বাগদা ডিমের কারবারে নতুন শঙ্কায় সাতক্ষীরা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সাতক্ষীরার অর্থনীতির কথা উঠলে যে কয়েকটি শব্দ অনিবার্যভাবে সামনে আসে, তার মধ্যে অন্যতম ‘চিংড়ি’। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই সীমান্তবর্তী জেলা শুধু চিংড়ি উৎপাদনের জন্য পরিচিত নয়, বরং বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও বিবেচিত। শ্যামনগরের উপকূল, আশাশুনির বিলাঞ্চল, কালীগঞ্জের ঘের, দেবহাটার জলাভূমি কিংবা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য চিংড়িঘের শুধু মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; এগুলো হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকার কেন্দ্র। সেই সাতক্ষীরাতেই সম্প্রতি আশাশুনি উপজেলায় অবৈধ ভারতীয় বাগদা চিংড়ির ফুটানো ডিম জব্দ হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনের অভিযানে আট পলি বাগদা ডিম জব্দ, পরিবহনকারীকে জরিমানা এবং ডিম নদীতে অবমুক্ত করার ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার তাৎপর্য একটি মোবাইল কোর্ট বা একটি চালান জব্দ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি সাতক্ষীরার চিংড়ি শিল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি গভীর সমস্যার আভাস দেয়। প্রশ্ন হলো, কেন সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ বাগদা ডিম আসছে? কারা এর সঙ্গে জড়িত? এর প্রভাব কী? আর সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে? বাংলাদেশে বাগদা চিংড়ি চাষের ইতিহাসে সাতক্ষীরার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক আগে যখন উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষের প্রসার শুরু হয়, তখন থেকেই সাতক্ষীরা এই শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। বর্তমানে জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালীগঞ্জ, তালা, দেবহাটা ও সদর উপজেলায় হাজার হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। স্থানীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। শুধু ঘের মালিক নয়, শ্রমিক, জেলে, পরিবহনকর্মী, বরফকল মালিক, আড়তদার, খাদ্য সরবরাহকারী, হ্যাচারি ব্যবসায়ীÑঅসংখ্য মানুষের আয়-রোজগার জড়িয়ে আছে এই শিল্পের সঙ্গে। অনেক গ্রামে কৃষির চেয়ে চিংড়ি চাষই এখন প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকা-। ফলে এই শিল্পে সামান্য অস্থিরতাও হাজারো মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।চিংড়ি শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো ডিম ও পোনা। একটি ভালো মানের ডিম থেকে সুস্থ পোনা উৎপাদিত হয়, আর সেই পোনা ঘেরে গিয়ে বড় হয়ে রপ্তানিযোগ্য চিংড়িতে পরিণত হয়। অন্যদিকে নি¤œমানের বা রোগাক্রান্ত ডিম পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও চিংড়ি শিল্পে ডিমের গুণগত মানই মূল ভিত্তি। তাই অবৈধ বা অজানা উৎসের ডিমের প্রবেশ শুধু একটি আইনি অপরাধ নয়; এটি পুরো শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। চিংড়ি চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি। ফলে ডিম ও পোনার চাহিদাও ব্যাপক। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে বৈধ বাজারের পাশাপাশি অবৈধ বাজারও তৈরি হয়েছে।
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে চোরাইপথে নানা পণ্য আসার অভিযোগ বহু পুরোনো। বাগদা ডিমও সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কম দামে ডিম সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই পথে ঝুঁকে পড়ে। অনেক সময় পরিবহনকারী জানেনও না তিনি কী বহন করছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের বহু চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হোয়াইট স্পট সিনড্রোম সহ বিভিন্ন রোগের কারণে অনেক ঘেরে উৎপাদন কমে গেছে, কোথাও কোথাও পুরো মৌসুমই নষ্ট হয়েছে। অবৈধ ও মান যাচাইবিহীন ডিম ব্যবহার করলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ ডিম কোথা থেকে এসেছে, সেটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে কি না, কোনো রোগ বহন করছে কি নাÑএসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। একটি হ্যাচারিতে যদি রোগাক্রান্ত ডিম প্রবেশ করে, তাহলে সেখান থেকে উৎপাদিত পোনা শত শত ঘেরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে ক্ষতির পরিমাণও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সাতক্ষীরার চাষিরা এমনিতেই চাপে ও সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষিরা বর্তমানে নানা সমস্যার মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে মানহীন বা অবৈধ ডিমের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
একজন চাষি যখন একটি মৌসুমে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি আশা করেন ভালো উৎপাদন পাবেন। কিন্তু যদি শুরুতেই নি¤œমানের পোনা পান, তাহলে পুরো বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। অবৈধ ডিমের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে বৈধ হ্যাচারি ব্যবসার ওপর।একটি বৈধ হ্যাচারি পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। লাইসেন্স, মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবলÑসবকিছুর জন্য ব্যয় রয়েছে। কিন্তু অবৈধ উৎসের ডিম বাজারে এলে তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। ফলে যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করছে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো শিল্পের মানকে নিচের দিকে নামিয়ে আনে। সাতক্ষীরার ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকার কারণে বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি চোরাচালানের ঝুঁকিও সবসময় থাকে। সীমান্তবর্তী অনেক এলাকায় নদী, খাল ও বিল থাকায় নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও চোরাকারবারিরা নতুন নতুন পথ খুঁজে নেয়।
ফলে একটি চালান আটক হওয়া মানে এই নয় যে সমস্যা শেষ। বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে আরও বড় কোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। আশাশুনির ঘটনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো স্থানীয় মানুষের সচেতনতা। সন্দেহজনক ভাবে ডিম বহন করা গাড়ি দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিয়েছেন। পরে প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সামাজিক সচেতনতা থাকলে অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে ঘটনাটি আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনেÑযদি স্থানীয়দের সন্দেহ না হতো, তাহলে কি চালানটি গন্তব্যে পৌঁছে যেত? এই প্রশ্নের উত্তরই দেখিয়ে দেয় সমস্যার গভীরতা।
অনেক সময় দেখা যায়, এ ধরনের ঘটনায় পরিবহনকারী বা নি¤œস্তরের কর্মচারী ধরা পড়েন, কিন্তু মূল ব্যবসায়ী ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। ফলে অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হয় না।যদি কোনো হ্যাচারি বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান অবৈধ উৎসের ডিম গ্রহণ করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো অভিযানের ভয় থাকবে শুধু পরিবহনকারীর জন্য, মূল চক্রের জন্য নয়। চিংড়ি শিল্পের আলোচনায় অর্থনীতির বিষয়টি বেশি আসে, কিন্তু পরিবেশগত দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। অজানা উৎসের ডিম ও পোনা জলজ পরিবেশে নতুন রোগজীবাণু প্রবেশ করাতে পারে। এটি শুধু চিংড়ি নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। সাতক্ষীরা এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির ভুক্তভোগী জেলা। সুন্দরবনের নিকটবর্তী এই অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যায় জর্জরিত। এ অবস্থায় নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশের চিংড়ি মূলত বিদেশে রপ্তানি হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও পণ্যের উৎস সম্পর্কে ক্রেতারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। যদি বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ উৎসের ডিম ব্যবহারের অভিযোগ বাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রপ্তানি খাতের জন্য এটি মোটেও সুখকর হবে না। প্রথমত, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হ্যাচারিগুলোর নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিম ও পোনার উৎস শনাক্ত করার জন্য আধুনিক ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। চতুর্থত, চাষিদের সচেতন করতে হবে যাতে তারা অজানা উৎসের পোনা ব্যবহার না করেন। পঞ্চমত, অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আশাশুনিতে আট পলি বাগদা ডিম জব্দ হওয়ার ঘটনাটি হয়তো একটি দিনের খবর। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সাতক্ষীরার অর্থনীতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় উদ্বেগ। চিংড়ি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি সাতক্ষীরার মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও জীবিকার প্রতীক। সেই শিল্পকে যদি অবৈধ ডিমের কারবার, রোগের ঝুঁকি এবং অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু কয়েকজন চাষি নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জেলা। তাই আশাশুনির ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান হিসেবে না দেখে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কারণ আজ যে অবৈধ ডিমের চালান ধরা পড়েছে, সেটি হয়তো একটি সমস্যার মুখ। আর সেই সমস্যার শিকড় খুঁজে বের করে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরার ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়ি শিল্প বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।






