সচ্চিদানন্দ দে সদয়
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কার নাম নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি, শ্রম ও অর্থনীতিতে প্রতিদিন নতুন নতুন চাপ তৈরি করছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার সঙ্গে বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই লড়াই করছে।
এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নীরব দুর্যোগÑতীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ। তাপপ্রবাহের বিপদ অন্য অনেক দুর্যোগের চেয়ে আলাদা। ঘূর্ণিঝড়ের আগে সতর্কবার্তা দেওয়া যায়, আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ সরিয়ে নেওয়া যায়, বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া যায়। কিন্তু তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে মানুষের শরীর ও কর্মক্ষমতার ওপর আঘাত হানে। ফলে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেক সময় চোখে পড়ে না, পরিসংখ্যানেও পুরোপুরি ধরা পড়ে না। অথচ অতিরিক্ত তাপ মানুষের অসুস্থতা বাড়ায়, শ্রমঘণ্টা কমায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করে এবং দরিদ্র মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এই বাস্তবতায় তাপপ্রবাহকে আর শুধু আবহাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের দেশে গরমকে অনেকটা স্বাভাবিক ঋতুগত ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু স্বাভাবিক গরম এবং তাপপ্রবাহ এক বিষয় নয়। যখন দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক মাত্রায় তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তখন মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
এখানে একটি সামাজিক বৈষম্যের বিষয়ও রয়েছে। একজন সামর্থ্যবান মানুষ হয়তো গরমের সময় ঘরে থাকতে পারেন, ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা করতে পারেন, প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিতে পারেন। কিন্তু একজন দিনমজুরের পক্ষে কাজ বন্ধ রাখা মানে দিনের আয় হারানো। একজন কৃষকের পক্ষে মাঠে না যাওয়া মানে ফসলের ক্ষতি। ফলে তাপপ্রবাহের অভিঘাত সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির আলোচনায় এই সামাজিক বাস্তবতাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে মানুষের শারীরিক শ্রমের ওপর।
কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, শিল্প, ইটভাটা, রিকশা ও ভ্যান চালানো কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতে লাখ লাখ মানুষ খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। তীব্র গরমে কাজের সময় কমে যায়, উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু তাদের অনেকেরই কাজের সময় পরিবর্তন, বিশ্রাম বা পর্যাপ্ত পানির নিশ্চয়তা নেই। তাই তাপপ্রবাহ মোকাবিলার নীতিতে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা সামনে আনতে হবে। প্রচ- গরমে কাজের সময় পুনর্বিন্যাস, কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং তাপজনিত অসুস্থতার বিষয়ে সচেতনতাÑএসবকে শ্রম নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক সরাসরি।
অতিরিক্ত তাপ ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য ফসলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সেচের প্রয়োজন বাড়ে, পানির সংকট তীব্র হয় এবং উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও পোলট্রির ওপরও তাপের প্রভাব পড়ে। ফলে তাপপ্রবাহ শুধু কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, কৃষি অর্থনীতির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষি পরিকল্পনায় তাই জলবায়ু সহনশীল জাত, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের আবহাওয়ার আগাম তথ্য এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলার উপযোগী চাষাবাদ পদ্ধতি গুরুত্ব পেতে হবে।
তাপপ্রবাহের আরেকটি বড় মাত্রা শহরাঞ্চলে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার, গাছপালা ও জলাধার কমে যাওয়া এবং যানবাহনের চাপ শহরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শহরের নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বস্তি বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছোট ঘর, কম বাতাস চলাচল এবং নিরাপদ পানির সীমিত সুযোগ তাপের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। তাই নগর পরিকল্পনায় তাপপ্রবাহকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বেশি গাছ, খোলা জায়গা, জলাধার সংরক্ষণ, ছায়াযুক্ত পথ এবং ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নকশাÑএসবকে বিলাসিতা নয়, জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে। তাপপ্রবাহের সময় শুধু মানুষকে সচেতন করলেই হবে না; স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও প্রস্তুত থাকতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত তাপজনিত অসুস্থতার রোগী ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি থাকা দরকার। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তাপজনিত অসুস্থতার লক্ষণ ও জরুরি চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কোন এলাকায় তাপের ঝুঁকি বেশি, কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে এবং কোথায় দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজনÑএসব তথ্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা জরুরি।
বাংলাদেশে দুর্যোগের আগে সচেতনতা তৈরিতে পোস্টার, মাইকিং, সভা ও প্রচারণা করা হয়। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু সচেতনতার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তা মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনে। তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। সহজ ভাষায় মানুষকে জানাতে হবেÑকখন অতিরিক্ত গরম বিপজ্জনক, কীভাবে পানি পান করতে হবে, কখন বিশ্রাম নিতে হবে এবং কখন দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। নাটক, স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আশাশুনিতে অনুষ্ঠিত সচেতনতামূলক নাট্য আয়োজনের মতো উদ্যোগ দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন সেই সক্ষমতাকে তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। শুধু ‘তাপপ্রবাহ চলছে’Ñএমন তথ্য যথেষ্ট নয়। মানুষের জন্য প্রয়োজন করণীয়ভিত্তিক বার্তা।
কোন সময়ে বাইরে না থাকা ভালো, কোন শ্রেণির মানুষ বেশি ঝুঁকিতে, কোথায় নিরাপদ পানি পাওয়া যাবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবেÑএসব তথ্যও দিতে হবে। অর্থাৎ সতর্কবার্তা হতে হবে তথ্যনির্ভর, স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক এবং করণীয়মুখী। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অভিযোজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিতÑমানুষ কতটা নিরাপদ থাকছে?
বড় প্রকল্প, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, শ্রমক্ষমতা, নিরাপদ পানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও বসবাসের পরিবেশকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরই পড়ে। তাই জলবায়ু অভিযোজনের প্রতিটি পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে। তাপপ্রবাহ হয়তো ঘূর্ণিঝড়ের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু এর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি এবং বিস্তৃত।
সবচেয়ে বড় কথা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার পর তৎপর হওয়ার পরিবর্তে আগে থেকেই জাতীয় ও স্থানীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। স্বাস্থ্য, কৃষি, শ্রম, শিক্ষা, নগর উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রাণহানি কমানোর ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা আমরা অর্জন করেছি, তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রেও সেই ধরনের আগাম প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রশ্নটি এখন শুধু কত ডিগ্রি তাপমাত্রা উঠল, তা নয়। প্রশ্ন হলোÑএই তাপমাত্রা থেকে মানুষকে কতটা নিরাপদ রাখা গেল। জলবায়ু পরিবর্তন থামানোর লড়াই বৈশ্বিক; কিন্তু তার অভিঘাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই, বাংলাদেশেই। তাপপ্রবাহকে তাই ‘গরমের দিন’ হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
লেখক: সাংবাদিক