সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২ বাংলাদেশিকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তারা সিতি আখতার ও নজরুল ইসলাম আবদুল বশির বলে জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে সরকারি নথি অনুযায়ী ওই নারীর নাম সুইটি আক্তার এবং যুবকের নাম নজরুল ইসলাম। সাজাপ্রাপ্ত যুবকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবং নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলে। সামাজিকমাধ্যমে তাদেরকে স্বামী-স্ত্রী এবং তারা উমরাহ করতে সে দেশে গেছেন বলে দাবি করা হলেও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী নন এবং কাজের উদ্দেশ্যে তারা আলাদাভাবে সৌদি আরবে যান।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাজাপ্রাপ্ত নজরুল ইসলাম ২০২২ সালের অক্টোবরে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নেন সৌদি আরবে কাজের উদ্দেশ্যে। পরের বছর ৫ ফেব্রুয়ারিতে ক্লিয়ারেন্স নেন সুইটি আক্তার। প্রসঙ্গত, কাজের উদ্দেশ্যে যেকোনও দেশে যেতে হলে এই ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়।
সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যে এই দুইজনের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে বসবাস করা কর্মী এবং অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছে। দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কথা বলে জানা গেছে, সৌদি সরকারের কাছে তাদের দুইজনের মামলার রায়ের কপি এবং নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলো পাওয়া গেলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, তাদেরকে ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় দুইজনই পরিবারের সঙ্গে মাসে একদিন করে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছেন। তবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা এবং বাস্তবায়নের বিষয়ে তাদের পরিবারকে কিছুই জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আটকের পর সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টে তাদের প্রত্যেকের ২০ বছরের সাজা হয়। তবে সেই সাজায় সন্তুষ্ট না হওয়ায় তারা ওই রায়ের বিরুদ্ধে দেশটির উচ্চ আদালতে আপিল করেন। উচ্চ আদালত রায়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ওই তরুণ-তরুণীর সেই ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ ভিডিও ধারণ করেন অপর একজন। তবে তিনি কোন দেশের নাগরিক তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাকে পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে দাবি করলেও তিনি ভারতীয় নাগরিক হতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিও করার অপরাধে তাকেও সাজা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সেই ভিডিও বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ার করার অপরাধে আরও অন্তত ২০ জনকে আটক করা হয় এবং সাইবার ক্রাইমের মামলায় তাদেরকে সাজা দেওয়া হয়।
নজরুলের পরিবার জানায়, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে (২২)সৌদি আরবে পাঠান তার বাবা। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেফতার হন নজরুল। ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা তখনও পরিশোধ করা বাকি। এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন বছর। কারাগারে থাকা ছেলের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা বলতে পারতেন বাবা-মা। সর্বশেষ কথা হয়েছিল গত ১১ অক্টোবর। দুই থেকে আড়াই মিনিটের সেই কথোপকথনের পর ছেলের কণ্ঠ আর শোনা হয়নি তাদের।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সৌদি আরব থেকে ফোন করে পরিবারকে জানানো হয়, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ছেলেকে হারানোর শোকে গত কয়েক দিন ধরে কাঁদছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘‘ছেলেই একমাস পরপর ফোন করতো। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলতো। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’’
অপরদিকে সুইটির পরিবারের সূত্রে জানা যায়, দিনমজুর ফজল মিয়ার পাঁচ মেয়ে। তাদের মধ্যে সুয়েতি আক্তার সবার ছোট। তার ডাক নাম সুইটি। গত ২০১৬ সালের দিকে সুইটির একই উপজেলার তরফপুর গ্রামের বাসিন্দা সেলিম মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। সেখানে পারিবারিক কলহের কারণে একবছর পর তাদের বিচ্ছেদ হয়। এর কিছুদিন পর ২০১৮ সালের দিকে মহেড়া গ্রামের শিপন মিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। ৬ মাস পর স্বামী শিপন মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করায় সেখান থেকেও ডিভোর্স হয় সুইটি আক্তারের। অভাবের সংসার ও মানসিকভাবে অস্বস্তিতে থাকার কারণে সুইটি সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে ২০২৩ সালের দিকে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদি আরবে পাঠায় তার পরিবার। সৌদির আল মাজাল আল-আরাবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সুইটির চাকরি হয়। প্রতিমাসে তিনি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠাতেন। সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সৌদি যাওয়ার ৬ মাস পর হঠাৎ করে কোম্পানিতে মারামারির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে সুইটি আক্তারকে দোষারোপ করা হয়। পরে সৌদি পুলিশ গ্রেফতার করে। এরপর থেকেই তিনি কারাবন্দি ছিলেন। তবে কিছুদিন পরপর বাড়িতে ফোনে কথা বলতেন। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) তার ভাগনি জেদনী আক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে সুইটির। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার আর কোনও খোঁজ নেই।
সুইটি আক্তারের বাবা মো. ফজল মিয়া বলেন, ‘‘আমি দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। একদিন মাটি কাটি আবার আরেকদিন ভ্যান চালাই। এভাবেই আমার ৫ মেয়েকে বড় করেছি। অভাবের সংসারে ছোট মেয়ে সুয়েতি আক্তারকে (সুইটি আক্তার) দুই বার বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ে টিকেনি। এজন্য সংসারের হাল ধরতে সৌদিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। দেড় লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদিতে পাঠানো হয়। মক্কা নগরির একটি কোম্পানিতে কাজ করতো। সেখানে কোম্পানির লোকজনের সাথে ঝগড়া হয়। কিন্তু আমার মেয়ে ঝগড়ার মধ্যে ছিল না। তারপরও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। আড়াই বছর ধরে আমার মেয়ে জেলে রয়েছে। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা বলতো। কয়েকদিন আগে সে বলেছিল, আগামী দুই মাস পর দেশে ফিরবে। কিন্তু গত মঙ্গলবারের (১৩ অক্টোবর) পর আর কথা হয়নি। এখন অনেকেই বলতেছে, আমার মেয়ে সুয়েতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ব্যাপারে আমার মেয়ে কিছুই জানায়নি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার মেয়ে মসজিদের ভেতরে কোনও অনৈতিক কাজ করেনি। তার কোনও বন্ধুও ছিল না। অনৈতিক কাজের বিষয়টি মিথ্যা। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি এখনও প্রশাসনের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার মেয়েকে ফেরত চাই। মেয়েকে ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’’






