বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

সাতক্ষীরার যুবকদের জন্য পর্যটন শিক্ষার গুরুত্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৯:৩৯ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার যুবকদের জন্য পর্যটন শিক্ষার গুরুত্ব

মো. মামুন হাসান

বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের পরিচয় দিতে গেলে যে নামটি সবার আগে অহংকার জাগায়, সেটি হলো সুন্দরবন। এই দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঝরঝর করে ঝরে পড়া বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করেছে, বুক পেতে দিয়েছে ঝড়ের মুখে। কিন্তু যুগের পরিবর্তন হয়েছে।

 

একসময় যে সুন্দরবনকে আমরা কেবল কাঠ, গোলপাতা আর মধুর উৎস ভাবতাম, আজ সেই সুন্দরবনকে ঘিরেই দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বুকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের মহাকাব্য। আর এই মহাকাব্যের আসল নায়ক কোনো বহিরাগত পুঁজিপতি নয়, বরং এই মাটিরই সন্তান সাতক্ষীরার লড়াকু যুবসমাজ। তবে এই অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গতানুগতিক বিএ, এমএ পাসের সার্টিফিকেট যথেষ্ট নয়, এখানে প্রয়োজন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন এবং সরাসরি কর্মমুখী শিক্ষা, যার নাম ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট।

আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, পর্যটন শিল্প কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ধোঁয়াবিহীন শিল্প বা স্মোকলেস ইন্ডাস্ট্রি। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো স্পষ্ট দেখাচ্ছে যে, একজন পর্যটক যখন কোনো অঞ্চলে পা রাখেন, তখন তিনি একা আসেন না, সঙ্গে করে নিয়ে আসেন বিপুল অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য।

 

তাঁর যাতায়াতের জন্য সচল হয় পরিবহন খাত, থাকার জন্য প্রয়োজন হয় হোটেল বা রিসোর্ট, খাবারের জন্য চাঙ্গা হয় স্থানীয় কৃষি ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা, আর স্মারক হিসেবে কেনাকাটার মাধ্যমে প্রাণ ফিরে পায় মৃতপ্রায় লোকজ সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প। অর্থাৎ, পর্যটন এমন এক জাদুকরি খাত যা পুরো এলাকার অর্থনীতিকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের এত বড় একটি বিশ্ব ঐতিহ্য বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট থাকা সত্ত্বেও দক্ষ জনবলের অভাবে আমরা এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে ঘরে তুলতে পারিনি। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কখনো একা পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের পেশাদারিত্ব এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা।

এখানেই সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সামনে এক নতুন আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। অনেক অভিভাবকই এখনো ভাবেন, পড়াশোনা মানেই কেবল বিসিএস বা ব্যাংকের পেছনে বছরের পর বছর বেকার বসে থাকা। এই সনাতন চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়। এই বিভাগটি কোনো সাধারণ তাত্ত্বিক শিক্ষার জায়গা নয়, এটি একটি সরাসরি বাস্তবমুখী এবং প্রয়োগিক বিদ্যার ক্ষেত্র।

 

একজন শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হওয়া মাত্রই আধুনিক হোটেল অপারেশন, ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজমেন্ট, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন, ট্রাভেল এজেন্সি অপারেশন এবং ডিজিটাল ট্যুরিজমের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিষয়ে বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ পায়। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই একজন শিক্ষার্থী নিজেকে পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে এবং দেশ-বিদেশের যেকোনো তারকা হোটেলে কর্মসংস্থানের চমৎকার সুযোগ পেয়ে যায়।

সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও গভীর ও আবেগের। প্রতিবছর এই অঞ্চলের হাজার হাজার প্রতিভাবান যুবক কেবল একটা চাকরির আশায় রাজধানী ঢাকা কিংবা প্রবাসে পাড়ি জমায়, নিজেদের চেনা পরিবেশ আর পরিবার ছেড়ে দূর পরবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে। অথচ সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যদি পরিকল্পিত ইকো ট্যুরিজম ও কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে তোলা যায়, তবে নিজ এলাকাতেই হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।

 

এই বিভাগ থেকে পাস করা একজন তরুণ কেবল অন্যের অধীনে চাকরি করবে না, সে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে। কেউ নিজের পরিবেশবান্ধব বিলাসবহুল রিসোর্ট তৈরি করবে, কেউ আন্তর্জাতিক মানের ক্রুজ শিপ বা নৌভ্রমণ পরিচালনা করবে, আবার কেউবা নিজস্ব ট্রাভেল এজেন্সি খুলে বিশ্বজুড়ে সাতক্ষীরার ট্যুরিজমকে ব্র্যান্ডিং করবে।

বর্তমান যুগটি যেহেতু সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর, তাই পর্যটনের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। এখন কেবল একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে একজন দক্ষ তরুণ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর চমৎকার তথ্যচিত্র তৈরি করতে পারে, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং অনলাইন বুকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি বিদেশি মুদ্রা দেশে নিয়ে আসতে পারে।

 

আজকের পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর পর্যটকেরা কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে সবুজ প্রকৃতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, উপকূলের মানুষের সংগ্রামী জীবন আর ম্যানগ্রোভের রহস্য দেখতে ব্যাকুল। এই বিশাল আন্তর্জাতিক বাজারের দরজা খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক পর্যটন শিক্ষার মধ্যে।

এই শিক্ষার আরেকটি অন্যতম প্রধান বৈপ্লবিক দিক হলো এটি নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য হাতিয়ার। আমাদের সমাজে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো বেশ সীমিত। কিন্তু আতিথেয়তা শিল্প, হোটেল প্রশাসন, ফুড ক্রাফট, অনলাইন ট্যুর অপারেটর কিংবা হস্তশিল্পভিত্তিক ব্যবসায় নারীরা অত্যন্ত মেধা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। ফলে এই বিভাগটি কেবল তরুণদের নয়, তরুণীদের স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে সমাজের সামগ্রিক চিত্রকে বদলে দেওয়ার এক নীরব সামাজিক বিপ্লব তৈরি করছে।

একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজে পাওয়াটাই স্বাভাবিক। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা করলে একজন শিক্ষার্থীর শুধু একটা চাকরি জোটে না, তার মধ্যে তৈরি হয় অসাধারণ নেতৃত্বগুণ, বিশ্বমানের যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষাগত পারদর্শিতা এবং উপস্থাপন ক্ষমতা। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে করতে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই বিশাল হয়ে যায় যে, তারা আর কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকে না, বরং সত্যিকারের একজন বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এই বিশেষায়িত বিভাগটি আজ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নতুন স্বপ্নের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। অভিজ্ঞ শিক্ষক ম-লী এবং আধুনিক ল্যাবরেটরির সমন্বয়ে এখানে ভবিষ্যৎ পর্যটন শিল্পের যোগ্য নেতা তৈরি করা হচ্ছে। পরিশেষে বলা যায়, যে অঞ্চলটি একসময় কেবল সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস আর অবহেলার গল্পে পত্রিকার পাতায় আসত, আজ সময় এসেছে সেই চেনা গল্পটাকে বদলে দেওয়ার।

 

সঠিক পরিকল্পনা আর এই আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সাতক্ষীরার যুবসমাজ একদিন নিজেদের ভাগ্য তো বদলাবেই, সেই সঙ্গে সুন্দরবনকে বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে এক নম্বর গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। আপনার সন্তানকে এই সম্ভাবনাময় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ করে দিন, কারণ আগামী দিনের স্মার্ট বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে আজকের এই দক্ষ ও আধুনিক তরুণ প্রজন্ম।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

৭৭ বছরে পা রাখলেন প্রবীণ সাংবাদিক শেখ আব্দুল ওয়াজেদ কচি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৫৯ অপরাহ্ণ
৭৭ বছরে পা রাখলেন প্রবীণ সাংবাদিক শেখ আব্দুল ওয়াজেদ কচি

পত্রদূত রিপোর্ট: ৭৬ পেরিয়ে ৭৭ বছরে পা রাখলেন সাতক্ষীরার প্রবীণ সাংবাদিক, দৈনিক ইনকিলাবের স্টাফ রিপোর্টার ও দ্য এডিটরস এর সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল ওয়াজেদ কচি।

বাংলা ১৩৫৮ সালের ১০ ভাদ্র তিনি নড়াইল জেলার কামালপ্রতাপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তৎকালীন ইউনিয়ন কৃষি সহকারী (ইউ.এ.এ) মরহুম শেখ মিরাজ উদ্দিন ও গৃহিনী মরহুম কায়ামন নেছা দম্পতির আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে সাংবাদিক কচি মেজ।

তিনি ১৯৭০ সালে কাশিপুর অম্বিকা চরণ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৭১ সালে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নড়াইল জেলার (৮নং সেক্টর) কালিয়ায় মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। তিনি গেরিলা ট্রেনিংপ্রাপ্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭২ সালে ঢাকায় গিয়ে সেকেন্দার হায়াত মজুমদার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ও পরবর্তীতে দৈনিক পূর্বাভাস পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন শেখ আব্দুল ওয়াজেদ কচি।

সাংবাদিক কচি দৈনিক পূর্বাভাস পত্রিকায় ‘অধম’ নামে সপ্তাহে চারদিন ‘ডোন্ট মাইন্ড’ শিরোনামে কলাম লিখতেন।

তৎকালীন দেশের চারটি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি গ্রামে ফিরে যান। পরে পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি হলে নড়াইল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক প্রান্তিক পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করার পর যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক রানার পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন।

তিনি ঢাকায় থাকাকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় মাঝে মধ্যে কলাম লিখতেন এবং খুলনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গণবার্তার ঢাকা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৭৮ সালে তিনি সাতক্ষীরায় আসেন এবং সাতক্ষীরা পৌরসভার রাজার বাগান এলাকায় জমি কিনে স্থায়ী হন ও তৎকালীন সময়ে সাতক্ষীরার একমাত্র পত্রিকা আব্দুল মোতালেব সম্পাদিত কাফেলায় (সাপ্তাহিক, পরবর্তীতে দৈনিক) যোগ দেন। কাফেলায় কর্মরত অবস্থায় তিনি যশোরের দৈনিক স্ফুলিংগ পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করেছেন। এরপর তিনি ১৯৮৬ সালের ৪ জুন দৈনিক ইনকিলাব বাজারে আসলে সাতক্ষীরা জেলা সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেন এবং অদ্যাবধি তিনি দৈনিক ইনকিলাবের স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি আব্দুল মোতালেব সম্পাদিত দৈনিক কাফেলায় টানা প্রায় ১৭ বছর কর্মরত ছিলেন। পরে কিছুদিন সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগের বার্তায় কাজ করেছেন।

বর্তমানে তিনি সাতক্ষীরা থেকে পরিচালিত মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল দ্য এডিটরস এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

তার নেতৃত্বে দ্য এডিটরস সাতক্ষীরা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ সাংবাদিক কচির এখন দিন কাটছে পত্রিকা পড়ে, এডিটরসকে পরামর্শ দিয়ে।

জন্মদিনে তার জন্য অজস্র শুভ কামনা।

সংস্কৃতি, অর্থনীতি, চিংড়ি শিল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার জেলা সাতক্ষীরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতি, অর্থনীতি, চিংড়ি শিল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার জেলা সাতক্ষীরা

শ্যামল শীল

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সাতক্ষীরা। খুলনা বিভাগের অন্তর্গত এই উপকূলীয় জেলা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন ও সীমান্ত বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বিশাল অংশ, বিস্তীর্ণ নদ-নদী, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বনাঞ্চল, দেশের অন্যতম বৃহৎ চিংড়ি উৎপাদন এলাকা এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের কারণে সাতক্ষীরা আজ দেশ-বিদেশে সুপরিচিত।

জেলার উত্তরে যশোর, পূর্বে খুলনা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও ভোমরা স্থলবন্দরকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যে সাতক্ষীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হলেও এখানকার মানুষ সংগ্রাম করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছেন।

সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পরিচয় বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন। শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী ও নীলডুমুরসহ বিভিন্ন পর্যটন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, শুশুক, বানর এবং শত শত প্রজাতির পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এই বন শুধু জীববৈচিত্র্যের ভান্ডারই নয়, বরং উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করার প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে।

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি চিংড়ি শিল্প। বাগদা ও গলদা চিংড়ি উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় জেলা হিসেবে সাতক্ষীরা “সাদা সোনার জেলা” নামে পরিচিত। জেলার হাজার হাজার কৃষক, মৎস্যচাষি ও উদ্যোক্তা এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এখানকার উৎপাদিত চিংড়ি ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কাঁকড়া, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ সম্পদের উৎপাদনও জেলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।

কৃষিতেও সাতক্ষীরা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। এখানকার হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, আম্্রপালি ও ফজলি আম দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। গ্রীষ্ম মৌসুমে সাতক্ষীরার আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। এছাড়া সুন্দরবনের খাঁটি মধু, গোলপাতা, মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদ স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, জমিদার বাড়ি, দিঘি ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ, দেবহাটার ঐতিহাসিক স্থাপনা, শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, কলারোয়ার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং ভোমরা স্থলবন্দর জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি মোজাফফর গার্ডেন, লেকভিউ, নদীবেষ্টিত প্রাকৃতিক পরিবেশ, সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।

শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়নেও সাতক্ষীরার মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত অসংখ্য কৃতী ব্যক্তি এই জেলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা একটি সমৃদ্ধ জনপদ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় এই জেলায়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও এখানকার মানুষ কৃষি, মৎস্য ও জীবিকার নতুন নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, নিরাপদ সুপেয় পানি, ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটনের সম্প্রসারণ, সীমান্ত বাণিজ্যের প্রসার এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সাতক্ষীরা প্রতিনিয়ত নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ও আধুনিক জেলায় পরিণত হবে।
প্রকৃতি, সুন্দরবন, চিংড়ি শিল্প, সুস্বাদু আম, খাঁটি মধু, নদ-নদী, উপকূলীয় সৌন্দর্য, সীমান্ত বাণিজ্য এবং সংগ্রামী মানুষের জীবনচিত্র-সবকিছু মিলিয়ে সাতক্ষীরা সত্যিই বাংলাদেশের গর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র।

লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা।

 

মোবাইলের নানান দিক: উপকারের চেয়ে ক্ষতিই কি বেশি? ধ্বংসের পথে কিশোর-যুবসমাজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৭ অপরাহ্ণ
মোবাইলের নানান দিক: উপকারের চেয়ে ক্ষতিই কি বেশি? ধ্বংসের পথে কিশোর-যুবসমাজ

লেখকের পাঠানো ছবি

মোঃ নাজির হোসেন

 

প্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। একসময় মোবাইল ছিল কেবল দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সেই মোবাইলই হয়ে উঠেছে ক্যামেরা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ব্যাংক, বাজার, পাঠশালা, অফিস ও বিনোদনের বিশাল প্ল্যাটফর্ম। একটি ছোট যন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের তথ্য মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এই প্রযুক্তির সুবিধা আমরা কতটা গ্রহণ করছি, আর এর অপব্যবহারে কতটা ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

বিশেষ করে কিশোর ও যুবসমাজের দিকে তাকালে বিষয়টি উদ্বেগজনক। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকের পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে মোবাইল নিজে সমস্যার মূল নয়; সমস্যার বড় অংশ তৈরি হয় অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যহীন ব্যবহারে।

প্রয়োজনের প্রযুক্তি যখন নেশায় পরিণত হয়:
প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচানোর কথা। অথচ মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারে অনেক কিশোর-তরুণের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বই খোলা থাকলেও চোখ আটকে থাকে স্ক্রিনে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কয়েক মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস কখন যে ঘণ্টায় পরিণত হয়, অনেকেই বুঝতে পারেন না।

একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট-এভাবেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ পিছিয়ে যায়। সময় ব্যবস্থাপনা নষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে তৈরি হয় নির্ভরশীলতার প্রবণতা।

মোবাইল গেম: বিনোদন থেকে আসক্তি:
মোবাইল গেম শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সীমিত সময় বিনোদনের জন্য গেম খেলা ক্ষতিকর না হলেও দীর্ঘ সময় গেমিংয়ের অভ্যাস উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অনেক কিশোর পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেমে ব্যস্ত থাকে। রাত জেগে গেম খেলার কারণে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। পরদিন স্কুল-কলেজে মনোযোগ কমে যায়, পড়াশোনায় অনীহা তৈরি হয় এবং দৈনন্দিন জীবনেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।

কখনো কখনো গেমের ভেতরের প্রতিযোগিতা, পুরস্কার ও অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বাস্তব জীবনের লক্ষ্যকেও আড়াল করে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: যোগাযোগ বাড়ছে, নাকি দূরত্ব?:
মোবাইলের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। বিদেশে থাকা স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা, খবর জানা, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা শিক্ষামূলক তথ্য পাওয়া—এসব নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা।

কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের বাস্তব সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বলও করতে পারে। একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ ফোনে ব্যস্ত থাকেন-এ দৃশ্য এখন অস্বাভাবিক নয়।

‘লাইক’, ‘কমেন্ট’, ‘শেয়ার’ ও অনুসারীর সংখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা অনেক তরুণের মধ্যে অন্যের জীবন ও নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অশিক্ষা ও ঝরে পড়ার পেছনে মোবাইল কতটা দায়ী?:
কিশোরদের শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার জন্য শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ, অর্থনৈতিক চাপ, বিদ্যালয় থেকে দূরত্ব এবং সামাজিক নানা কারণও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এসব সমস্যাকে আরও জটিল করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিনোদনমূলক কনটেন্ট, গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে, তাহলে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
অতএব, মোবাইলকে একমাত্র কারণ না বানিয়ে মোবাইল ব্যবহারের ধরনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অশ্লীল ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকি:
ইন্টারনেটের বিশাল জগতে ভালো কনটেন্টের পাশাপাশি ক্ষতিকর কনটেন্টও রয়েছে। বয়স-অনুপযোগী ভিডিও, সহিংসতা, অশ্লীলতা, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন ও নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য কিশোরদের সহজেই প্রভাবিত করতে পারে।

কৌতূহলী বয়সে কোনো শিশু বা কিশোর যদি নিয়মিত অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসে, তার চিন্তাভাবনা ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সমাধান নয়; তাকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানোও জরুরি।

ভুয়া তথ্যের ভয়াবহতা:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য পাওয়া সহজ, কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়। গুজব, ভুয়া সংবাদ, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

অনেক কিশোর-তরুণ যাচাই না করেই কোনো পোস্ট বিশ্বাস করে এবং অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেয়। এতে ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে।
তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা-কোন তথ্য বিশ্বাস করতে হবে, কোনটি যাচাই করতে হবে এবং কোনটি শেয়ার করা উচিত নয়, তা শেখানো।

ঘুম হারাচ্ছে প্রজন্ম:
মোবাইল ব্যবহারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাত জাগার প্রবণতা। ঘুমের সময় মোবাইল হাতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা কিংবা গেম খেলার অভ্যাস অনেক কিশোর-তরুণের মধ্যে দেখা যায়।

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিক্ষার্থী হলে পড়াশোনায়ও তার প্রভাব পড়ে।

বই থেকে স্ক্রিনে:
একসময় অবসর সময়ে কিশোরদের হাতে বই, পত্রিকা কিংবা গল্পের সংকলন দেখা যেত। মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ছিল বিনোদনের অংশ।এখন সেই জায়গার বড় একটি অংশ দখল করেছে স্ক্রিন।
বই পড়ার অভ্যাস কমে গেলে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও ভাষার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মোবাইলের পাশাপাশি বই ও বাস্তব অভিজ্ঞতার জগতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবারে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সেখান থেকেই দায়িত্ব শুরু।

অভিভাবকদের উচিত-
★ বয়স অনুযায়ী মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা;
★ পড়াশোনা ও ঘুমের সময় মোবাইল থেকে দূরে রাখা;
★শিশু কী ধরনের অ্যাপ ও কনটেন্ট ব্যবহার করছে, তা সম্পর্কে সচেতন থাকা;
★বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা;
★সন্তানকে ভয় দেখানোর বদলে প্রযুক্তির ভালো-মন্দ বোঝানো;
★নিজেরাও পরিবারের সামনে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার না করা;
★ সন্তানকে খেলাধুলা, বই পড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োজন সচেতনতা:
বিদ্যালয় ও কলেজে শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার হয়রানি, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
মোবাইল নিষিদ্ধ নয়, ব্যবহার হোক নিয়ন্ত্রিত:

মোবাইল ফোনকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও যোগাযোগে মোবাইলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজন হলো সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার।
শিশু-কিশোরদের বোঝাতে হবে—মোবাইল হলো একটি হাতিয়ার; এটি যেন জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে।

প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে শিক্ষা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের জন্য। বিনোদন থাকবে, কিন্তু সেটি যেন জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য না হয়ে যায়।

সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়:
কিশোর-যুবসমাজকে নিরাপদ রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র-সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিশুদের জন্য নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষা এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

শেষ কথা:
মোবাইল ফোন আমাদের শত্রু নয়। এটি একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও ঝুঁকির বাহন। আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, তার ওপরই নির্ভর করে এটি আমাদের উন্নতির হাতিয়ার হবে, নাকি সময় ও সম্ভাবনা নষ্ট করার কারণ হবে।

আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়—স্মার্ট চিন্তা, সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধও তুলে দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে—
“মোবাইল আমাদের জীবনকে পরিচালনা করবে না; আমরাই মোবাইলকে পরিচালনা করব।”
প্রযুক্তির ব্যবহার হোক জ্ঞানের জন্য, সৃজনশীলতার জন্য এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য। তাহলেই মোবাইল হবে আশীর্বাদ-অভিশাপ নয়।

মোঃ নাজির হোসেন, সোনাবাড়ীয়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।