিকে, নদীভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা না হলে প্রতাপনগর আবারও ভয়াবহ প্লাবনের মুখে পড়তে পারে।

 

রহস্যে ঘেরা সিডিগুলোতেই কি সাগর-রুনি হ*ত্যা*র ক্লু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ অপরাহ্ণ
রহস্যে ঘেরা সিডিগুলোতেই কি সাগর-রুনি হ*ত্যা*র ক্লু

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রায় ৩০০টি সিডি। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে গ্রেফতার সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিজিটাল আলামতগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে এই হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য— এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে হাইকোর্টে দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে।

আলোচিত ওই হত্যা ঘটনার পেছনের কারণ এবং দোষীদের খুঁজতে অধস্তন আদালতে শতাধিকবার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে সময় নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যার কারণে মামলাটির তদন্তে গতি আনতে বিচারপ্রার্থীদের হয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মামলাটি হাইকোর্টে শুনানিতে ওঠে।

মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য এবং বাদীপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনিরের মন্তব্যে প্রতীয়মান হয়, সিডিগুলো ঘিরে তদন্তে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও রহস্যের জট এখনো খোলেনি। প্রায় ৩০০টি সিডির মধ্যে ৯০টির মূল্যায়ন শেষ হয়েছে। বাকি ২১০টির পর্যালোচনা চলছে।

এদিন রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাড়িতে তল্লাশির সময় উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩০০টি সিডিতে অডিও, ভিডিও, কথোপকথন ও অপরাধসংক্রান্ত বিভিন্ন উপাত্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে ৯০টি সিডি মূল্যায়ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট সিডিগুলো পরীক্ষা করে তথ্য যাচাই করতে আরও সময় প্রয়োজন।

অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে থাকা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র তদন্তকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের কাছে লিখিতভাবে তথ্য-প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া গেলেই তদন্ত শেষ হয়ে যায় না। ফৌজদারি তদন্তের নিয়ম অনুযায়ী, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করে সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির শুনানিতে তদন্তের অগ্রগতি ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শুনানি শেষে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রপক্ষ তদন্তের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে আদালতের কাছে আরও একবছর সময় চেয়েছিল। তবে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার তদন্ত শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় দেওয়ার বিরোধিতা করেছে বাদীপক্ষ। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেন।

শিশির মনির আরও জানান, রাষ্ট্রপক্ষ যে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে, তার বড় অংশই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে কিছু আলামত, সিডি ও দুজন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু এসব তথ্যের যথাযথ যাচাই-বাছাই এখনো বাকি। আগামী ২৯ এপ্রিল টাস্কফোর্সের প্রধান, সিডি পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আদালতে উপস্থিত হয়ে অগ্রগতি জানাবেন।

হাইকোর্টে উপস্থাপিত তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

হাইকোর্টে টাস্কফোর্সের সচিব ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক অগ্রগতি প্রতিবেদনটি দাখিল করেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট তথ্যের স্বাধীন যাচাই-বাছাই এবং হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা নির্ধারণের কাজ এখনো বাকি।

‘বিশেষ পর্যবেক্ষণ’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর এবং রুনির টি-শার্ট থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষায় দুটি অপরিচিত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। এসব অজ্ঞাত অপরাধীকে শনাক্ত করতে ডিএনএ প্রস্তুতকারী যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল্যাব সম্ভাব্য প্রচেষ্টা চালিয়েও ছবি প্রস্তুত করতে পারেনি। কারণ হিসেবে ডিএনএর অধিক মিশ্রণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তদন্তে পাওয়া সন্দেহভাজন সব ব্যক্তি ও আসামির ডিএনএর সঙ্গে ওই অজ্ঞাত ডিএনএ মেলে কি না,তা পরীক্ষা করা হয়।

তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে বলা হয়েছে, মামলাটি তদন্তকালে আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা মোট ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। টাস্কফোর্স তদন্তকালে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে। এ ছাড়া ভিসেরা রিপোর্ট পর্যালোচনায় চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মামলার আলামত ও ২৫ জন ব্যক্তির সোয়াব সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এবং নেদারল্যান্ডসের একটি ল্যাবে পাঠানো হয়। আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে পাঠানো ব্যক্তিদের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি। ওই প্রতিবেদনে পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে মোট চারজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন ভুক্তভোগী সাগর এবং নারীটি রুনি বলে শনাক্ত হন। বাকি দুই অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় উদ্ঘাটন করা যায়নি। তাদের ডিএনএ থেকে ছবি তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছবি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে নমুনা পাঠানো হয়। কিন্তু ডিএনএতে অধিক মিশ্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ছবি প্রস্তুত করতে পারেনি। দীর্ঘ তদন্তেও ওই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং কারা এতে জড়িত, তা আজ অবধি নির্দিষ্ট করা যায়নি।

প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন— এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে। পেশাগত কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন এ দম্পতি দেশের বাইরে জার্মানিতে ছিলেন। মৃত্যুর সাত মাস আগে তারা দেশে আসেন। সাগরের কর্মস্থল মাছরাঙা টিভির সহকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে পেশাগত দিক থেকে তার কোনো শত্রুতা বা বিরোধের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট ২০১৫ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। সাগর-রুনির মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ ও কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সামিট গ্রুপের সঙ্গে তাদের হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অর্থ ও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তদন্তকালে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা ধারকর্জের তথ্যও পাওয়া যায়নি। গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারও সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ছিল না। দাম্পত্য কলহের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ভবনের নিরাপত্তারক্ষী সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ মামলার ঘটনাস্থলের ভবনের নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবিরকে র‍্যাব সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে। তিনি এখনো কারাগারে আছেন। আদালতের নির্দেশে কাশিমপুর কারাগারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তার মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায় এবং তিনি ঠিকমতো উত্তর দিতে না পারায় আদালতের অনুমতি নিয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। একইসঙ্গে একজন আইনজীবী তার চিকিৎসার জন্য আবেদন করলে আদালত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে— আসামিকে পরীক্ষা করে আগামী ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে বলা হয়েছে, এ মামলায় লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন সেট ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাগর-রুনি হত্যা মামলার মিডিয়া মুখপাত্র ও সাবেক ডিএমপি-ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং সাবেক র‍্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লিখিত ব্যক্তিদের তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

নতুন তথ্য সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এক বক্তব্যে বলেন, এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুদক অভিযান চালায়। সেখানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করে দুদক। এসব আলামতের মধ্যে বিভিন্ন জিও-লোকেশন, এসএমএস ও সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন ছিল। এ সংক্রান্ত বিষয়ে জিয়াউল আহসানের সহকারী এক সেনাসদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্তে জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা জানান। এ বক্তব্য সমর্থন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য দেন।

পরে টাস্কফোর্সের সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর ও প্রসিকিউটরের আলোচনাকালে তারা জানান, প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও তারা জানান। এ অবস্থায় গত ১৩ অক্টোবর তাদের কাছে সংরক্ষিত মামলার ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত তদন্তের জন্য হস্তান্তর করতে আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামলাটির মূল রহস্য উদঘাটন, অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত তদন্ত করে যাচাই-বাছাই এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের লক্ষ্যে তদন্তকাজ সম্পন্ন করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে শুনানি শেষে হাইকোর্ট উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সকে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন। আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল মামলার তদন্তের অগ্রগতি আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে টাস্কফোর্সের প্রধানকে তদন্তের অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানভীর হাসান জোহাকে আদালতে উপস্থিত হয়ে নতুন তথ্য ও ক্লু সম্পর্কে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় আদালত তাদের বক্তব্য ক্যামেরা ট্রায়ালের (রুদ্ধদ্বার) মাধ্যমে শুনবেন বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

এর আগে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রুনির ভাই নওশের আলী রোমান ১২ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রথমে থানা-পুলিশ, পরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে র‍্যাব তদন্তের দায়িত্ব পায়। দীর্ঘ সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র‍্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।

এরপর ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত থেকে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‍্যাব) সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুসারে টাস্কফোর্স গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কিন্তু নির্ধারিত তারিখে উচ্চ আদালতে অবকাশকালীন ছুটি থাকায় সেদিন এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২২ এপ্রিল, ২৩ অক্টোবর এবং চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও তিন দফায় ছয় মাস করে সময় দেওয়া হয়।