নতুন রাষ্ট্রপতি, পুরোনো প্রত্যাশার নতুন পরীক্ষা
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০ আগস্ট ২০২৬ একটি উল্লেখযোগ্য দিন হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৩টি ভোট পড়েছে। এই নির্বাচন নিছক একটি সাংবিধানিক পদ পূরণের প্রক্রিয়া নয়, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণত একক প্রার্থীর মাধ্যমে সমঝোতার প্রবণতাই দেখা গেছে। এবার সেই ধারার বাইরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
যদিও নামে প্রতিদ্বন্দ্বীতা বলা হলেও বাস্তবে নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। কারন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্য নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চাইলে এবং সেটা তার দলের সিদ্ধান্তের বিপরীত হলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারেন। যেহেতু ভোট হচ্ছে উন্মুক্তভাবে, অর্থাৎ কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন থাকছে না। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগও নেই। বর্তমান সংসদে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ট দল হওয়ায় তাদের মনোনীয প্রার্থী নির্বাচিত হবেন এর ভিন্নতা হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রপতি পদটি নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আলোচনায় অনেক সময় ‘অলঙ্কারিক পদ’ কথাটি ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত এবং সরকারের নির্বাহী কর্তৃত্ব মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। তবে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে পদটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সাংবিধানিক মর্যাদা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মুহাম্মাদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয় এবং নতুন নির্বাচন সামনে আসে। তাঁর পদত্যাগের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। এর পরপরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। এই পরিবর্তনের সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া স্বাভাবিকভাবেই নানা আলোচনা তৈরি করেছে। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় দলটির নেতৃত্বে থাকার পাশাপাশি বিরোধী রাজনীতির নানা পর্যায়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তাঁকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিএনপি নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। আমার দৃষ্টিতে, এখানেই তাঁর নতুন দায়িত্বের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। দলীয় রাজনীতিতে একজন নেতার যে পরিচয় থাকে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই পরিচয়ের পরিধি স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের সব নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। তাই তাঁর প্রতি প্রত্যাশাটিও কোনো নির্দিষ্ট দল বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নয়, বরং রাষ্ট্রের সব নাগরিকের।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রত্যাশা করে আসছে। এসব প্রত্যাশার সবকিছুর সমাধান রাষ্ট্রপতির একক হাতে নেই-এটি বাস্তবতা। সংবিধান রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান থেকে ন্যায়, নিরপেক্ষতা ও জাতীয় ঐক্যের পক্ষে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক অধিকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণের আস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বড় সম্পদ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তি যখন সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তখন তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একইভাবে আইনের দৃষ্টিতে নাগরিকদের সমান মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশাও অস্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মতের পার্থক্য যেন প্রতিহিংসা, বৈষম্য বা নাগরিক অধিকার সংকোচনের কারণ না হয় এটি একটি সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা কম নয়। দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, বাজারব্যবস্থার অনিয়ম, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কর্মসংস্থানের সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় পর্যায়ে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতির পক্ষে তাঁর নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।






