মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

সুফী মোতাহার হোসেনের কবিতা ও সাহিত্যমহলে উপেক্ষার নীতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ
সুফী মোতাহার হোসেনের কবিতা ও সাহিত্যমহলে উপেক্ষার নীতি

মুয়িন পারভেজ
বাতিঘরের ওয়েবসাইটে ‘মোতাহার হোসেন সুফী’ পাতায় লেখা আছে কবি সুফী মোতাহার হোসেনের জীবনকথা। বস্তত নামের বানানে সাদৃশ্য থাকিলেও দুজন আলাদা লোক। সংক্ষিপ্ত পরিচিতিটুকু ‘উইকিপিডিয়া’-র পাতা হইতে হুবহু তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে অবশ্য দোষের কিছু দেখি না-‘উইকিপিডিয়া’ মুক্ত বিশ্বকোষ; তবে তথ্যসূত্র উল্লেখ করা যাইত।
‘উইকিপিডিয়া’-তে সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-১৯৭৫)-সংক্রান্ত সবিস্তার কোনও তথ্য নাই, ‘বাংলাপিডিয়া’-তেও নাই। মারিয়া সালাম-সম্পাদিত ‘ছাড়পত্র’ ওয়েবজিনে সুফীর পাঁচটি সনেট প্রকাশ করা হয় ২০১৮ সালে, সঙ্গে কবির জীবন সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক কিছু কথাও। সেই লেখা হইতে জানা যায়, যৌবনে কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে (‘ফরিদপুরসিটি.কম’ ওয়েবসাইটে এই রোগের নাম লেখা হয়: নিউরেস্থিনিয়া ও ডিসপেপশিয়া) আক্রান্ত হইয়া ডা. নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩) ও ডা. বিধান রায়ের (১৮৮২-১৯৬২) শরণাপন্ন হন, কিন্তু নিরাময় না হওয়ায় কবি তালতলার পির আরশেদ আলীর দরবারে আসেন। সেখানে পিরের সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় কবির রোগমুক্তি ঘটে এবং তিনি স্থূল সংসার ভুলিয়া মারেফাতের গূঢ় জগতের সন্ধানে আকৃষ্ট হইয়া পড়েন। প্রায় এক যুগ কবি বিভিন্ন দরগা-খানকায় ঘুরিয়া বেড়ান। পরে শুরু হয় কবির শিক্ষকতার জীবন। ঈশান ইনস্টিটিউটে তিনি শিক্ষকতা করেন দীর্ঘকাল। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়েই সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

সুফী মোতাহার হোসেনের জন্ম ফরিদপুর জেলার ভবানন্দপুর গ্রামে, মাতুলালয়ে। তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুল হইতে এন্ট্রান্স, জগন্নাথ কলেজ হইতে এফএ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিএ (১৯৩১) পাশ করেন। বিএ পাশ করার পর কবি ফরিদপুর জেলা জজ আদালতে অফিস সহকারী পদে চাকরি করেন বছর দুয়েক। ‘সূফী মোতাহার হোসেন: জীবন ও কাব্য’ (‘সূফী’ বানানটি লক্ষণীয়) নামে একটি গবেষণাধর্মী বই লিখিয়াছেন ড. মোহাম্মদ আলী খান। সম্ভবত ইহাই কবির প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত। জীবনীকার জানান, কবির পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বীরপাশা গ্রামে, যদিও পরবর্তীকালে কবির পিতা মৌলভি মোহাম্মদ হাশিম ভবানন্দপুর গ্রামেই থিতু হন। তিনি পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর ছিলেন। ‘উইকিপিডিয়া’ জানাইতেছে, কবির মাতা তৈয়বতননেছা খাতুন ছিলেন জমিদার।
বিশের দশকে সুফী মোতাহার হোসেন মুসলিম সাহিত্যসমাজ-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সময়ে তিনি মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), ড. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) প্রমুখ কবিলেখকের সাহচর্য লাভ করেন; বিশেষত কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহিতলাল মজুমদারের অনুপ্রেরণায় তিনি কবিতাচর্চায় উদ্বুদ্ধ হন। গবেষক মামুন সিদ্দিকী সম্প্রতি কবিরচিত ‘আবুল হুসেন’ শীর্ষক একটি অগ্রন্থিত নিবন্ধ প্রকাশ করেন ‘প্রথম আলো’-য় (৯ এপ্রিল ২০২৬)।
‘সনেট সংকলন’ (১৯৬৫) সুফী মোতাহার হোসেনের প্রথম কাব্য; পরে তাঁহার ‘সনেট সঞ্চয়ন’ (১৯৬৬) ও ‘সনেটমালা’ (১৯৭০) নামের দুটি কাব্য প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)-সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্যপরিচয়’ (১৯৩৮) সংকলনে সুফীর ‘দিনান্তে’ সনেটটি ঠাঁই পায়। ‘বাংলাপিডিয়া’সহ কিছু দৈনিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘দিনান্তে’ শিরোনামটি ‘দিগন্ত’ বলিয়া উল্লিখিত। আবদুল কাদির ও রেজাউল করীম (১৯০২-১৯৯৩)-সম্পাদিত ‘কাব্য-মালঞ্চ’ (১৯৪৫) সংকলনে সুফীর দুটি সনেট (‘স্বপ্নাগতা’ ও ‘মায়া-মৃগী’) চয়িত হইয়াছে। নরেন্দ্র দেব (১৮৮৮-১৯৭১) ও রাধারাণী দেবী (১৯০৩-১৯৮৯)-সম্পাদিত ‘কাব্য-দীপালি’ সংকলনের তৃতীয় সংস্করণেও সুফীর সনেট গৃহীত হয় বলিয়া জানা যায় ‘ফেইসবুক’-এ প্রকাশিত এক লেখায়, যদিও সংকলনটির প্রথম সংস্করণ (১৯২৭) ও দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৩১) সুফীর কোনও কবিতা পাওয়া যায় না।
আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৫), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৭০) ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৪)-প্রাপ্ত কবি সুফী মোতাহার হোসেন সনেট-রচয়িতা হিশেবে বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। ‘দিনান্তে’ সনেটটি এখানে তুলিয়া দিলাম সনেটপিয়াসি পাঠকদের জন্য:
কুলায় প্রত্যাশী এক দীর্ঘপক্ষ পাখির মতন
দিগন্ত প্রসারি দুটি ঘনচ্ছায় ব্যাকুল পাখায়
পশ্চিম সাগর পারে দিন যবে ধীরে চলি যায়
মৌন মূক বেদনায় সকরুণ করিয়া গগন:
যবে তারে সন্ধ্যাবধূ স্মিতহাস্যে টানিয়া গুণ্ঠন,
বাসর-প্রদীপগুলি জ্বালি দিয়া তারায় তারায়,
গোপনে বরণ করে, ঢাকে তারে গভীর মায়ায়:
দিনান্তে পথিক এক আঁখি ভরি নেহারে স্বপন;
অমনি দিনান্ত যবে গাঢ়চ্ছাচ্ছে ঘনাবে জীবনে
সকরুণ, সুগম্ভীর; দিনান্তের যাত্রা-সহচরী
বধূ কি আসিবে তার। সুগভীর স্নিগ্ধ মমতায়
অমনি সুন্দর করে সন্ধ্যাদীপ জ্বালায়ে যতনে
বরণের ডালাখানি কম্প্রহস্তে তুলিবে কি ধরি’।
গভীর আশ্বাস বাণী কহিবে কি অস্ফুট ভাষায় ।
[‘বাংলা কাব্যপরিচয়’, পৃ ৩৩১-৩৩২]
শব্দচয়নে রাবীন্দ্রিক ঘরানার অনুসারী হইলেও খাঁটি পেত্রার্কীয় আদর্শে সনেটরচনায় সুফী বেশ নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন। পরিতাপের বিষয় এই যে, সুফীর কাব্যসমূহ আজ আর সুলভ নহে। হয়তো গণগ্রন্থাগারের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনও পুস্তকপ্রকোষ্ঠে তাঁহার জরাজীর্ণ এক-আধখানা কাব্য পড়িয়া থাকিতে পারে। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় কবির জন্মমৃত্যুতিথি-উপলক্ষ্যে বিশেষ আয়োজনও চোখে পড়ে না।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মাধ্যমিক স্তরে নবম-দশম শ্রেণিতে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৬-২০০৮)-সম্পাদিত ‘বাংলা কবিতা’ বইয়ে সুফীর কবিতা পাঠ্য ছিল। ২০১৮ সালে প্রকাশিত একই শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে (সম্পাদনা: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও ড. মাহবুবুল হক) কামাল চৌধুরীর (জ. ১৯৫৭) কবিতা থাকিলেও সুফীর কবিতা বাদ পড়িয়াছে; ২০২৫ সালে প্রকাশিত সংস্করণেও নাই। না-থাকা কবিদের তালিকায় আরও আছেন: নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০), শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন (১৯০১-১৯৮১), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-২০২০), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (১৯৩৬-২০১৩), ফজল শাহাবুদ্দীন (১৯৩৬-২০১৪), আবু হেনা মোস্তফা কামাল (১৯৩৬-১৯৮৯), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) প্রমুখ; এমনকী কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১), প্রাবন্ধিক-গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪), ড. মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০২-১৯৮২), ড. মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-১৯৬৯), ড. আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯), মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১), আহমদ ছফার (১৯৪৩-২০০১) কোনও লেখা নবম-দশম শ্রেণিতে পাঠযোগ্য বিবেচনা করা হয় নাই।
এভাবেই কি অগ্রজ কবিলেখকেরা রূপান্তরিত হন বিস্মৃতির ফসিলে, ধীরে-ধীরে? কোনও সুবেদী সম্পাদকের হাতে সুসম্পাদিত হইয়া সুফীর কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হউক-আপাতত ইহাই প্রার্থনা।

Ads small one

সাতক্ষীরা পলিটেকনিকের ট্যুরিজম বিভাগ: সম্ভাবনার বাতিঘর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরা পলিটেকনিকের ট্যুরিজম বিভাগ: সম্ভাবনার বাতিঘর

মো. মামুন হাসান

সাতক্ষীরার কোনো এক গ্রামের ছেলে হয়তো এখন ভাবছে, এসএসসি পাস করার পর কী পড়বে। পরিবারের স্বপ্ন, একটি ভালো চাকরি। সন্তানের স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়ানো। কিন্তু এই দুই স্বপ্নের মাঝখানে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খায়, তা হলো, পড়াশোনা শেষে কাজটা কোথায়? প্রশ্নটির উত্তর হয়তো আমাদের খুব পরিচিত কয়েকটি পেশার বাইরে কোথাও লুকিয়ে আছে।

 

ভাবুন, সাতক্ষীরার একটি ছেলে চার বছর আগে ভর্তি হলো সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। কয়েক বছর পর সেই তরুণ সুন্দরবনে একজন বিদেশি পর্যটকের গাইড। তার কণ্ঠে সুন্দরবনের গল্প, হাতে পর্যটন ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, কথায় ইংরেজির স্বচ্ছন্দ ব্যবহার। আবার অন্য কোনো দিন তাকে দেখা গেল ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে। আরেকজন হয়তো বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিসে কাজ করছেন। কেউ নিজের ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। কেউ সাতক্ষীরার গ্রামেই হোমস্টে তৈরি করেছেন।আর কেউ হয়তো একদিন মালদ্বীপের কোনো দ্বীপ রিসোর্টে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছেন।

 

একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে এতগুলো সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে, বিষয়টি এখনো সাতক্ষীরার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে যথেষ্ট পরিচিত নয়।বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট কারিগরি শিক্ষার একটি স্বীকৃত চার বছর মেয়াদি শিক্ষাক্রম। কিন্তু এটিকে কেবল আরেকটি ডিপ্লোমা হিসেবে দেখলে এর আসল সম্ভাবনাটাই ধরা পড়ে না। কারণ এই শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের চলাচল, আতিথেয়তা, ভ্রমণ, খাদ্য, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, ব্যবস্থাপনা এবং সেবা অর্থনীতি।সাতক্ষীরার জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।কারণ সাতক্ষীরা নিজেই একটি পর্যটন ভূগোল। সুন্দরবনের পশ্চিম অংশ, নদী, উপকূল, গ্রামীণ জীবন, স্থানীয় খাবার, লোকজ সংস্কৃতি এবং সীমান্তের বাণিজ্যিক অবস্থান মিলে এই জেলার একটি স্বতন্ত্র পর্যটন পরিচয় তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েও জাতীয় গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে লেখা হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতিও দেখিয়েছে যে এই অঞ্চলে পর্যটনের চাহিদা কেবল সম্ভাবনার কাগজে নেই, বাস্তবেও তার উপস্থিতি আছে।কিন্তু পর্যটক এলেই পর্যটন শিল্প তৈরি হয় না। প্রয়োজন দক্ষ মানুষ।

 

একজন পর্যটক সুন্দরবনে এলেন। তিনি শুধু বনের গাছ দেখতে চান না। জানতে চান, এই বন কীভাবে বেঁচে আছে, জোয়ার কীভাবে মানুষের জীবন বদলায়, মৌয়ালরা কীভাবে মধু সংগ্রহ করেন, বাঘকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ভয় ও বিশ্বাস কী। একজন দক্ষ স্থানীয় গাইড তখন শুধু পথ দেখান না, তিনি একটি ভূখণ্ডের গল্প বলেন। তিনি হয়ে ওঠেন একটি অঞ্চলের অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত।

 

সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য এখানেই বড় সুযোগ।ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়া মানে শুধু হোটেলে চাকরি করা নয়। বরং হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর, এয়ারলাইনস, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ট্যুর গাইডিংসহ পর্যটন ও সেবাখাতের নানা পেশায় যাওয়ার পথ তৈরি করা। পর্যটনবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে পাঁচ তারকা হোটেল এবং বিমান সংস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগের কথাও জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।কিন্তু আমার কাছে এই বিভাগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।

 

সাতক্ষীরার একজন শিক্ষার্থী চাইলে সাতক্ষীরাতেই একটি ছোট ট্যুর কোম্পানি শুরু করতে পারেন। শুরুতে অফিস না থাকলেও চলে। একটি মোবাইল ফোন, একটি ফেসবুক পেজ, কয়েকটি ভালো পর্যটন প্যাকেজ এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা দিয়েই শুরু হতে পারে। সাতক্ষীরা থেকে সুন্দরবন, সুন্দরবন থেকে খুলনা, গ্রামীণ জীবন, স্থানীয় খাবার, নদীভ্রমণ কিংবা হোমস্টে নিয়ে তৈরি হতে পারে ছোট ছোট পর্যটন প্যাকেজ।

 

একজন কাজ শুরু করবেন, তাঁর সঙ্গে যুক্ত হবেন একজন নৌকার মাঝি, একজন গাড়িচালক, একজন স্থানীয় রাঁধুনি, একজন গাইড, একজন ফটোগ্রাফার। অর্থাৎ একজন তরুণের উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত একসময় কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানে পরিণত হতে পারে।এখানেই পর্যটন শিক্ষার সৌন্দর্য।এটি শুধু চাকরি খোঁজার শিক্ষা নয়, চাকরি তৈরি করার শিক্ষাও হতে পারে।

 

সাতক্ষীরার স্থানীয় খাবারও হতে পারে এই অর্থনীতির অংশ। একটি সন্দেশ, এক পাত্র খেজুরের গুড়, উপকূলের শুঁটকি, গ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী রান্না কিংবা কোনো কারুশিল্পকে যদি পর্যটকের জন্য একটি অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া যায়, তাহলে স্থানীয় সংস্কৃতি আর শুধু স্মৃতির বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক সম্পদ।

 

রবীন্দ্রনাথের সেই পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে, “পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে।” ট্যুরিজমের শিক্ষার্থীর পথটিরও কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। সাতক্ষীরায় শুরু হয়ে সেই পথ যেতে পারে ঢাকায়, কক্সবাজারে, সিলেটে কিংবা সুন্দরবনের নৌপথে। আবার দেশের সীমানা পেরিয়ে যেতে পারে মালদ্বীপ, দুবাই, কাতার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা বিশ্বের অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্রে।

 

পৃথিবীর পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এর ভাষা প্রায় সর্বজনীন। একজন মানুষকে স্বাগত জানানো, তার প্রয়োজন বোঝা, তাকে নিরাপদ ও সুন্দর অভিজ্ঞতা দেওয়া, খাবার পরিবেশন করা, ভ্রমণের ব্যবস্থা করা কিংবা একটি স্থানের গল্প বলা, এগুলো কোনো একটি দেশের একচেটিয়া দক্ষতা নয়। তাই দক্ষতা থাকলে একজন সাতক্ষীরার তরুণও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন। আর এখানেই ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও পেশাদার আচরণের গুরুত্ব। একটি ভালো হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে শুধু হাসতে জানলেই হয় না, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে জানতে হয়। একজন পর্যটকের প্রয়োজন বুঝতে হয়। সমস্যা হলে সমাধান করতে হয়। প্রযুক্তির সাহায্যে রিজারভেশন, টিকিটিং, অনলাইন মার্কেটিং কিংবা পর্যটন ব্যবস্থাপনা করতে হয়। ফলে এই শিক্ষার ভেতর দিয়ে একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে কারিগরি দক্ষতা ও মানবিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান।তবে সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি হতে পারে নিজের শহরকে ঘিরে।সাতক্ষীরার ছেলে সাতক্ষীরাতেই দাঁড়িয়ে যদি বলতে পারে, “আমার চাকরি আমি নিজেই তৈরি করেছি”, তাহলে সেটিই হবে এই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

 

আমরা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকে অনেক সময় বড় শহরের দিকে তাকিয়ে দেখি। মনে করি ভালো ক্যারিয়ার মানেই ঢাকা। অথচ ডিজিটাল যুগে এবং পর্যটনের বিকাশে এই ধারণা বদলানোর সুযোগ এসেছে। একজন দক্ষ ট্যুর অপারেটরের অফিস সাতক্ষীরায় হতে পারে, তাঁর গ্রাহক হতে পারেন ঢাকার মানুষ কিংবা বিদেশি পর্যটক। তাঁর গাইড হতে পারেন স্থানীয় তরুণ। তাঁর খাবারের সরবরাহ দিতে পারেন গ্রামের নারী উদ্যোক্তা। তাঁর পরিবহন দিতে পারেন স্থানীয় চালক। অর্থাৎ একটি পর্যটন উদ্যোগ একটি পুরো স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করতে পারে।

 

সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগকে তাই শুধু একটি শিক্ষাক্রম হিসেবে দেখার সময় হয়তো পেরিয়ে গেছে। এটিকে দেখতে হবে সাতক্ষীরার মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় ভিত্তি হিসেবে।কারণ সুন্দরবন আমাদের আছে, কিন্তু সুন্দরবনের গল্প বলার মতো দক্ষ মানুষ কতজন তৈরি করেছি?প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রকৃতিকে পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়ার দক্ষতা কতটা তৈরি করেছি? সাতক্ষীরার তরুণ আছে, কিন্তু তাদের হাতে স্থানীয় সম্ভাবনাকে কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়ার মতো প্রশিক্ষণ কতটা পৌঁছেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার একটি জায়গা হতে পারে পলিটেকনিকের সেই শ্রেণিকক্ষ। হয়তো কোনো একদিন সেই শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা একজন তরুণই সুন্দরবনের নৌকায় বিদেশি পর্যটককে বলবেন, “ওয়েলকাম টু সুন্দরবন.” কয়েক বছর পর হয়তো সেই একই তরুণ নিজের ট্যুর কোম্পানির মালিক।অথবা কোনো পাঁচ তারকা হোটেলের ব্যবস্থাপক।অথবা বিমানবন্দরের পেশাজীবী।অথবা মালদ্বীপের কোনো রিসোর্টে কর্মরত।অথবা নিজের গ্রামের পাশে গড়ে তোলা একটি হোমস্টের উদ্যোক্তা।শুরুটা কিন্তু একই জায়গা থেকে।সাতক্ষীরার একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে।

 

তাই ট্যুরিজম পড়া মানে শুধু পর্যটক হওয়া নয়। বরং পর্যটনের মানুষ হওয়া। নিজের মাটিকে নতুন চোখে দেখা। নিজের এলাকার গল্পকে অর্থনীতিতে রূপ দেওয়া। আর প্রয়োজন হলে সেই দক্ষতা নিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করা।শিকড় সাতক্ষীরায় থাকুক, কিন্তু স্বপ্নের সীমানা হোক পুরো পৃথিবী।সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো এখানেই।

 

লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

সাতক্ষীরায় সোহাগ পরিবহনের ধাক্কায় পথচারী নিহত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় সোহাগ পরিবহনের ধাক্কায় পথচারী নিহত

মো. সিরাজুল ইসলাম : সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় সোহাগ পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় আনন্দ দাস (৫৮) নামে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল ৬টা ২০ মিনিটে পাটকেলঘাটা থানাধীন শাকদা ব্রিজ সংলগ্ন মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

​নিহত আনন্দ দাস শাকদা গ্রামের মৃত কৃষ্ণ পদ দাসের ছেলে।

​পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ সকালে আনন্দ দাস শাকদা ব্রিজ সংলগ্ন মহাসড়ক পার হচ্ছিলেন। এ সময় ঢাকা থেকে সাতক্ষীরাগামী ‘সোহাগ পরিবহন’-এর একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১২-৪৪৬২) তাঁকে তীব্র ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে পড়ে যায়। এতে বাসের কয়েকজন যাত্রী সামান্য আহত হন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে গেছেন। ঘটনার পর পরই বাসের চালক ও হেলপার পালিয়ে যান।

​ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পাটকেলঘাটা থানা-পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি বর্তমানে মহাসড়কের পাশে রয়েছে। নিহতের লাশ উদ্ধার করে তাঁর নিজ বাড়িতে রাখা হয়েছে। চালক ও হেলপারকে আটকে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে অ্যাডভোকেট ইফতেখার আলীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪২ পূর্বাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর সাথে অ্যাডভোকেট ইফতেখার আলীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে রোববার রাতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী।