১ লাখ ২০ হাজার টাকার স্বপ্ন, আজ ২০ শ্রমিকের ভরসা
ঈদের অর্ডারে ব্যস্ত সাতক্ষীরার ‘রাকিব সুজ’
মিলন বিশ্বাস: শিল্প-কারখানায় পিছিয়ে থাকা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় সীমিত পুঁজিতে গড়ে ওঠা একটি ছোট জুতা কারখানা এখন হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার নতুন প্রতীক। শহরের পুরাতন সাতক্ষীরা আলিয়া মাদ্রাসা পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত “রাকিব সুজ” নামের এই কারখানাটি বর্তমানে প্রায় ২০ জন শ্রমিকের জীবিকার উৎস। আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এখন দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারখানার শ্রমিক ও কর্তৃপক্ষ।
২০২২ সালে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পুঁজি এবং কয়েকজন নতুন কারিগর নিয়ে উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান শুরু করেন এই উদ্যোগ। শুরুতে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও ধীরে ধীরে স্থানীয় বাজারে জায়গা করে নেয় তাদের তৈরি জুতা। বর্তমানে কারখানাটিতে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ ধরনের জুতা তৈরি হচ্ছে। অটোকাটিং মেশিনের ব্যবহার এবং দক্ষ নারী শ্রমিকদের নিপুণ হাতে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জোড়া জুতা।
শিশু থেকে শুরু করে নারী-পুরুষের বিভিন্ন বয়স উপযোগী জুতা তৈরি হচ্ছে এখানে। পাইকারি বাজারে প্রতি জোড়া জুতা ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে এসব জুতা।
কারখানার নারী শ্রমিক বিলকিস পারভিন বলেন, “আমি এখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। নিয়মিত বেতন পাই, তাই সংসার ভালোভাবে চালাতে পারছি। বাড়ির পাশেই কাজ হওয়ায় এলাকার অনেক নারী এখন স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।”
আরেক নারী শ্রমিক সেলিনা খাতুন বলেন, “ঈদের আগে কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। তবে এই কারখানার আয়ে আমার সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসার ভালোভাবেই চলছে।”
ক্রেতারাও স্থানীয়ভাবে তৈরি জুতার মান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন ক্রেতা জানান, “রাকিব সুজের জুতার ডিজাইন ও কোয়ালিটি অনেক ভালো। দামও তুলনামূলক কম। তাই পরিবারের সবাই এখন স্থানীয় এই জুতাই ব্যবহার করছে।”
কারখানার ম্যানেজার সোহারব হোসেন বলেন, “ঈদ সামনে থাকায় অর্ডারের চাপ অনেক বেড়েছে। শ্রমিকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করছেন। আমরা ভালো মান বজায় রেখে জুতা তৈরি করছি। কোনো সমস্যা হলে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক রিটার্ন সুবিধাও দিচ্ছি।”
কারখানার মালিক হাফিজুর রহমান বলেন, “শুরুটা খুব কঠিন ছিল। প্রথম দুই বছর অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। কারিগরদের কাজ শিখিয়ে নিতে হয়েছে। এখন আল্লাহর রহমতে চাহিদা বেড়েছে। ভবিষ্যতে কারখানাটি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে আরও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “সাতক্ষীরায় জুতা শিল্প নিয়ে তেমন কোনো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নেই। যদি সরকারি বা বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকতো, তাহলে আমরা আরও উন্নত মানের জুতা তৈরি করে বিদেশেও রপ্তানি করতে পারতাম।”
এ বিষয়ে বিসিক সাতক্ষীরার উপব্যবস্থাপক গৌরব দাস বলেন, “রাকিব সুজ দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত জুতা তৈরি করছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে বিসিক বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকে। এ ধরনের উদ্যোগ জেলার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকা সাতক্ষীরায় সীমিত পুঁজিতে গড়ে ওঠা এমন উদ্যোগগুলোই বদলে দিতে পারে স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র। “রাকিব সুজ” এখন শুধু একটি কারখানার নাম নয়, বরং বহু মানুষের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস ও জীবিকার প্রতীক।






