এম শফিকুল ইসলাম
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বসে বৃক্ষ আর সবুজ অরণ্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই হয়তো লিখেছেন “দাও ফিরিয়ে সেই অরণ্য, লও এ নগর লও এ নগর”। তারপর বহু সময় পেরিয়ে গেছে উজাড় হয়েছে অরণ্য ধ্বংস হয়েছে বৃক্ষ। এ প্রেক্ষাপটে সময়ের দাবি হিসেবে বৃক্ষরোপণ ও বনসৃজনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেয়েছিল মানুষ। আর এ প্রয়োজনীয়তাকে অনুধাবন করতে পেরেই সরকার বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনের রূপ দিয়ে গ্রহণ করেছে বৃক্ষরোপন কর্মসূচি, পরিচালনা করেছে বৃক্ষরোপণ অভিযান ।
সাধারণভাবে বলা হয় প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সপ্তাহ, পক্ষ বা মাসব্যাপী) দেশকে সবুজ বৃক্ষে আচ্ছাদিত করার লক্ষ্যে বৃক্ষরোপনের যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় তাই বৃক্ষরোপণ অভিযান। আমাদের দেশে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ সপ্তাহে একটি বিশেষ বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান চলাকালে সারাদেশে পরিকল্পিত উপায়ে বৃক্ষরোপণ করা হয়। বৃক্ষরোপনের উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়।
সাধারণত প্রতিবছর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহকে (বর্ষাকাল) বৃক্ষরোপণ সত্তা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত মৌসুমী বৃষ্টিপাত হওয়ার এই সময়টাকেই বৃক্ষরোপনের উপযুক্ত সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। এ সময় সরকার নিজে উদ্যোগে বিভিন্ন নার্সারি থেকে লক্ষ লক্ষ চারা গাছ বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে জনগণের মধ্যে বিতরণ করে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও ও অভিযান পরিচালনায় কার্যক্রম গ্রহণ করে। দেশকে সবুজ বৃক্ষাচ্ছিদ করে পরিবেশ বিপর্যয় রোধকল্পে সরকার গৃহীত বৃক্ষরোপণ অভিযান একটি মহৎ প্রচেষ্টা হিসেবেই পরিগণ্য। বনজ সম্পদকে টিকিয়ে রাখা ও এর সম্প্রসারণের জন্য আমাদের দেশে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সপ্তাহ,পক্ষকাল বা মাসব্যাপী এ অভিযান চলে। এ সময় পরিকল্পিত উপায়ে বৃক্ষরোপণ করা হয়। সাধারণত প্রতিবছর বর্ষাকালে সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ অভিযান চালানো হয়। এ সময় জনগণ নিকটস্থ নার্সারি থেকে বিনামূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে গাছের চারা সংগ্রহ করতে পারে। অভিযান চলাকালে আমাদের জীবনে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা ও চারা রোপনের পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়। নিঃসন্দেহে বৃক্ষরোপণ অভিযান একটি মহৎ প্রচেষ্টা। বৃক্ষ রক্ষা মানে নিজেদের জীবনকে রক্ষা করা। বৃক্ষরোপণ অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারের পাশাপাশি জনগণ কেউ এগিয়ে আসতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বন বিভাগ বৃক্ষের চারা উৎপাদন করে বিনামূল্যে তা জনগণের মাঝে সরবরাহ করবে। গাছ লাগানোর জন্য জনমনে চেতনা সঞ্চার করতে হবে। এ ব্যাপারে রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা হল, মাইকে প্রচার, পোস্টার বিলি এবং সভা সমিতি ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের দেশে বার কোটি সক্ষম লোক আছে। আমরা প্রত্যেকে যদি কমপক্ষে একটা করে গাছ লাগাই তাহলে সহসাই আমাদের এ অভিযান সফল হবে। প্রকৃতপক্ষে বনায়নকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে না পারলে এ থেকে সর্বতোভাবে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। সমাজে বসবাসরত মানুষকে যদি বিপন্ন পরিবেশের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করা যায়, তাহলে অনেকেই বনায়নের কাজে এগিয়ে আসবে।
প্রয়োজনে বনবিভাগের কর্মকর্তা- কর্মচারীরা মোটিভেশন কার্যে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষকে বোঝাবেন এবং বনায়নে উৎসাহিত করবেন। ১৯৮২ থেকে বাংলাদেশের সামাজিক বনায়ন আন্দোলন শুরু হয়েছে। ১৯৮২ সাল থেকে রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় এ প্রকল্প ব্যাপক প্রসারতা লাভ করে। থানা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন পরিকল্পে বনায়নের কর্মসূচি তিনটি জেলা ছাড়া দেশের ৬১টি জেলার সর্বত্র চালু আছে। এ কার্যক্রমে গাছের চারা বিতরণ থেকে পরিশোধ কোন প্রদান প্রভৃতি কাজ চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায়, মসজিদ কিংবা অফিসের প্রাঙ্গনে, উপকূলীয় বাঁধের বাইরে প্রভৃতি পরিসরে বৃক্ষরোপণ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পরিবেশের অবক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার যে বিরূপ প্রভাব আমাদের বাংলাদেশে এসে পড়েছে, তা থেকে রক্ষা পেতে হলে বনায়নের বিকল্প নেই। কিন্তু বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ কার্যক্রম কেবল সরকারি পর্যায়ে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্তকরণ একান্ত ভাবে প্রয়োজন। ধর্ম, বর্ণ, মতবাদ নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে পরিবেশ সংরক্ষণের বৃক্ষরোপণ অভিযান বাস্তবমুখী হতে পারে। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসই আমাদের পরিবেশ উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও প্রতিবেশকে বাস উপযোগী রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারে।