সংস্কৃতি যখন উন্নয়নের নতুন ভাষা
মো. মামুন হাসান
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প আজ আর শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হচ্ছে তার সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং নিজস্ব পরিচয়কে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের সক্ষমতার মাধ্যমে। প্রশ্ন হলো, আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন চালিকাশক্তি কোথায় নিহিত? বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে, নাকি কোনো গ্রামের উঠোনে বসে শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলা একজন কারুশিল্পীর হাতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার সেই অমূল্য ভা-ারের দিকে, যা এতদিন উন্নয়নের মূলধারার আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
প্রশ্নটি যতটা কাব্যিক, বাস্তবতাও ততটাই গভীর। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির নতুন প্রবণতা বলছে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু শিল্প কারখানা বা প্রযুক্তিনির্ভর হবে না; বরং সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় পরিচয়ও হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। আর সেখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা গ্রামকে দেখেছি কৃষির ক্ষেত্র হিসেবে, শ্রমশক্তির উৎস হিসেবে কিংবা শহরমুখী জনসংখ্যার যোগানদাতা হিসেবে। কিন্তু খুব কম মানুষই গ্রামকে একটি অর্থনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে কল্পনা করেছে। অথচ পৃথিবীর বহু দেশে একটি গ্রাম একটি পণ্যকে কেন্দ্র করেই বিশ্ববাজারে পরিচিতি লাভ করেছে। জাপানের ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট আন্দোলন, থাইল্যান্ডের ওটপ মডেল কিংবা ইতালির কারুশিল্পভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
বাংলাদেশ এখন সেই পথেই হাঁটার সুযোগ পেয়েছে।‘এক গ্রাম এক পণ্য’ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দর্শন। এই দর্শন বলে, প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব দক্ষতা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যই হবে তার উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
ভাবুন, কোনো একটি গ্রাম যদি শুধু শীতলপাটির জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়, কোনো অঞ্চল যদি শতরঞ্জির রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পায়, কোনো উপজেলা যদি তাঁতের নকশা কিংবা টেরাকোটার জন্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে সেখানে শুধু পণ্য বিক্রি হবে না; বিক্রি হবে একটি গল্প, একটি ইতিহাস এবং একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
আজকের বিশ্বে অভিজ্ঞতার বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। একজন বিদেশি পর্যটক এখন শুধু একটি স্মারক কিনতে চান না; তিনি জানতে চান সেই পণ্যের পেছনের মানুষ, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার গল্প। ফলে একটি শীতলপাটি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের একটি জীবন্ত দলিল।
বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতির বাজার কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, নকশা, কারুশিল্প, ডিজিটাল কনটেন্ট, উৎসব এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনকে ঘিরে যে অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, তা অনেক দেশের প্রচলিত শিল্পখাতের চেয়েও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ এখনো এই বিশাল বাজারে তার প্রকৃত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
অথচ আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সভ্যতা, নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, লোকসংগীত, বৈচিত্র্যময় খাদ্য ঐতিহ্য, হস্তশিল্প, উৎসব এবং অসংখ্য অপ্রকাশিত গল্প।প্রশ্ন হলো, আমরা কি এগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখেছি?
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো আমরা এখনো পর্যটনকে মূলত স্থানভিত্তিকভাবে দেখি। কক্সবাজার, সুন্দরবন কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ পরিকল্পনা আবর্তিত হয়। অথচ বিশ্বের অনেক সফল পর্যটন গন্তব্য গড়ে উঠেছে সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে।
একটি পিঠা উৎসব, একটি বাউল উৎসব, একটি নদী উৎসব কিংবা একটি লোকজ মেলা হাজারো পর্যটক আকর্ষণ করতে পারে, যদি তা পরিকল্পিতভাবে আয়োজন ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করা যায়।
ভাবুন, ডিসেম্বরকে ‘বাংলার পিঠা মাস’, ফাল্গুনকে ‘লোকসংস্কৃতির মাস’, বর্ষাকে ‘নদী ও নৌসংস্কৃতির উৎসব ঋতু’ এবং শরৎকে ‘গ্রামীণ ঐতিহ্যের ঋতু’ হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত করা হয়। তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন ক্যালেন্ডার সারা বছরই প্রাণবন্ত থাকতে পারে। এতে শুধু পর্যটক বাড়বে না; জেগে উঠবে গ্রামীণ অর্থনীতিও।
একজন পর্যটক যখন কোনো গ্রামে যান, তখন তিনি শুধু একটি টিকিট কেনেন না। তিনি স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করেন, স্থানীয় খাবার খান, স্থানীয় হস্তশিল্প কেনেন, স্থানীয় গাইড নিয়োগ করেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেন। ফলে পর্যটনের প্রতিটি টাকা বহু মানুষের হাতে পৌঁছে যায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে।
একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কারখানা নয়, ধারণা। সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য কাঁচামাল নয়, সৃজনশীলতা। সবচেয়ে মূল্যবান ব্র্যান্ড বিজ্ঞাপন নয়, গল্প।সেই গল্পই বলতে পারে বাংলাদেশ।
‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ যদি সত্যিকার অর্থে একটি জাতীয় ব্র্যান্ডে পরিণত হয়, তাহলে বিশ্ব এক নতুন বাংলাদেশকে দেখতে পাবে। যে বাংলাদেশ শুধু পোশাক রপ্তানি করে না; যে বাংলাদেশ সংস্কৃতি রপ্তানি করে, সৃজনশীলতা রপ্তানি করে, অভিজ্ঞতা রপ্তানি করে এবং নিজস্ব পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে।
হয়তো আগামী দশকের বাংলাদেশকে আমরা আর শুধু তৈরি পোশাকের দেশ হিসেবে চিনব না। আমরা চিনব এমন একটি দেশ হিসেবে, যেখানে একটি গ্রামের শীতলপাটি, একটি বাউলের গান, একটি পিঠার স্বাদ, একটি নদীর গল্প এবং একটি মানুষের সৃজনশীলতা মিলেই গড়ে তুলেছে নতুন অর্থনীতির ভিত্তি।
বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লব হয়তো কোনো শিল্পাঞ্চলে নয়, শুরু হবে গ্রামের উঠোনে। আর সেই বিপ্লবের নাম হতে পারে সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও পর্যটনের অর্থনীতি। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট












