সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: বিদ্যুৎ সাশ্রয়
বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়। সম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ সাশ্রয় বিষয়ক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় যে তথ্যচিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল চোখ খুলে দেওয়ার মতো নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনের জন্য এক বড় বার্তা। সভায় জানানো হয়েছে, সাতক্ষীরা জেলাতেই বর্তমানে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক যদি স্রেফ সচেতন হয়ে প্রতিদিন মাত্র ১ ইউনিট করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারেন, তবে জেলাজুড়েই বছরে প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সচেতনতা যে কত বড় অর্থনৈতিক ও জাতীয় সম্পদে রূপ নিতে পারে, এই হিসাব তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। তথ্যমতে, সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় ১৩ টাকা ০৯ পয়সায় ক্রয় করে তা আবাসিক গ্রাহকদের কাছে মাত্র ৪ টাকার কাছাকাছি দরে সরবরাহ করছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটানো হয় জনগণের করের টাকায়। সুতরাং, ভর্তুকি মূল্যের এই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। বিদ্যুৎ কেবল একটি সেবা নয়, এটি দেশের অগ্রগতির জ্বালানি। আমরা যখন ঘরে বা অফিসে অপ্রয়োজনীয় একটি বাতি জ্বালিয়ে বা ফ্যান চালিয়ে রাখি, তখন শুধু নিজের পকেটের টাকাই নষ্ট করি না, বরং দেশের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করি।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য এখন বড় কোনো ত্যাগের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও সদিচ্ছার। বাজারে এখন ইনভার্টার প্রযুক্তিসম্পন্ন এসি বা ফ্রিজ পাওয়া যায়, যা সাধারণ যন্ত্রপাতির তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম। এ ছাড়া সাধারণ টাংস্টেন বাল্বের পরিবর্তে এলইডি লাইট এবং সাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহারের মাধ্যমে অনায়াসেই বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো সম্ভব। দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অফিস বা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বৈদ্যুতিক সুইচের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মতো ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এই বার্তাই দেয় যে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লড়াইটি একক কোনো উদ্যোগ নয়, এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রতিটি গৃহকোণে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ব্যবহার পরিহারের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমরা যত বেশি সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হব, ব্যক্তি হিসেবে আমরা নিজেরা যেমন আর্থিক সুবিধা পাব, তেমনি রাষ্ট্রও এক বিশাল অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হবে। সাশ্রয়কৃত এই বিদ্যুৎ দিয়ে দেশের কলকারখানা ও উৎপাদনশীল খাতকে সচল রাখা সম্ভব, যা চূড়ান্ত বিচারে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। আসুন, বিদ্যুৎ অপচয় রোধে আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করি। আমাদের একটি ছোট সচেতন পদক্ষেপই পারে দেশকে আরও অন্ধকারমুক্ত ও সমৃদ্ধিশালী করতে।






