বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী
প্রকাশ ঘোষ বিধান
বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ আমাদের সবার দায়িত্ব। শরণার্থীদের প্রতি মানবিক হোন, এই আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বৈশ্বিক নৈতিকতার দাবি।
আদিকাল থেকে নিপীড়ন থকে বাঁচতে অনেকে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছেন। শরণার্থীর বেঁচে থাকার এবং নিরাপদে আশ্রয় খোঁজার মৌলিক মানবাধিকার রয়েছে। তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ না করে সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। শরণার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ করা আমাদের নৈতিক ও বৈশ্বিক দায়িত্ব। বলপ্রয়োগ, যুদ্ধ এবং সহিংসতার কারণে নিজের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।
২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ২০০১ সালের ২০ জুন প্রথম বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়। ২০০০ সালের ডিসেম্বরের আগে দিবসটি আফ্রিকা শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হতো। ১৯৫১ সালে শরণার্থীদের স্বীকৃতির বিষয়ে জাতিসংঘের সনদ গৃহীত হয়।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে আসা এই মানুষগুলোর জন্য খাবার, বস্ত্র, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের মতো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজ নিজ অবস্থান থেকে শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে অন্যদের উৎসাহিত করা। বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় কাজ করে এমন বিশ্বস্ত সংস্থাগুলোকে সহায়তা বা অনুদান প্রদান করতে পারেন।
বিশ্বজুড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে শরণার্থীদের সংখ্যা। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি, যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষ আন্তর্জাতিক শরণার্থী। ক্রমবর্ধমান এই বাস্তুচ্যুতির বিপরীতে জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর-এর তহবিল ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শরণার্থী তীব্র খাদ্য সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখই শিশু। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়ে ৬ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ সংঘাতের কারণে নিজ দেশের ভেতরেই গৃহহীন হয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় কেবল লেবাননেই ১০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও, ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আবারও মারাত্মক করে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের প্রায় ৭৩ ভাগ নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করায় তারা খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার চরম সংকটে ভুগছেন। এর ওপর আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিল কাটছাঁট হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশ শরণার্থীই ৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে, যা শরণার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। এই সংকট উত্তরণে জাতিসংঘ ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মূল চাবিকাঠি হলো শরণার্থীদের স্থানীয় কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়া এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
পৃথিবীর প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন বর্তমানে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বিপন্ন শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুতির সামগ্রিক সংখ্যা সামান্য কমেছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত বিশ্বব্যাপী চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ সাত দেশের অধিবাসী। সে গুলো হলো- সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ফিলিস্তিন, সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়া। যাদের প্রায় সবাই মুসলিম।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালের চেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে শিশু ৪০ শতাংশ (৪ কোটি ৪৯ লাখ) এবং শরণার্থীর সংখ্যা ৩ কোটি ৬৮ লাখ। আর বিশ্বে শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে থাকা মানুষের ৬৯ শতাংশের উৎস ৫ দেশ। এই ৫ দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা থেকে ৬২ লাখ, সিরিয়া থেকে ৬০ লাখ, আফগানিস্তান থেকে ৫৮ লাখ, ইউক্রেন থেকে ৫১ লাখ ও দক্ষিণ সুদান থেকে ২৩ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, ৩৭ শতাংশ শরণার্থী অবস্থান করছে ৫টি দেশে। এর মধ্যে ইরানে রয়েছে ৩৫ লাখ, তুর্কিতে রয়েছে ৩৩ লাখ, কলম্বিয়াতে রয়েছে ২৮ লাখ, জার্মানিতে ২৭ লাখ ও উগান্ডায় রয়েছে ১৮ লাখ। প্রতি বছর শরণার্থী হিসেবে জন্ম নিচ্ছে ২৩ লাখ শিশু। মোট শরণার্থীর ৭৩ শতাংশের আশ্রয়দাতা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত দেশ এবং ৬৭ শতাংশ শরণার্থীর আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশ।
শরণার্থী প্রসঙ্গে দুটি বিষয় কাজ করে। একটি অতিত বা পুরোনো, আরেকটি এখনও চলমান। ১৯৭১ সালে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল। আর স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু হয়। আরাকানে সৃষ্ট রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের দলগত আগমন বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের প্রচেষ্টা অব্যাহত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
শরণার্থী সংকট সমাধানে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ হলো নারী ও শিশু, যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট






