সুন্দরবনে নৌকা ডুবে নিখোঁজ চার মৌয়াল: ‘ওগা খুঁজে কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে”
সামিউল মনির, শ্যামনগর: ‘শুনিছি ঝড় মাথায় নৌকা উল্টে গিলি ওরা নদীতে পুড়েলো। মাঝ রাত্রি এমন ঘটনার পরদিন সকালে ফরেষ্টাররা চারজনের কুড়িয়ে পেয়েছে। তবে আমাগা বাড়িওয়ালাসহ চারজনের কোন খবর এখনো পাতিনে। ওগা কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে’। শেষ ভাগে এমন প্রশ্ন রেখেই দু’হাতে শাড়ীর আঁচল ধরে অশ্রুভরা চোখ-মুখ ঢাকে নিখোঁজ আকবর মোল্যার স্ত্রী মনজিলা বেগম। শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের গোদাড়া গ্রামে স্বামী-স্বামী সন্তান নিয়ে বসবাস তার।
নিজেকে সামলে নিয়ে কয়েক মুহুর্ত নিশ্চুপ থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী এ নারী আবার বলে উঠেন, আমার বড় ছাবাল সবুর ফিরেছে। তবে তার বাপডা পানিতে ভেসে কোনদিকে গেছে সে দেকতি পায়নি। বাড়ি ফিরে বাপের খোঁজে আজ দু’দিন সে আবারও বাদায় নেমেছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মনিজলা বেগম জানান, রাত ১২টার দিকে ঝড়ের কবলে পড়ে মৌয়ালদের বহনকারী নৌকা উল্টে যায়। পরবর্তীতে সকালে চরে পড়ে থাকা অবস্থায় হরিণ মুখ-মন্ডল চাঁটতে থাকার কারনে ঘুম ভাঙে তার ছেলে আব্দুস সবুরের। তবে এসময় সবুরের পিতা আকবর মোল্যাকে না পেয়ে হাঁটতে শুরু করার একপর্যায়ে হলদেবুনিয়া টহলফাঁড়ির বনরক্ষীরা অপর তিনজনের সাথে উদ্ধার করে তাকে লোকালয়ে পৌছে দেয়।
কথাগুলো শেষ করেই আবারও কান্নায় ভাঙেন এ নারী। পাশে বসা ছোট ছেলে মশিউরের মাথা বুকে টেনে নিয়ে পুনরায় শাড়ীতে মুখ ঢাকেন তিনি।
ঘটনার আকস্মিকতায় নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া সংবাদকর্মীদের নিরবতা ভাঙে পাশে বসা তার (মনজিলা) ভাবি শাহিদা বেগমের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া উত্তরহীন প্রশ্নে। মধু কাটতে সুন্দরবনে যেয়ে নিখোঁজ আকবর মোল্যার পরিবারকে সমবেদনা জানাতে আসা এ নারীর ভাষ্য ‘দুটো ছাবাল ছাড়া তার কেউ নি। এরম ঘটনা মেনে নেয়া যায়। শুনলি আর সহ্য করা যায়, খারাপ লাগে না বলো’।
প্রায় অভিন্ন অবস্থা তাদেরই প্রতিবেশী অপর নিখোঁজ অলিউর রহমান লিটনের স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের। চার ও ১৩ বছর বয়সী দু’সন্তান নিয়ে অবিরাম কেঁদে চলা এ নারীর ভাষ্য সম্প্রতি তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয় বিয়ে করে শ্বশুর অনেক আগে থেকে অন্যত্র বসবাস করে। আকস্মিকভাবে স্বামীর এভাবে সুন্দরবনের নদীতে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তার কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। অবুঝ দু’টো সন্তান নিয়ে এখন তিনি চিন্তার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন।
সংবাদকর্মীদের কাছে হাতজোড় করে ক্রন্দনরত ঐ গৃহবধু দাবি করেন সুন্দরবনের মধ্যে অবস্থানরত কোস্টগার্ড, বিজিবিসহ বনরক্ষীরা যেন তার স্বামীর সন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রাখে- সে বিষয়টি নিশ্চিত করা। ‘দু’দিন ধরে চুলো জ্বলছে না’- উল্লেখ করে মরিয়ম খাতুন আরও জানান বড় মেয়ে ফাতেমা বার বার পিতার ফিরে আসা নিয়ে প্রশ্ন করছে। নিশ্চিত কোন উত্তর দিতে না পেরে বরং মেয়ের সামনে কান্নাকাটি করছে তাতে তার সন্তান কিছু না বুঝে মাঝেমধ্যে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।
উল্লেখ্য সুন্দরবনে মধু আহরণে যাওয়ার ৮সদস্যের মৌয়াল দলটি গত ৬ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে ঝড়ের কবলে পড়ে। একপর্যায়ে মাঝ নদীতে নৌকা হারিয়ে ঝড়ের তোড়ে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে চারজনকে বনরক্ষীরা সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ থেকে উদ্ধার করলেও আকবর, অলিউর হোসেন লিটন, মিকাইল এবং কবিরের সন্ধান মেলেনি গত চারদিনে।
দুর্ঘটনার সময় মৌয়াল নৌকায় অবস্থানরত বেঁচে ফেরা মৌয়াল ইউনুস আলী জানায় ঝড়ের পুর্ব মুহূর্তে বিদ্যুৎ চমকানোর সুযোগে তারা নিজেদেরকে সুন্দরবনের কিনারের কাছাকাছি আবিস্কার করেছিলেন। কিন্তু তৎক্ষণাত হঠাৎ তীব্র ঝড় শুরু হলে নৌকা উল্টে ঝড়ের তীব্রতা ও ঢেউয়ের তোড়ে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জ্ঞান হারালেও পরদিন সকালে বনকর্মীদের ডাকাডাকিতে তাদের ঘুম ভাঙে।
বাড়িতে ফিরে আসা এ মৌয়াল আরও জানান তাদের এক সহকর্মী ইকরামুল কবির ভারতীয় জেলেদের মাধ্যমে উদ্ধার হয়েছে বলে তথ্য এসেছে। পরবর্তীতে উদ্ধারকারী জেলেদের সহায়তায় বাংলাদেশী জেলেদের মাধ্যমে তাকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করে দেয়ার সংবাদও মিলেছে। বাকি তিন সহযোগীকে উদ্ধারের জন্য তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালীনি স্টেশন অফিসার মোঃ ফজলুল হক জানান দু’দিন টানা চেষ্টা করেও তিনজনের হদিস করতে না পেরে শনিবার দুপুরের দিকে অভিযান শেষ হয়েছে। ফিরে আসা দুই মৌয়ালকে সঙ্গে নিয়ে তাদের পরামর্শমত সাম্বব্য সব স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। তারপরও কোস্টগার্ড ও রিভারাইন বিজিবিকে তিন মৌয়াল নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়ে সন্ধান চালাতে অনুরোধ করা হয়েছে।









