সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: আইলা দিবস ও উপকূলের টিকে থাকার সংগ্রাম
২০০৯ সালের ২৫ মে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনেছিল শতাব্দীর অন্যতম প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’। আজ সেই ভয়াল ২৫ মে। দেখতে দেখতে ১৭টি বছর পার হয়ে গেলেও সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের জীর্ণ বেড়িবাঁধ আর লোনা পানির গ্রাসে থাকা লাখো মানুষের ভাগ্যের কোনো টেকসই পরিবর্তন ঘটেনি। আইলার পর বুলবুল, আম্পান, ইয়াস এবং রেমালের মতো উপর্যুপরি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন উপকূলীয় জনপদের বাসিন্দারা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম বাস্তবতায় যখন উপকূলের মানুষের অস্তিত্বই সংকটে, তখন জাতীয় বাজেটে জলবায়ু খাতের হিস্যা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
পরিবেশবাদীরা উপকূলের সুরক্ষায় আসন্ন জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ বরাদ্দের যে যৌক্তিক দাবি তুলেছেন, তা নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবা উচিত। বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচক বলছে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খাদের কিনারে অবস্থান করছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যাবে এবং শতকের শেষে দেশের একটি বড় অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে ১ কোটিরও বেশি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে।
এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান কেবল সংখ্যার হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে মানুষের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, কর্মসংস্থান হারানো, সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং নারী ও শিশুদের পুষ্টিহীনতার মতো গভীর মানবিক বিপর্যয়। উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার প্রধান ঢাল হলো টেকসই বেড়িবাঁধ। অথচ সরকারি তথ্যমতেই বর্তমানে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সামান্য জোয়ারের পানিতেই বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে, লোনা পানি ঢুকে ধ্বংস হচ্ছে ফসলি জমি ও সুপেয় পানির উৎস।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, উপকূলের এই ত্রাহি অবস্থার বিপরীতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের চিত্রটি প্রতি বছরই হতাশাজনক হচ্ছে। গত এক দশকের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের মোট বাজেটের আকার প্রতি বছর বাড়লেও শতকরা হারের দিক থেকে জলবায়ু খাতের বরাদ্দ ক্রমাগত কমছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে মোট বাজেটের ৮.২১ শতাংশ জলবায়ু খাতে বরাদ্দ ছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪.৮৬ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৫.১৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তা মাত্র ৫.২১ শতাংশ।
এই বরাদ্দ যে কেবল অপর্যাপ্ত তা-ই নয়, এর একটি বড় অংশই খরচ হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রশাসনিক কাজে। ফলে উপকূলের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থায়ী সুরক্ষাকবচ তৈরির জন্য আলাদা কোনো বিশেষ তহবিল এখনো দৃশ্যমান নয়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের রক্ষাকবচ হলো বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, যা যুগে যুগে সব বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিজের বুকে পেতে নিয়ে দেশকে রক্ষা করে আসছে। সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা। সুন্দরবনের পরিবেশ ও উপকূলীয় সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়লে তা পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে।
ত্রাণ বা সাময়িক অনুদান উপকূলের মানুষের স্থায়ী মুক্তি দিতে পারে না। লোনা পানির আগ্রাসন রোধে এবং এই জনপদকে টিকিয়ে রাখতে আসন্ন জাতীয় বাজেটে একটি ‘বিশেষ উপকূলীয় তহবিল’ গঠন এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, উপকূল রক্ষা না পেলে দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। আইলা দিবসের এই দিনে উপকূলবাসীর একটাই প্রত্যাশাÑআসন্ন বাজেটে যেন তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতিফলন ঘটে।












